ডাকসু নেত্রী রাফিয়া খন্দকার
ইবরাহীম খলিল
খবরদার কারো গায়ে হাত দিবেন না। ছেলেদের মারবেন, আমি আঙ্গুল চুষবো? মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার দিন ধানমন্ডিতে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক বাকবিতণ্ডায় জড়ান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া ওরফে (রাফিয়া খন্দকার)। তার সেই বাকবিতণ্ডার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ডাকসু নির্বাচনের আগে তার আবৃত্তি করা কবিতার পংক্তিও ভাইরাল হয়। তাহলো -‘আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু/ কম করে মোরে দাওনি; যা দিয়েছো, তারি অযোগ্য ভাবিয়া/ কেড়েও তা কিছু নাওনি।’ দুটি ঘটনা রাফিয়া খন্দকারের জীবনের খ-চিত্র। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, রাফিয়া খন্দকার সব সময় চঞ্চল এমনকি যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে জুলাই আন্দোনেও ছিলেন সক্রিয়, সাবলিল এবং অনবরত।
২০২৪ ইং সালের জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলনে যে কয়জন নারী শিক্ষার্থীর সাহসী উচ্চারণ মানুষকে লড়াইয়ের স্পৃহা দিয়েছে, সাহস যুগিয়েছে তার অন্যতম ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া ওরফে (রাফিয়া খন্দকার)। পরবর্তীতে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ডাকসু নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন। জুলাই আন্দোলনের মাঠের কর্মসূচীর পরতে পরতে উপস্থিতি ছিল তার। সেই জুলাইয়ের দেনা-পাওনা নিয়ে দৈনিক সংগ্রামের সাথে কথা বলেছেন তিনি।
জুলাই কি দিলো আর দেশ কি পেল এমন প্রশ্নের জবাবে ডাকসু নেত্রী রাফিয়া খন্দকার বলেন, জুলাইয়ের ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গেলে আসলে কেউ বলবে স্মৃতি, কেউ বলবে দুঃখ, কেউ বলবে ক্ষত, কেউ বলবে বিজয়। আমি বলবো- সামস্টিকভাবে জুলাই আমাদের একটি অঙ্গীকার দিয়েছে। এই অঙ্গীকারটা হলো নতুন কিছু করার। ৫ আগস্টের আগে দেশে যে বস্তাপচা যে রাজনীতির বন্দোবস্ত ছিলো বা সরকারের যে নীতিটা ছিল। অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি একটাই ছিল সেটা ‘দুর্নীতি’; সেটাকে ভেঙেচুরে যদি নতুন করে আমরা কিছু করতে পারি। এই অঙ্গীকারটা জুলাই আমাদের সামস্টিকভাবে দিয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত অনেক গল্প আছে।
আর জুলাইকে আমরা কি দিয়েছি ? সে কথা বললে আমি বলবো আমরাতো জুলাইটা-ই দিয়েছি। জুলাইকে আমরা একটা সত্ত্বা দিয়েছি । আমরা যারা রাজপথে ছিলাম তারা এই সত্ত্বাটা দিয়েছি। আমি নিজেতো একদম দ্বিতীয় দিন থেকে জুলাই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছি। সেই সময়টা আমার মনে আছে-- তীব্র গরম ছিল। রাজপথে যখন বসেছিলাম এতোটাই গরম ছিল যে, আমার পায়ের মোজার সাথে তাপে রাস্তার পিচ গলে লেগে গিয়েছিল। চামড়ায় ফুসকা পরার মতো অবস্থা। আমরা মিছিল করে পুরোটা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে যখন আসতাম তখন কাঠফাটা রোদ থাকতো। সেই সময়টা চোখে যে স্বপ্নছিল, যে চিন্তাটা ছিল, জুলাইয়ের পর পরই সব হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে এর ৮০ শতাংশই হয়নি। তবে আমি মনে করি ২০ শতাংশ যে হয়েছে তা-ই বা কম কিসে ?
যেমন: ধরেন আজ আমি যে আমার সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করতে পারছি, সমালোচনা করতে পারছি। এটাতো আমি হাসিনা সরকারের সময় পারিনি। তখনতো বদ্ধঘরে কথা বলতে গেলেও বলা হতো-- দেওয়ালেরও কান আছে। এগুলো বইলো না। তোমাকে উঠাইয়া নিয়ে যাবে। সেই অবস্থা থেকে বের হতে পারাটা আশার আলো। আমার প্রত্যাশা সরকারের কাছে ভবিষ্যতে আরও ভাল হবে। তবে মনে হচ্ছে, জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্ট করছে সরকার। আমাদের সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। সবকিছু বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। দিন শেষে দেখা যাচ্ছে-- আমরা কিছুটা হতাশ। প্যান্ডোরার বাক্সের মতো শেষ মুহূর্তে গিয়ে একটা আশার আলো জ¦লতে থাকে। ঐ আশাটা নিয়ে আমরা আছি।
জুলাইয়ের গতি এখন কোন পর্যায়ে ? এমন প্রশ্ন করা হলে রাফিয়া বলেন, আমরা যারা জুলাইকে সামনে থেকে দেখেছি এটাতো সারাজীবন-ই থাকবে। যতই বলি না কেন এটা খারাপ, ওটা খারাপ, এটা হচ্ছে না, ওটা হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত গিয়ে হয়তো আমরা ভুলে যাচ্ছি। কিন্তু আবার যখন দেশের ক্রান্তিকাল আসবে; তখন আমরা আবার রাস্তায় নামবো। আমরা আবারো জুলাইয়ের স্পিরিটটা নিয়ে আসবো।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাথে জুলাইয়ের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়তো প্রায় সব আন্দোলনের সুতিকাগার। আমরা কোটা আন্দোলন এখান থেকে শুরু করেছি। তারপর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ----। ডাকসুর এই নারী নেত্রী আরেকটু বাড়িয়ে বলেন, শুধু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় না। আমি আসলে জোর দিয়ে বলতে চাই----। জুলাই আন্দোলনে বিশেষ করে প্রাইভেট ইউভার্সিটিগুলোর ভূমিকা ছিল অনেক বেশি। কারণ আমাদের হলগুলোতে দেখা গেছে টিয়ার সেল মারা হয়েছে। হল থেকে স্টুডেন্টদের বের হয়ে যেতে হয়েছিল। বাধ্য হয়েছিল হলগুলো খালি করে দিতে। তখন আন্দোলনটা জিইয়ে রেখেছিল প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো। আমরা শুরু করেছি সত্য কথা। কিন্তু আন্দোলনটাকে টিকিয়ে রেখেছিল প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোর স্টুডেন্টরা।
জুলাইয়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই মেধাবী শিক্ষার্থী বলেন, জুলাই আন্দোলনের শুরুতেই আমার বেশ কিছু ইন্টারভিউ ভাইরাল হয়েছিল। তখন আমি লোক মারফত খবর পেয়েছিলাম যে আমি টার্গেটেড হয়ে গিয়েছি। তখন বেশ কিছুদিন আমাকে পালিয়ে থাকতে হয়েছে। আমি কখনো ভাবিনি আমার জীবনে এমন কোন অধ্যায় আসবে যে, আমাকে অন্যদের থেকে পালিয়ে থাকতে হবে। ওই সময়টাতে রাস্তায় বোরকা-নেকাব পড়ে বের হতে হয়েছে। আমি যখন আইন-শ্ঙ্খৃলাবাহিনীর কাউকে দেখছি তখন মনে হয়েছে আমার চোখ দেখে কি চিনে ফেলবে ? এই ব্যাপারটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এরপর যখন ইন্টারনেট শাট ডাউন হলো--। শাট ডাউনের আগে আগে আমি বিবিসি’র সাথে কথা বলেছিলাম। সেই সময়টায় যদিও তখনো এক দফা ঘোষণা হয়নি। আমি আন অফিসিয়ালি বলেছিলাম যে, আমরা এই সরকারকে আর চাই না। একথা বললাম আর সেদিন থেকেই শুরু হলো ব্ল্যাকআউট। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো- ইন্টারনেট শাট ডাউনের সময় আমরা জানতে পারতাম না, বুঝতে পারতাম না, কোথায় কোন কার্যক্রম হচ্ছে। কে আসবে, কখন কোথায় কোন কার্যক্রম শুরু হবে। ঐ সময়টা খুব আশঙ্কার সময় ছিল।
এই সময়ে এসে আমরা জুলাইকে কতটা ধারণ করতে পেরেছি ? এমন প্রশ্নের জবাবে রাফিয়া জানান দেন, আমাকে এমন একটা প্রশ্ন করেছেন যে এর উত্তর মোক্ষম সময়ে দেওয়া যায়। কঠিন সময়ে দেওয়া যায়। দেশের যখন আবার ক্রান্তিকাল আসবে, তখন যদি আমরা আবার নামতে পারি, তাহলেই কেবল জুলাইকে পুরোপুরিভাবে ধারণ করা হবে। জুলাই মূলত প্রতিরোধের প্রতিবাদ।
একধাপ এগিয়ে তিনি বলেন, কিছুটা ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সরকার জুলাইকে একঘরে করে ফেলার চেষ্টা করছে। এক ঘরে করে রাখছে। ‘মুক্তিয্দ্ধু বনাম জুলাই, নামে একটা ন্যারেটিভ আছে। এই একটা ন্যারেটিভের ভেতরে আটকে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। মূলত ব্যাপারটা কিন্তু এরকম না। মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই পাশাপাশিভাবেই চলছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শিখেছি কিভাবে প্রতিবাদ করতে হয়। জুলাইয়েও আমরা তাই করেছি। সুতরাং ঘটনা দুটোকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোন প্রশ্নই উঠে না। আর যদি এমনটি করা হয়, জুলাইকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয় তাহলেতো আমরা আছি------। যারা আমরা জুলাইয়ে রাস্তায় ছিলাম।