সংগ্রাম ডেস্ক : যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, বর্তমানে সেটা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে আলোচনায় গতি ফেরাতে নানা কূটনৈতিক তৎপরতা নেওয়া হচ্ছে। রয়টার্স ,আল-জাজিরা, এএফপি, এপি ,ওয়াল স্ট্রিট,জার্নাল বিবিসি সিবিএস।
এ তৎপরতার অংশ হিসেবে ইরানের রাজধানী তেহরানে গেছেন মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের প্রতিনিধিরা। সেখানে ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন তাঁরা। মূলত চলমান উত্তেজনা কমিয়ে আনা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও বড় পরিসরে আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেই তেহরানে তাঁদের এ সফর। এর আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা স্মারকে সই করেছিলেন ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা। সে প্রক্রিয়ায় কাতারও জড়িত ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থামেনি। সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলার পর, সেই সমঝোতা স্মারকের শর্ত কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা নিয়ে ইরানের কর্মকর্তারা সন্দিহান।
সম্প্রতি ইরানের অন্তত পাঁচটি প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলা হয়েছে সামরিক ও বেসামরিক উভয় অবকাঠামোয়। এসব হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে সমঝোতা স্মারকটি বাতিলের কথা বলেছেন। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর যুদ্ধ বন্ধে মার্কিনদের উদ্দেশ্য নিয়ে ইরানের সংশয় আরও জোরালো হয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ইরান কখনোই ‘আত্মসমর্পণ’ করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। গালিবাফ সতর্ক করে আরও বলেন, ইরান ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের কর্মকর্তারা বারবার বলছেন, কোনো ধরনের ‘জবরদস্তিমূলক কূটনীতির’ কাছে তেহরান নতিস্বীকার করবে না। এমনকি তাঁদের দাবি, আলোচনা এগিয়ে নিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো মেনে চলতে হবে।
বিশেষ করে প্রাথমিক এ চুক্তির ১ ও ৫ নম্বর শর্ত পূরণে জোর দিচ্ছে তেহরান। ১ নম্বর শর্তে বলা আছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। আর ৫ নম্বর শর্ত হলো, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে। এ জলপথ পরিচালনায় ইরানকে সার্বভৌম অধিকার দিতে হবে। সমঝোতা স্মারকের ১০ নম্বর শর্ত মেনে নিজেদের জ্বালানি তেল রপ্তানির অধিকার বুঝে পাওয়ার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান।
পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে হতাশ যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। এক প্রতিবেদনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা হওয়া অনেকটাই অনিশ্চিত বলে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে।
জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়নে ইরান এখনো সফল হতে পারেনি। কাজেই দেশটি নতুন করে একটি বড় পরিসরের পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাবে, এমন আশা খুবই কম।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সম্প্রতি এ নিয়ে হতাশার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না, শেষ পর্যন্ত আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব কি না।’
মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি ভূগর্ভে রাখা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে দিতে ব্যর্থ হয়, তবে কোনো পারমাণবিক চুক্তি হতে পারে না।
যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি রেখেছে ইরান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতির বিষয়ে তেহরান তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, সমঝোতা স্মারকের ধারা লঙ্ঘন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফরাসি বার্তা সংস্থা এ খবর জানিয়েছে।
গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাঘচি বলেন, ইরান এখন পর্যন্ত তার কথা রেখেছে। কিন্তু তথাকথিত মার্কিন অর্থমন্ত্রী সমঝোতা স্মারকের নবম অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করছেন।
তিনি জানান, সমঝোতা স্মারকের ওই ধারায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিক বাহিনী মোতায়েন না করার কথা বলা হয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে আরও আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছেন বলেও জানান।
বাবার ‘নিষ্পাপ রক্তের’ প্রতিশোধ নেওয়া হবে: মোজতবা খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ‘নিষ্পাপ রক্তের’ প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বাবার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর দেওয়া প্রথম বার্তায় তিনি বলেন, এই প্রতিশোধ গ্রহণ শুধু তার পরিবারের সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি সমগ্র ইরানি জাতির ইচ্ছা।ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ এই নেতা নিহত হন। বাবার আকস্মিক হত্যাকা-ের পর দেওয়া এই বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি তার বাবার জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শোকসন্তপ্ত জনতার এই বিশাল সমাগমকে তিনি একটি ‘শত্রু-বিধ্বংসী এবং ঐতিহাসিক উপস্থিতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বাবার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে নিজের প্রথম প্রকাশ্য অবস্থানে এসে খামেনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তেহরান এই হত্যাকা-কে হালকাভাবে দেখছে না, আর জাতীয় আকাঙ্ক্ষা অনুসারেই এর মোক্ষম জবাব দেওয়া হবে।
বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা
না চালানোর প্রতিশ্রুতি
চায় যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান হরমুজ প্রণালি খোলা আছে বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিক এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো বন্ধের অঙ্গীকার করুক। গতকাল শনিবার ওমানে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে ইরানের কাছ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি চায় ওয়াশিংটন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো বলেছে, সম্প্রতি জাহাজে হামলা করাটা ভুল ছিল বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের কাছে স্বীকার করেছে তেহরান। তবে ইরানের দাবি, এ ঘটনার জন্য তাদের ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা’ একটি অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী দায়ী।
ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলতি সপ্তাহের সংঘর্ষ সত্ত্বেও উভয় পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। হোয়াইট হাউস মনে করে, হরমুজে সংঘটিত ওই ঘটনা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন।
যুদ্ধবিরতি শেষ হলেও আলোচনায় সম্মত ইরান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলতি সপ্তাহে সংঘাত বৃদ্ধি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। তবে তিনি জানান, গত মে মাস থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা বন্ধের বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে তেলের দামে। নভেম্বরের আগাম নির্বাচনের আগে বিষয়টি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান আমাদের আলোচনা চালিয়ে যেতে বলেছে। আমরা তাতে রাজি হয়েছি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শেষ!’
অন্যদিকে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে ইরান। দেশটি বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অনুরোধ করেনি। বরং কাতারের এক মধ্যস্থতাকারীকে আতিথ্য দিতে সম্মত হয়েছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, উত্তেজনা প্রশমন এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার জন্য কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা শুক্রবার ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।