স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা অনুষ্ঠান “দুর্বার ২০২৫” অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রশিবিরের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর ৩টি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৮ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীকে ‘অদম্য মেধাবী সংবর্ধনা’ প্রদান করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ক্রেস্ট ও উপহার দেন ছাত্রশিবির। এ সময় নেতারা শিক্ষার্থীদের না বলা গল্পগুলো দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ সময়, জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী করা হয়। অনুষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের পক্ষ হতে ৬ দফা দাবি ও ২টি করণীয় উপস্থাপন করা হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় দুপুর ৩টায় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. আব্দুর রব। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রফেসর ড. ফখরুল ইসলাম, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সভাপতি ডা. নজরুল ইসলাম, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, জাহিদুর রহমান এবং ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ, প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদসহ কেন্দ্রীয় ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার কর্মী ইবনু আহমেদ বলেন, আমাদের পথচলা যেন আরও মসৃণ হয়, আমাদের পথচলা সহজ করতে আপনারা স্বপ্ন সারথি হয়ে কাজ করুন। আমাদের রাজনৈতিক অধিকার নেই, আমরা আমাদের কথাগুলো প্রকাশ করতে পারি না। আমি আবেদন জানাই, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ গড়তে আমরা যেন সমানভাবে সুযোগ পাই।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, একজন সাধারণ মানুষ যেমন সুবিধা ভোগ করে, তারা যেমন দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যেতে পারে তেমনই আপনারাও বঙ্গভবন, গণভবন ও জাতীয় সংসদে যাবেন ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আপনাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আব্দুর রব বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশেষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অদম্য মেধাবী (শারীরিক প্রতিবন্ধী) শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি যে মনোভাব রয়েছে, তা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এই শিক্ষার্থীরা তাদের অদম্য মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। তাঁদের সাফল্য আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করে। আমি আশা করি, এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে এবং সকল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে সমান সুযোগ প্রদান করা হবে যাতে তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।

প্রধান অতিথি মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব বলেন, হোমার ছিলেন অদম্য, তাকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আটকে রাখতে পারেনি। হেলেন কিলার এবং স্টিফেন হকিংও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ ছিলেন না। কিন্তু এই ৩ জনই সারা বিশ্বে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন। তারা তাদের কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাদের আটকাতে পারেনি। আমি আশাবাদী, তোমরাও তাদের মতো কাজের মাধ্যমে দেশবিদেশে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, একসময় এই ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব ছিল। ক্যাম্পাসে লাশের মিছিল হতো। কিন্তু এখন ক্যাম্পাসে সম্প্রতি বজায় আছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছে, আল্লাহর বাণী উচ্চারিত হচ্ছে। ছাত্রশিবির তাদের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এমন একটা মহৎ কাজ করছে সেজন্য তাদের শুভকামনা জানাই।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠন করতে চাই, যেখানে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে পারবেন। আমরা চাই, তারা সংসদ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সকল জায়গায় অংশ নিতে সক্ষম হোক। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করার চেষ্টা করব এবং সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যাতে তারা এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের জন্য সব সময় অনুপ্রাণিত। তবে এখনও আমরা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে, বিভিন্ন প্রোগ্রামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো আমাদের অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করা হয় না। তা ছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন ব্যবস্থা, উপযোগী ওয়াশরুম এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিয়েও আমাদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা সরকারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ছাত্রশিবির এবং অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের কাছে আমাদের দাবি তুলে ধরছি। আশা করছি, আমাদের এই সমস্যা সমূহের স্থায়ী সমাধান হবে।

সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসতে আপনাদের অনেক বাঁকা কথা সহ্য করতে হয়েছে। তবুও আপনাদের অদম্য ইচ্ছা ও মেধার স্বাক্ষর রেখে দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করছেন। আপনাদের সামনের দিনগুলো যেন আরও সহজতর হয় সেই কামনা করি। এসময় তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন এবং তাদের প্লাটফর্মকে শক্তিশালী করার জন্য শিবিরের ৩টি সেক্টর কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বিশেষ প্রয়োজনসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের নিকট ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো: ১. শারীরিক প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য চাহিদার আলোকে ভাতা ও শিক্ষাবৃত্তি বাড়ানো এবং সহায়ক উপকরণ সহজপ্রাপ্য করতে হবে।

২. সরকারি-বেসরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালের অবকাঠামো এবং গণপরিবহনকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিবন্ধীবান্ধব করতে হবে। ৩. জাতীয় সংসদ ও নীতিনির্ধারণী জাতীয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা ও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৪. প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়ক উপকরণ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, বিশেষ শিক্ষা পদ্ধতি ও প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

৫. সরকারি-বেসরকারি খাতে প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ ও সমান বেতন নিশ্চিত করতে হবে। ৬. প্রতিবন্ধীদের জন্য অধিকার রক্ষায় UNCRPD -এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় তিনি সরকারের কাছে এসব দাবি বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি, ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরেন।

১. শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফরমের সাথে ছাত্রশিবিরের ছাত্রকল্যাণ, ছাত্র অধিকার এবং মানবাধিকার বিভাগ যৌথভাবে কাজ করবে। ২. পাশাপাশি, ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগ তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে কার্যকর প্রচারণা চালাবে এবং তাদের দাবিগুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।