জুলাই শহীদ দিবসের আলোচনা সভায় ডা. শফিকুর রহমান

স্টাফ রিপোর্টার

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের নামে কোনো ভাঁওতাবাজি জনগণ মেনে নেবে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে শহীদ আবু সাঈদসহ সকল শহীদের স্মরণে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, সংবিধান সংস্কারের পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকার সংবিধান সংষ্কার পরিষদ গঠন না করে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত এবং লজ্জিত। ১৯৪৭ থেকে ২০২৪ আমাদের প্রতিটি অর্জনের জন্য আমরা গর্বিত। লজ্জিত এজন্য আমাদের জনগণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ফসল প্রতিবারই ছিনতাই করা হয়েছে। কিন্তু আমরা চব্বিশকে হারিয়ে যেতে দেবো না। তিনি বলেন, এই চব্বিশ না হলে, আমি এখানে বক্তব্য দিতে পারতাম না, সংসদ সদস্য হতে পারতাম না, বিরোধী দলের নেতা হতে পারতাম না। একইভাবে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারতো না। কিন্তু সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যে জাতি আশাহত হচ্ছে।

যারা দেশ পরিচালনা করবে তাদের ন্যূনতম নৈতিক মানদ- থাকতে হবে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যখন সরকারের এক মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, আমরা সংস্কারের পক্ষে হ্যাঁ বলেছি যদি নির্বাচন হতে দেওয়া না হয়! আরেক মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে টোল মওকুফের কথা বলেছেন কিন্তু টোল মওকুফ করা হবে না! এই যে, মন্ত্রীদের দ্বিচারিতা, জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা এটি রাজনীতির জন্য শুভকর নয়। এর ফলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা নষ্ট হবে। তিনি বলেন, জুলাইয়ে সবচেয়ে বড় দাবি ছিল ফ্যাসিবাদ যাতে আর ফিরে না আসে। তাই ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার পথ বন্ধ করতে হলে অবশ্যই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। শহীদের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন না করলে রাষ্ট্র হবে অকৃতজ্ঞ, নিমকহারাম।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্রি. জে. (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, যাদের রক্তের ওপর দিয়ে সরকার ক্ষমতায় বসেছে তাদের সম্মান করতে পারেনি সরকার। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী শিলং থেকে একজন দেশে এসে দাবি করছেন তিনি না-কি জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন! অথচ জুলাই বিপ্লব এদেশের ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, সরকার ঋণ খেলাপিদের ঋণগ্রস্ত বানিয়ে যাকাতের টাকা লুটপাট করার পথ তৈরি করেছে। কারণ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য যাকাতের টাকা নেওয়ার সুযোগ আছে! লুটপাটের চেষ্টা না করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, আমরা আর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা চাই না, আমরা ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ চাই।

ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, পল্টন থানা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মঞ্জরুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনে আবু সাঈদকে গুলী করে শহীদ করার মধ্য দিয়ে আন্দোলনে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছিল হাসিনার পুলিশ বাহিনী। এখান থেকেই ছাত্র সমাজ শপথ করে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই হবে। সেই আন্দোলন একক কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের নয়। বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সকলের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকায় জুলাই বিপ্লব অর্জিত হয়েছে। গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদী কাঠামোর পরিবর্তন না হলে জনগণ আবারও সরকার পরিবর্তনের দিকে হাঁটতে বাধ্য হবে।

ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ছাত্র-জনতা যেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে জুলাই বিপ্লব অর্জন করেছে সেই স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ হতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কার ব্যতীত পুরোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় সরকারকে চলতে দেবে না জুলাই বিপ্লবীরা। বিপ্লবীদের মাঠে নামার আগেই গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

শহীদ মোবারক হোসেনের পিতা রমজান আলী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই গণহত্যার বিচার সম্পন্ন না করেই নির্বাচন দিয়ে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিয়েছে। আমরা নতুন সরকারের কাছে জুলাই গণহত্যার বিচার দাবি করছি। তবে আমরা উদ্বিগ্ন সরকার, গণহত্যার বিচার করবে কি-না! কারণ সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য সন্দেহজনক। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তীতে বলে সেটি শুধুমাত্র নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে বলেছে! তিনি হুঁশিয়ারি করে বলেন, গণহত্যার বিচার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে এবার শহীদ পরিবার রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান, হয়তো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুন, নয়তো আগামীর আন্দোলনে আমার বুকে বুলেট মারার জন্য আমার ট্যাক্সের টাকায় বুলেট কিনে রাখুন! তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী ব্যতীত আর কোনো রাজনৈতিক দল আমাদের খোঁজ খবর নেয়নি।

শহীদ মেহেদী হাসানের পিতা শেখ জামাল হাসান বলেন, জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও গণহত্যার একটি বিচারও সম্পন্ন হয়নি! বিচার ও সংস্কারে সরকারের উদাসীনতা আমাদের ব্যথিত করছে। সরকারের কার্যক্রমে মনে হয়, সরকার জুলাই চেতনায় বিশ্বাস করে না। পক্ষান্তরে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর কার্যক্রমে মনে হয় জামায়াতে ইসলামী জুলাই চেতনা ও আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে সোচ্চার। জামায়াতে ইসলামী ব্যতীত কোনো দল আমাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি। অনতিবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমে শহীদদের রক্তের দায় শোধ করতে তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান।

জুলাই যোদ্ধা আহত সালমান হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও রংপুরে আবু সাঈদকে গুলী করে শহীদ করায় ছাত্র সমাজ ফুঁসে ওঠে সরকার পতনের আন্দোলনের শপথ করে। সরকার ছাত্রদের দমনে যতবেশি অস্ত্র ব্যবহার করেছে ছাত্ররা ততবেশি বিদ্রোহী আর বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে দলমত নির্বিশেষে সকল ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক, রিকশা-ভ্যান চালকসহ সকল পেশাজীবীর সাধারণ জনগণ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। সাংবাদিক সমাজও সেই আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে সহযোগিতা করেছিল। সকলের সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ৩৬ দিনের আন্দোলনে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, আন্দোলনের শুরুই হয়েছে কোটা সংস্কারের দাবিতে অর্থ্যাৎ সংস্কারের দাবিতে তাহলে বিপ্লব পরবর্তী নতুন সরকার সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধন কোথায় পেয়েছে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, গণহত্যার বিচার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ব্যতীত বিকল্প কোনো পথে হাঁটলে ছাত্র-জনতা আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি’র পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য ড. মোবারক হোসাইন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালাম প্রমুখ।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য যথাক্রমে এডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, আবদুর রহমান, কামরুল আহসান হাসান, সৈয়দ সিরাজুল হক, শাহীন আহমেদ খান, মাওলানা শরিফুল ইসলাম, মহানগরীর সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন, সহকারী মিডিয়া সম্পাদক আশরাফুল আলম ইমনসহ মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ।

সভাপতির বক্তব্যে মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, শহীদ আবু সাঈদসহ সকল শহীদকে রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করতে হবে। শহীদদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সড়কের নামকরণ করতে হবে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে এই সংক্রান্ত কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে। শহীদের রক্তের শক্তি মুছে ফেলবার শক্তি কারো নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহীদদের রক্ত নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে চাইলে পরিণতি ভয়াবহ হবে। গণহত্যার বিচার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারি দল হিসেবে বিএনপিকে পথ খুঁজে বের করতে বলে তিনি আহ্বান জানান।