রবিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২২
Online Edition

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে তরুণ অধিনায়ক সোহানকে

রফিকুল ইসলাম মিঞা : বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে এখন তরুণদের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। এ জন্য সিনিয়র ক্রিকেটারদের অবসরের আগেই তরুণদের কাধে দায়িত্ব দিয়ে প্রস্তুত করে নিতে চায় টাইগারদের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ইতোমধ্যে অবশ্য এটা নিয়ে কাজ শুরু করেও দিয়েছে বিসিবি। তাইতো জিম্বাবুয়ে সফরে টি-টোয়েন্টি সিরিজে দলের বাইরে রাখা হয়েছে সাকিব আল হাসান, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আর মুশফিকুর রহিমের মতো অভিজ্ঞদের। আর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে আগেই বিদায় নিয়েছে মাশরাফি বিন মর্তুজা ও তামিম ইকবাল। দীর্ঘদিন ক্রিকেট দলকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্বে থাকা পঞ্চপান্ডব বলে খ্যাত এই ৫ সিনিয়র ক্রিকেটারকে অনেকটা বাইরে রেখেই নতুনদের প্রস্তুত করছে বিসিবি। ফলে তরুণদের দলের হাল ধরার এটাই বড় সুযোগ। দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে শুধু তারুণ্যে নির্ভর দলই নয়, যোগ্য আর নতুন নেতৃত্বও চায় ক্রিকেট বোর্ড। এরই অংশ হিসেবে জিম্বাবুয়ে সফরেই অভিজ্ঞ অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে সরিয়ে দলের নেতৃত্ব দেয়া হয়েছে তরুণ উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান নুরুল হাসান সোহানকে। দেশের অস্টম অধিনায়ক হিসেবে টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব দিবেন সোহান। সোহানের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ দল এখন আছে জিম্বাবুয়ে সফরে। আজ তার নেতৃত্বে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টির সিরিজের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামছে বাংলাদেশ দল। এই সফরে শুধু তরুণ নেতৃত্বই নয়, পুরো দলটাও তারুণ্যে নির্ভর। কারণ এই প্রথম দলে নেই সিনিয়র ৫ ক্রিকেটার মাশরাফি,সাকিব, তামিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াও ও মুশফিকুর রহিমদের কেউ। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে বিশ্রাম দিয়ে দলের অধিনায়ক করা হয়েছে নুরুল হাসান সোহানকে। দলে রাখা হয়নি মুশফিকুর রহিমকেও। আর জিম্বাবুয়ে সফর থেকে ছুটি নেওয়ায় সাকিব আল হাসানকেও পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ফলে অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচেই কঠিণ চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে দলের তরুণ কান্ডরী সোহানকে। অবশ্য এটা সোহানের জন্য বড় ধরনের পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় পাস করেই সোহানকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে এগিয়ে যেতে হবে। প্রস্তুত থাকতে হবে দলের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য। বাংলাদেশ দলের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মূলত সাকিব। সাকিব ছুটিতে থাকায় এ সিরিজের জন্য সোহানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সাকিব ফিরলে সোহান তার ডেপুটির দায়িত্ব পালন করবেন।

সোহানের সামনে বড় সুযোগ এই সিরিজে নিজের যোগ্যতা প্রমান করার। অবশ্য সোহানও প্রস্তুত। বাংলাদেশের নতুন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক চান লড়াকু একটা দলের নেতৃত্ব দিতে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে "ভয়হীন ক্রিকেট" খেলতে। দায়িত্ব নেয়ার পর এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। তবে কাজটা কিন্তু মোটেও সহজ নয় তার সামনে। কারণ এই ফরম্যাটে অনেক পিছিয়ে আছে টাইগাররা। শেষ ১৩টি টি-টোয়েন্টির মধ্যে মাত্র একটি ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। আবার এই জিম্বাবুয়ে সফরে নেই সিনিয়র ক্রিকেটাররা। ফলে এমন একটি দলের নেতৃত্ব দেয়া বড় চ্যালেঞ্জই। তবে নিজের কাঁধে আসা এই দায়িত্বকে বেশ গুরুত্ব সহকারেই নিচ্ছেন সোহান। দায়িত্ব পাওয়ার পর আত্ববিশ^াসের সাথেই তিনি বলেছেন, ‘অধিনায়কত্ব অবশ্যই গর্বের বিষয়। কিন্তু আমি সামনের চ্যালেঞ্জ নিয়েই বেশি ভাবছি। প্রতিটি স্তরে আমি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছি, আমি খেলোয়াড়দের একটি দল হিসেবে খেলার প্রচেষ্টা চালিয়েছি। আমি এটাকেই দলের ‘প্রধান সংস্কৃতি’ হিসেবে অব্যাহত রাখতে চাই। আমার মধ্যে খুব কমই প্রত্যাশা এবং উত্তেজনা কাজ করে। আমি ফলাফল বা অতীত নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি না। এই জিনিসগুলো আমার কাছে আসলেই কোনো ব্যাপার না। আমি অনেকদিন ধরেই সফলতার সাথে এটা মোকাবিলা করছি। আগের অধিনায়কদের কাছ থেকে যা শিখেছি তার সেরা বিষয়গুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করবো। রিয়াদ ভাইয়ের (মাহমুদুল্লাহ) অধীনে খেলে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমি সেই অভিজ্ঞতাগুলোর প্রত্যেকটি থেকে কিছু না কিছু নিয়ে কাজ করতে চাই। নির্ভীক ক্রিকেট খেলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটা আরও সুযোগ তৈরি করে দেয়। আমরাও আমাদের প্রক্রিয়ায় লেগে থাকতে চাই কিন্তু আমরা এখনই খুব বেশি এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারি না।’ তরুণ সোহানকে টি-টোয়েন্টি দলের দায়িত্ব দিয়ে ভালো করার ব্যাপারে অনেকটা আশাবাদী ক্রিকেট বোর্ডও। অভিজ্ঞদের না রেখে তরুণদের নিয়ে জিম্বাবুয়ে সফরের টি-টোয়েন্টি দল সাজানোর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান জালাল ইউনুস। তিনি বলেন, ‘সোহান ঘরোয়া ক্রিকেটে নেতৃত্বে দিয়েছে। ওর মধ্যে লিডারশিপ কোয়ালিটি দেখেছি। নেতৃত্বে দেয়াটা কোনো একজনের সিদ্ধান্ত না, এটা বোর্ডের। আমরা সবাই আলাপ আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সোহানকে নেতৃত্ব দিয়েছি। আমরা মনে করছি যে তার নেতৃত্বগুণ আছে, অ্যাগ্রেসিভ, মোটিভেট করতে পারে, স্পিরিটেড এ ব্যাপারে আমরা নির্বাচকরাসহ সবাই একমত হয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।' অবশ্য দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের টি-টোয়েন্টি দলকে সফলভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞা আছে নুরুল হাসান সোহান। নেতৃত্বের পাশাপাশি ভালো ব্যাটিং করারও ক্ষমতা আছে তার। এর আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে অধিনায়কত্বের কঠিন দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন সোহান। ২০২১ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার টি-টোয়েন্টি লিগে শেখ জামালের হয়ে বেশির ভাগ ম্যাচ জিতেছেন সোহান। দলকে শিরেপাও এনে দিয়েছেন বলিষ্ট নেতৃত্ব গুনে। সোহানের মাঝে দেখা গেছে ইতিবাচক ও আক্রমণাত্মক মনোভাব। সে পুরো দলকে উজ্জীবিত করে পারে। খেলার মধ্যে সে দারুণ সিরিয়াস। প্রতিটি খেলোয়াড়ের কাছ থেকে শতভাগ আদায় করে নিতে পারে সে। অধিনায়ক থাকা অবস্থায় ব্যাট হাতেও সফল সোহান। তবে ঘরোয়া ক্রিকেট আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পার্থক্যটা অনেক। সেই সাথে আছে দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার চাপ। সহজে হয়তো সাফল্যও আসবে না। তবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে জাগিয়ে তোলার জন্য একটা কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে সোহানের অধিনায়কত্ব। অধিনায়ক হওয়ার আগ পর্যন্ত টি-টোয়েন্টিতে ৩৩ ম্যাচের ২৯ ইনিংস ব্যাট করে সোহান সংগ্রহ করেছেন মোটে ২৭১ রান। গড় মাত্র ১২.৯০ এবং স্ট্রাইকরেট ১১১.৯৮। এই ফরম্যাটে তার সর্বোচ্চ স্কোর অপরাজিত ৩০* রান। ২০১৬ সালে ক্যারিয়ারের তিন নম্বর ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিনি এই রান করেছিলেন।

জিম্বাবুয়ে সফরে সোহানকে নতুন অধিনায়ক হিসেবে বেঁছে নেয়ায় খুশি সিনিয়র ক্রিকেটাররাও। সাকিব আল হাসান, মাশরাফি, মুশফিক আর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। টেস্ট অধিনায়ক সাকিব আল হাসান বলেন, ‘আমি মনে করি সে একজন যোগ্য অধিনায়ক। বিসিবিও মনে করে সে বাংলাদেশ দলের হয়ে ভবিষ্যতে অবদান রাখতে পারে, এজন্যই তারা তাকে অধিনায়ক করেছে। আমি তার মঙ্গল কামনা করছি। আমি আশা করি, সে জিম্বাবুয়ের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারবে।’ মাশরাফি বলেন, ‘‘নুরুল হাসান এখনও অনেক তরুণ। কম বয়সে সুযোগ পেয়েছে, এখন অবশ্যই ওর সেই তাড়না আছে। মাঠে ছুটোছুটি করে সবাইকে সক্রিয়া রাখা, এই ব্যাপারগুলি ওর কাছ থেকে আমরা আশা করি। ওকে এজন্যই দলে নেওয়া হয়ছে। ওর যেটা কাজ ছিল সেটা ঠিকমতোই করতে পেরেছে। আশা করি এটা ধরে রেখে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য আরও ভালো কিছু করবে।’ নুরুল হাসান সোহান ঘরোয়া লীগে অধিনায়ক হিসেবে পরিক্ষিত। অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেলে নিজেকে প্রমাণ করেছেন দারুণভাবে। সোহানের নেতৃত্বে ২০১৯ সালে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের ডিপিএলে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব চ্যাম্পিয়ন হয়। সেই টুর্নামেন্টে ১৬ ম্যাচে দলকে ৯ জয়ী করে প্লেয়ার অফ দ্যা টুর্নামেন্টের পুরস্কার জয় করেন সোহান। ঘরোয়া ক্রিকেট পেরিয়ে এবার জাতীয় দলের ভার তার উপর। ফলে জিম্বাবুয়ে সফরে সোহানের আরেক বার নিজেকে প্রমাণের সুযোগ। সেই প্রত্যাশায় আজ অভিষেক হচ্ছে অধিনায়ক সোহানের। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ