মুহাম্মদ নূরে আলম: ২১শে ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিনটির সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা অমর একুশে বইমেলা। তাইতো প্রতি বছর শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দলে দলে মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় করেন বইপ্রেমীরা। অবশ্য বইপ্রেমীর চেয়ে মেলার দর্শনার্থীর সংখ্যাই বেশি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পাঠক-দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠেছে বইমেলা। বইমেলায় এবারও আনন্দে মাতল শিশু-কিশোরেরা। গতকাল শুক্রবার বইমেলার ২১তম দিনে মেলা প্রাঙ্গণে দুপুর থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে মেলায় যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মেলা প্রাঙ্গণ দেখা গেছে, দর্শনার্থীরা সেজেগুঁজে, পাঞ্জাবি-শাড়ি পরে দলবেঁধে মেলায় ঢুকছেন। তারা বিভিন্ন স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ কেউ কোনো স্টল বা প্যাভিলিয়নের সামনে বই হাতে নিয়ে ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন। কিন্তু এরপর বই না কিনেই তারা বিদায় নিচ্ছেন। বিক্রয় কর্মী ও প্রকাশকদের মতে, গতবছরও পাঠকের এমন খরা ছিল না। এদিকে, মেলায় দর্শনার্থীদের আনাগোণা বাড়ায় লেখক, প্রকাশক ও বিক্রেতারা খুশি। বিগত দিনগুলোতে বিক্রির হার কিছুটা কম থাকলেও গতকাল শুক্রবার বই বিক্রি বেশ বেড়েছে বলে জানান তারা। মেলার শেষ কয়েকদিনে বিক্রি আরও বাড়বে বলেও আশা তাদের।

লাখো দর্শনার্থীর প্রাণোচ্ছল উপস্থিতিতে যেন বইয়ের ক্রেতার দেখা মেলাই ভার। বিক্রয়কর্মী ও প্রকাশকরা বলছেন, বইমেলায় দর্শনার্থীর ভিড় অনেক বেড়েছে, তবে বেশিরভাগই স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, পরে চলে যাচ্ছেন। চন্দ্রদ্বীপ প্রকাশনীর এক বিক্রয় কর্মী বলেন, মেলায় এত এত মানুষ আসছেন কিন্তু বিক্রি তেমন হচ্ছে না। গত বছরও এমন পরিস্থিতি ছিল না। এবার সবাই এসে শুধু ছবিই তুলছেন, এরপর চলে যাচ্ছেন।

সময় প্রকাশনের এক বিক্রয় কর্মী বলেন, মানুষ দেখলে ভালো লাগে। ভাবি তারা হয়ত বই কিনতে আসবেন। কিন্তু না, তারা আমাদের প্যাভিলিয়নের সামনে আসেন, ছবি তোলেন, আবার চলেও যান। খুব কম দর্শনার্থী বই কেনেন। এ এইচ প্রকাশনীর প্রকাশক শাহ আলম বলেন, গত বছর অনেক বেশি বিক্রি হয়েছে কিন্তু এ বছর তেমন বিক্রি হচ্ছে না। মেলায় যেমন মানুষ হচ্ছে সে অনুযায়ী বিক্রি নেই বললেই চলে। মানুষ বইয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বইমেলায় ২০তম দিনে সর্বমোট নতুন বই এসেছে ১ হাজার ৯১০টি। এর মধ্যে শুধু বৃহস্পতিবারই মেলায় বই এসেছে ১১২টি। বইমেলায় এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে সর্বাধিক এসেছে কবিতার বই। এ পর্যন্ত ছয়শোর বেশি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। তবে কেনার ক্ষেত্রে পাঠকদের অপছন্দের তালিকায়ও অন্যতম কবিতার বই। কবিতার বইয়ের মান কমে যাওয়ায় পাঠকরা কবিতার বইয়ের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে মেলায় দর্শনার্থীদের পছন্দের বইয়ের মধ্যে উপন্যাস, থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশন, সাহিত্য, অনুবাদধর্মী বই উল্লেখযোগ্য। মেলায় কথা হয় বেশ কয়েকজন দর্শনার্থীর সঙ্গে। তাদের মধ্যে রিফাত নামে একজন বলেন, এখন অনলাইনে সব বই পাওয়া যাচ্ছে। তাই মেলায় সেভাবে বই কেনা হয় না।

পরিবার নিয়ে বইমেলায় আসা ‎ফারিহা জামান নামে একজন বলেন, এর আগেও একবার এসেছিলাম, তবে আজ বেশি ভালো লাগছে। চারদিকে একুশের আবহ। ভাষা দিবসের নানা আয়োজন খুব উপভোগ করছি। কয়টা বই কেনা হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলে, আসলে বই পড়ার তেমন সময় হয় না।

প্রথমা, অনন্যা, তাম্রলিপিসহসহ বেশ কয়েকটি স্টল ঘুরে বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, অন্য দিনের তুলনায় বই বিক্রি বেশি। তবে ছুটির দিন এবং একুশের দিনে যতটা আশা করা হয়েছে তার তুলনায় কিছুটা কম। নবকথন, স্বজনী, ছায়া, ভাষাচিত্র, সতীর্থ প্রকাশনাসহ বেশ কয়েকটি প্রকাশনার বিক্রেতারাও একই তথ্য জানান। বইমেলার জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, একুশে ফেব্রুয়ারির দিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে। এবারের বইমেলায় ৭০৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার ৮৪ ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গতবছর প্রতিষ্ঠান ছিল ৬৪২টি, আর ইউনিট ছিল ৯৪৬টি।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৯৯টি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৬০৯টি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবার মোট প্যাভিলিয়নের সংখ্যা ৩৭টি, যার মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকছে ৩৬টি। গত বছরও প্যাভিলিয়নের সংখ্যা ৩৭টি ছিল। লিটল ম্যাগাজিন চত্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায় করা হয়েছে। সেখানে ১৩০টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া, শিশু চত্বরে ৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১২০ ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত বছর শিশু চত্বরে ৬৮টি প্রতিষ্ঠানকে ১০৯ ইউনিট দেয়া হয়েছিল।