মুহাম্মদ নূরে আলম
বঙ্গোপসাগরের উত্তাল নীল জলরাশি যেন এক চিরস্থায়ী মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। আমাদের ঘরের পাশেই অগাধ জলধির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে হাজারো স্বপ্ন, আর্তনাদ আর মানবতা। উন্নত জীবনের প্রলোভন দিয়ে ৩ হাজার ডলারের বিনিময়ে মানবপাচারকারী চক্র রোহিঙ্গাদের সাগর যাত্রায় প্ররোচিত করছে। অবৈধ অভিবাসনের বিপজ্জনক রোড বানিয়ে ফেলেছে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধীচক্র। এই মানবপাচারকারীদের নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াজুড়ে মাকড়সার জালের মতো বিস্তৃত। পাচারকারীরা প্রথমে টেকনাফ বা রাখাইন উপকূলের গভীর সমুদ্রে বড় আকারের ‘মাদার শিপ’ বা বড় জাহাজ নোঙর করে রাখে। কোস্টগার্ড বা নৌবাহিনীর নজর এড়াতে এ জাহাজগুলো খুব দ্রুত রোহিঙ্গাদের তুলে নিয়ে আন্তর্জাতিক জলসীমার দিকে রওনা দেয়। আধুনিক পাচারকারীরা এখন স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করে থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় জেলে ও দালালদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখে। তারা প্রথমে রাখাইন/টেকনাফ উপকূল থেকে (মাদার শিপ) এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর/আন্দামান সাগর হয়ে দক্ষিণ থাইল্যান্ড/পূর্ব সুমাত্রা দ্বীপে যায়, তারপর মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী জঙ্গলে নিয়ে তিন হাজার ডলার আদায় করার পর পাচারকৃত রোহিঙ্গাদের ছেড়ে দেয়। সাগর যাত্রায় গত দশ বছরে মৃত্যু সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি এবং লাশ উদ্ধার প্রায় ৫ শতাধিক রোহিঙ্গার। সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়া দুটি ট্রলারের সাড়ে পাঁচশর কাছাকাছি আরোহী গভীর সমুদ্রে নিখোঁজ হয়েছেন। ঠিক কী ঘটেছিল সেই অভিশপ্ত যাত্রায়, কেন এই মানুষগুলো জেনেশুনে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দিচ্ছে, আর কীভাবে আমাদের চোখের সামনে বঙ্গোপসাগর অবৈধ অভিবাসনের এক বিপজ্জনক রুটে পরিণত হলো তা নিয়ে নানান বিশ্লেষণ করছে অভিবাসী ও রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ (টেকনাফ ও কক্সবাজার উপকূল), মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূল থেকে বিভিন্ন সময়ে সর্বমোট ৪৫০ থেকে ৬০০টি লাশ কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী এবং স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি প্রায় ৪,০০০ জনই সাগরে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত, যাদের লাশ কখনোই পাওয়া যায়নি এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী তাদের মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ বলেন, রাখাইন রাজ্যে চলমান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোর দমবন্ধ পরিস্থিতির কারণে ২০২৫-২০২৬ সালে সাগরে আত্মঘাতী যাত্রার প্রবণতা আগের চেয়ে প্রায় কয়েক গুণ বেড়েছে, যা এই মৃত্যুর মিছিলকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
সূত্রে জানা যায়, সমুদ্রের মাঝে বা থাইল্যান্ডের বনাঞ্চলের গোপন ট্রানজিট ক্যাম্পে আটকে রেখে চলে অমানুষিক নির্যাতন। টাকা দিতে দেরি হলে বন্দীদের মারধর ও নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তাদের পরিবারের কাছে পাঠানো হয়, যাতে তারা জমিজমা বা ঘটিবাটি বিক্রি করে দ্রুত টাকা দিতে বাধ্য হয়। টাকা না দিলে অনেককে সাগরে ফেলে দেওয়া বা মেরে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বিভিন্ন সময়ের বার্ষিক প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত এক দশকে শুধুমাত্র সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা সাগরে নিখোঁজ বা মারা গেছেন। তবে মানবপাচারকারী চক্রের গোপনীয়তা এবং গভীর সমুদ্রে ট্রলার ডুবে যাওয়ার কারণে প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কারণ বহু নৌকার ডুবে যাওয়ার খবর কখনোই সামনে আসে না।
সূত্র আরো জানায়ায়, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে সামরিক অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অসংখ্য নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এই দুই বছরে সাগরে ও নদীতে ডুবে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। ২০১৮-২০১৯ সালে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাত্রার প্রবণতা কিছুটা কমলেও পাচার সচল ছিল। দুই বছরে সাগরে প্রায় ১৫০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। ২০২০ (লকডাউন ট্র্যাজেডি) সালে করোনা মহামারির কারণে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত সিল করে দেওয়া হলে শত শত রোহিঙ্গা সাগরে মাসের পর মাস ভাসতে থাকে। ইউএনএইচসিআর-এর তথ্যমতে, ২০২০ সালে সাগরে ভাসমান অবস্থায় খাদ্য-পানির অভাব ও নৌকাডুবিতে ৩৮৭ জন রোহিঙ্গা মারা যান বা নিখোঁজ হন। ২০২১ সালে সমুদ্রযাত্রায় প্রাণ হারান বা নিখোঁজ হন প্রায় ২৮৪ জন রোহিঙ্গা। ২০২২ সালটি ছিল রোহিঙ্গাদের সমুদ্রযাত্রার ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী বছর। এই বছর অন্তত ৩,৫০০ রোহিঙ্গা সাগরে ভাসেন, যার মধ্যে ৩৪৮ জন সাগরে নিখোঁজ বা মারা যান। এর মধ্যে একটি নৌকা ১৮০ জন আরোহী নিয়ে সম্পূর্ণ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। ২০২৩ সালে সাগরে মৃত্যুর সংখ্যা পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে কমপক্ষে ৫৬৯ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, যা ছিল তার আগের ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৪-২০২৫ সালে রাখাইন রাজ্যে জান্তা ও আরাকান আর্মির যুদ্ধ তীব্র হওয়ায় সাগরে ভাসার হার আরও বাড়ে। এই সময়ে বিভিন্ন নৌকাডুবির ঘটনায় প্রায় ৪৫০ জনের বেশি রোহিঙ্গার সাগরে সলিলসমাধির তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নথিবদ্ধ করে। চলতি বছরের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটে গত ২৯ জুন। মিয়ানমারের রাখাইনের সিন তেত মাও গ্রাম থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়া দুটি ট্রলারের প্রায় ৫৩০ জন রোহিঙ্গা আরোহী গভীর সমুদ্রে নিখোঁজ হয়েছেন।
সূত্রে জানাযায়, গত ২৯ জুন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিন তেত মাও গ্রাম থেকে আনুমানিক ৫৩০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী দুটি বড় ট্রলারে করে সাগরের উদ্দেশে রওনা দেয়। একটি ট্রলার রওনা হয়েছিল সকালের দিকে এবং অন্যটি দুপুরের পর। কিন্তু সমুদ্রযাত্রার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ঘটনাটির ভয়াবহতা বোঝাতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি যেন যাত্রীভর্তি একটি আস্ত জাম্বো জেট বা বোয়িং বিমান মাঝ আকাশ থেকে হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। জুন-জুলাই মাসের এই সময়ে বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি ও তীব্র ঝড়ঝাপটা চলায় সমুদ্র প্রচ- উত্তাল থাকে। তার ওপর পাচারকারীরা যে নৌকাগুলো ব্যবহার করেছে, সেগুলো মূলত পুরোনো মাছ ধরার ট্রলার। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ট্রলারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ বোঝাই করা হয়েছিল। এ ধরনের জরাজীর্ণ ট্রলার কোনোভাবেই গভীর সমুদ্রযাত্রার উপযোগী নয় এবং এগুলোর ইঞ্জিনের ক্ষমতাও অত্যন্ত সীমিত ছিল। আশঙ্কা করা হচ্ছে, উথাল-পাথাল ঢেউয়ের তোড়ে দুটি নৌকাই মাঝসাগরে ডুবে গেছে। ট্রলার দুটির আরোহীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল নারী ও শিশু। সাগরের মাঝখানে এই ঝড়ো আবহাওয়ায় কারও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। যদি কেউ বেঁচেও থাকে, তাদের উদ্ধার করার মতো কোনো তৎপরতা সেখানে ছিল না। ফলে অত্যন্ত নির্মমভাবে সাগরের বুকেই সলিলসমাধি ঘটেছে এই সাড়ে পাঁচশ প্রাণের।
শরিফুল ইসলাম হাসান একজন সুপরিচিত বাংলাদেশি নিরাপদ অভিবাসন ও মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক। সাগরে বিপজ্জনক যাত্রায় ৫০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ, রোহিঙ্গাদের অবৈধ অভিবাসনের বিপজ্জনক রুট বঙ্গোপসাগর। এই বিষয়ে তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের এই মরণযাত্রা কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সংকট নয়, এটি বৈশ্বিক মানবতার এক চরম পরাজয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার রোহিঙ্গাদের জন্য একটি নিরাপদ প্রস্থান পথ তৈরি করার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই অঞ্চলের কোনো দেশই এই ভাগ্যাহত মানুষদের আশ্রয় দিতে বা তাদের দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। কোনো দেশের সরকারই এই বিপজ্জনক যাত্রা ঠেকাতে বা আইনি উপায়ে তাদের স্থানান্তর করতে কার্যকর কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, সাগরে আমাদের চোখের সামনে শত শত মানুষের এই করুণ মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারি না। এই অবৈধ মানবপাচার রোধ করতে হলে টেকনাফ ও বঙ্গোপসাগরে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল আরও জোরদার করতে হবে এবং দেশের অভ্যন্তরে থাকা পাচারকারীদের স্থানীয় দালাল চক্রকে কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে এর স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে আছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার মধ্যে। তা না হলে, বঙ্গোপসাগরের জল এভাবে আরও কত হাজারো নিষ্পাপ প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হবে, তার উত্তর কারও জানা নেই।