রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঢাবি প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সমাবর্তন আজ\ প্রস্তুতি সম্পন্ন

মোস্তফা মানিক : ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় সমাবর্তনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল শুক্রবার গ্র্যাজুয়েটদের সমাবর্তন সামগ্রী বিতরণ ও মহড়া শেষ করা হয়েছে। সকাল ১০টায় মহড়াটি কার্জন হল থেকে শুরু হয়ে সমাবর্তনস্থলে গিয়ে শেষ হয়। গ্র্যাজুয়েটবৃন্দ এবং অতিথিদের অপেক্ষায় সমাবর্তনস্থল কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ মঞ্চ এখন অপেক্ষমান। সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী সবাইকে আজ শনিবার সকাল ৯টা থেকে প্রবেশ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বেলা ১১-৩০ মিনিটে শুরু হবে মূল অনুষ্ঠান। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে চ্যান্সেলর জিল্লুর রহমান, প্রধান বক্তা প্যাস্কেল লেমি, ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সরকারের মন্ত্রী এমপি, রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সিনেট সদস্য, সিন্ডিকেট মেম্বার, বিভিন্ন অনুষদের ডীনসহ সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন।

সমাবর্তনকে ঘিরে গত পরশু থেকেই ক্যাম্পাসে হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েটরা মুখরিত করে তুলেছে। গ্র্যাজুয়েটরা তাদের বিশেষ পোশাক গাউন পড়ে বন্ধু প্রিয়জনদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছে। প্রতিটি হলে এ নিয়ে হৈ-চৈ আর আনন্দ উল্লাসে ব্যস্ত ছিল তারা। উপহার সামগ্রী পাওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাসের বিশেষ স্থানগুলো- কার্জন হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ, টিএসসি, সিনেট ভবনসহ প্রতিটি হলে ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। এ উপলক্ষে আজ শনিবার ও আগামীকাল রোববার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় দু' কোটি টাকা ব্যয়ে এ অনুষ্ঠান আজ দুপুরে শেষ হবে। গ্র্যাজুয়েটরা তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সার্টিফিকেট গ্রহণ করবে। গত কয়েকদিন গ্র্যাজুয়েটদের পদচারণায় ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করাটাও মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এত বড় সমাবর্তনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম কিবরিয়া বলেন, ঢাবির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করতে পারবো বিষয়টা ভাবতেই নিজের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। সমাবর্তনের এ আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে কয়েকদিন যাবৎ চাকরির পড়াশুনাই বন্ধ করে দিয়েছি। তবে এবার দ্রুত কাঙ্ক্ষিত চাকরিটা পেয়ে গেছে সত্যিকারার্থে জীবনটা স্বার্থক হবে।

এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং ইনস্টিটিউটের গ্র্যাজুয়েটদের মনে কাজ করছে এক অন্য রকম উত্তেজনা। কালো গাউন আর মাথায় ক্যাপ দিয়ে সমাবর্তন যোগ দেয়ার অপেক্ষার প্রহর গুণছে এসব পিএইচডি, এমফিল ও গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রিধারীরা। তারাও সুযোগ পেয়ে গত বুধবার থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অঙ্গনকে বানিয়েছিল এক মিলনমেলায়। এ বছর ১৬ হাজার আট শত ২৬ জন গ্রাজুয়েটকে সনদ প্রদান করা হবে। এদের মধ্যে রয়েছে ৫৩ জন এমফিল এবং ১০০ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী। ভালো ফলাফলের জন্য ৫৮ জনকে ৬২টি স্বর্ণপদক প্রদান করা হবে। এছাড়াও এবারের সমাবর্তনের আকর্ষণ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাসচিব প্যাসকেল ল্যামিকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লজ ডিগ্রি প্রদান। সমাবর্তন সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার সমাবর্তন বাজেট বা খরচ ধরা হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। সমাবর্তনে নিবন্ধন ও সনদের জন্য অনার্সে এক হাজার ৩০০ টাকা এবং অনার্স-মাস্টার্স একসঙ্গে সমাবর্তন নিবন্ধন দুই হাজার তিনশত টাকা করে নেয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে এক কোটি টাকারও বেশি স্পন্সর পাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সোনালী, জনতা, অগ্রণী, শাহজালাল ইসলামী ও আইসিবি ব্যাংক এবং লঙ্কা-বাংলা স্পন্সর প্রতিষ্ঠান হয়েছে। এই আয় থেকেই সমাবর্তনের সব ব্যয় নির্বাহ করা হবে। সূত্র জানায়, সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সমাবর্তনের দিন সকাল সাড়ে ৯টায় খেলার মাঠের সুইমিংপুল সংলগ্ন গেট খুলে দেয়া হবে এবং সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে অবশ্যই তাদের সমাবর্তনস্থলে আসন গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য জিমনেসিয়াম সংলগ্ন গেট সকাল সাড়ে ৯টায় খুলে দেয়া হবে এবং বেলা পৌনে ১১টার মধ্যে তাদের অবশ্যই সমাবর্তনস্থলে আসন গ্রহণ করতে হবে।

আজ ৪৬তম সমাবর্তনের অনুষ্ঠানসূচির মধ্যে রয়েছে- চ্যান্সেলরের র‌্যালি, জাতীয় সঙ্গীত, চ্যান্সেলর কর্তৃক সমাবর্তনের উদ্বোধন, অতিথিকে সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান, স্বর্ণপদক প্রদান, গ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েটদের ডিগ্রি প্রদান, অতিথিদের বক্তব্য এবং জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে সমাবর্তনের সমাপ্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ সমাবর্তন সফল করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে সর্বাত্মক প্রস্তুতি। খেলার মাঠে চলছে প্যান্ডেল তৈরির কাজ। কারো যেন সময় নেই। সবাই তাদের নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। পুরো মাঠ সাজানো হবে গ্র্যাজুয়েট ও আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। সমাবর্তন অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য একটি নির্বাহী কমিটি, একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ২৩টি উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি কমিটির ওপর আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সমাবর্তনের প্যান্ডেল তৈরির কাজও প্রায় শেষ। সমাবর্তনের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘‘প্রত্যেক ছাত্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পর স্বপ্ন থাকে সমাবর্তনের মাধ্যমে তার শিক্ষা জীবনের প্রাপ্তি সনদপত্র গ্রহণ। আমরা এই সমাবর্তনকে সার্থক করে তোলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছি।’’ সমাবর্তনের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আমজাদ আলী বলেন, ‘‘সমাবর্তনে আগত অতিথিদের জন্য কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে। এই দিন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি।’’ তিনি বলেন, ‘‘সমাবর্তনের দিন নিরাপত্তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব, এসএসএফ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যসহ ৫০০ জন বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও গার্লস গাইড নিয়োজিত থাকবে।’’ উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০তম এবং স্বাধীনতার পর প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। তাই এবারের সমাবর্তনটি হচ্ছে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সপ্তম সমাবর্তন। ২০০৯ সালের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫তম সমাবর্তন এবং ওই সমাবর্তনে নয় হাজার ৫৮ জন গ্র্যাজুয়েটকে সনদ প্রদান দেয়া হয়।

ভিসি অফিস থেকে জানা যায়, ১৯২১ সালে একাডেমিক কার্যক্রম চালুর পর ব্রিটিশ আমলে সর্বপ্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকে ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে শেষ সমাবর্তন হয় ১৯৪৬ সালের ২১ নবেম্বর। পাকিস্তান আমলে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ।

এরপর ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আরো ১৫টি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ সমাবর্তন ১৯৭০ সালের ৮ মার্চ ৩৯তম সমাবর্তন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ