সোমবার ০৮ আগস্ট ২০২২
Online Edition

মধ্য আয়ের দেশের নমুনা

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী: আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গেছি বলে অনেক ঢাকঢোল পেটানো হয়েছে। এর ওর সার্টিফিকেট জোগাড় করতে আমলারা গলদঘর্ম হয়েছে। সত্যি সত্যি মধ্যম আয়ের দেশ তো আর হওয়া দরকার নেই  । বিদেশীরা যদি স্বীকার করে যে, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গেছে, তাহলেই হয়ে যায়। সেজন্য বাংলাদেশের মন্ত্রী-আমলারা বিশে^র দেশে দেশে সফর করেছেন। তার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। হোক। কিন্তু যদি বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি এনে দেয়া যায়, তাহলে আমলাদের কপাল ফিরছে। আর সেসব সূত্রে পদ নেই তবু উচ্চপদে পদোন্নতি পেয়েছেন শত শত আমলা। সেটা কী? ডেপুটি সেক্রেটারি, ডেপুটি সেক্রেটারিই রয়ে গেছেন। বেতন ভাতা পাচ্ছেন যুগ্ম সচিবের। এই লেভেলের কর্মকর্তারা বিনাসুদে ‘গাড়ি কেনার জন্য ঋণ পেয়েছেন আবার ওই গাড়ি চালানোর জন্য ভাতা পেয়েছেন। এদিকে সরকারের বরাদ্দকৃত গাড়ির তেল, ড্রাইভার তো আছেই। অর্থাৎ, একজন যুগ্ম সচিব দুটি গাড়ির সুবিধা ভোগ করছেন। 

পৃথিবীর ইতিহাসে আমলাদের জন্য এতো সুবিধা আর কোনো দেশে নেই। এমনকি যেসব দেশে সামরিক শাসন জারি আছে, সেসব দেশের সামরিক আমলারা এত সুবিধা পান না। মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণা দিয়ে আমলাদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিতে ঘুষের মাত্রাও দ্বিগুণ, তিনগুণ, চারগুণ হয়েছে। অভিযোগ আছে, একটি কনস্টেবলের চাকরির জন্য আট-দশ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়, আমার এক সহকর্মী একদিন এসে বললেন, তিনি চাকরি ছেড়ে দেবেন। যদিও আমাদের অফিসে চাকরিগুলো খুব কম বেতনের, তবে নিয়মিত বেতন হয়। আমি বললাম, চাকরি কেন ছাড়বেন? তিনি জানালেন ছেলেকে পুলিশে দেবেন। ছেলে মাস্টার্স, পুলিশের যেকোনো চাকরিতে তাকে দিতেই হবে। অফিস থেকে যেটুকু বেনিফিট পাই সেই টাকার সঙ্গে টঙ্গীর একখ- জমি বিক্রি করে তিনি ঘুষের টাকা পরিশোধ করবেন। আমি নিষেধ করলাম। বললাম, আপনার জমি বিক্রির টাকা ও অফিসের বেনিফিটের টাকা দুটোই মার যেতে পারে, হতে পারে আপনার পুরো টাকাটাই মার যাবে। তার চেয়ে বরং চাকরিও থাক, জমিও থাক। ওই জমিতে টিনের ঘর তুলে ভাড়া দিলেও আপনি মাসে হাজার বিশেক টাকা ভাড়া পাবেন। তিনি শুনলেন না, চাকরি ছেড়ে দিলেন। জমি বিক্রি করতে পেরেছিলেন কিনা খোঁজ নেইনি। দিনকালের টাকাও হাতছাড়া হয়ে গেল। পুলিশে ছেলের চাকরি হয়নি। পড়ন্ত বয়সে শুরু হয় তার জীবন-সংগ্রাম। নিশ্চয় তা ছিল অতীব দুঃখের। পরে তার কি হয়েছিল জানি না। চাকরি নাই, জমি বেদখল। চিন্তায় চিন্তায় তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তারপর একদিন পরপারের ডাকে সাড়া দিয়ে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন। মৃত্যু সংবাদ পেলাম। কিন্তু ততক্ষণে আমার কিছুই করার ছিল না।

মধ্যম আয়ের দেশে এ এক নিষ্ঠুর নমুনা। মধ্যম আয়ের দেশের প্রধান শর্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সরকারের মন্ত্রী থেকে চেলাচামু-ারা পর্যন্ত শোর তুলেছে। কি আনন্দ, কি আনন্দ, আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। সরকার বলে মাথাপিছু আয় ২৭০০ ডলার করেছি, এটা কম নয়। এটা ভারত, পাকিস্তানের চাইতেও বেশি। সে আর এক আনন্দ। আমার গাড়ি চালক একদিন জিজ্ঞেস করলেন, স্যার এই যে মাথাপিছু আয় বাড়লো তাতে আমার কি হলো, আমার আয় তো বাড়লো না। আমার ভাইও ড্রাইভার, তারও আয় বাড়েনি। তাহলে মাথাপিছু আয় কাদের জন্য বাড়লো? প্রথমে একটু থমকে গেলাম, কারণ আমারও আয় বাড়েনি। আগে পত্রিকায় একটি লেখা লিখে দু’হাজার টাকা পেতাম। এখনও তাই পাওয়া যায়। কিন্তু সব পত্রিকার বেতনই বন্ধ। কনট্রিবিউটরের টাকা দেবে কোথা থেকে। এই হলো মধ্যম আয়ের দেশের নমুনা। গাড়ি চালক তার কথা বলেই যায়, আমি বলি বাবা আয় বেড়েছে তাদের, যাদের শত শত কোটি টাকা আছে। ফকিন্নী ফকিন্নীই রয়ে গেছে, মজুর মজুরই রয়ে গেছে, ঠেলাওয়ালা ঠেলাই চালায়, কাওরান বাজারের ভেতর থেকে মাল বয়ে এনে যে মিনতি ৫ বছর আগে বিশ টাকা পেত, এখনও বিশ টাকাই পায়। মধ্যম আয় এদের স্পর্শ করেনি।

সরকার মাঝে মধ্যেই বলে, তারা গরিবের জন্য কত কি যে করেছে। তার তালিকা লিখে শেখ করা যাবে না। এরমধ্যে একটা ব্যবস্থা ছিল অতি দরিদ্রদের জন্য ট্রাকসেল। বাজারে যে সয়াবিন দুইশ টাকার উপরে ট্রাকসেলে তা একশ টাকা। প্রথম প্রথম দরিদ্ররাই এই ট্রাকের লাইনে দাঁড়াতেন। কিন্তু অসহনীয় বাজার মূল্যের কারণে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেরা ছিন্ন কাপড়ে মহিলার পেছনে ব্যাগ হাতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, কাঁদছেন না কিন্তু বোঝা যায় অন্তরাত্মা কান্নায় ভরে আছে। তারা ওই লাইনে দাঁড়িয়ে কোনোদিকে তাকান না, মাথানিচু করে অগ্রসর হন, টিসিবির গাড়ি আসার কথা দশটায়, গাড়ি আসে তিনটা, চারটায়, কখনো আসেই না। কখনো বিশ-পঞ্চাশ জনকে এই পণ্য দিয়ে বলা হয় আর নেই। গাড়ি দ্রুত টেনে তার গন্তব্যে চলে যায়। 

এখন চালু হয়েছে নতুন সিস্টেম। আমি আজ লাইনে দাঁড়িয়েছি, ভাগ্য ভালো হলে আমাকে একটা টোকেন দেয়া হবে, পরদিন টোকেন ওয়ালারা অগ্রাধিকার পাবে। এসব টোকেনও নি¤œবিত্ত, মধ্যবিত্তরা পায় না। অসৎ দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা দশ-পনের জন করে লোক দাঁড় করিয়ে দেয়। ধরা যাক, তাদের দেয়া হলো একশ টোকেন, পরদিন ওই টোকেন ওয়ালারাই সামনে গিয়ে টোকেন দেখিয়ে পণ্য নিয়ে যায়। খুব সাধারণ মানুষ কেবলই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাগ্যগুনে কোনোদিন পণ্য পায়, কোনোদিন পায় না। পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে থেকে তামাশা দেখে। কিসের টোকেন, যে আগে আসবে তাকে আগে দিন এই ব্যবস্থা ইতঃপূর্বে ছিল। এখন এটা নিয়েও বাণিজ্য হচ্ছে। পাড়ার মাস্তানরা একটা আয়োজন করেছে। তাদের টোকেন ওয়ালারা আগে পণ্য পাবে। কেউ দেখেও দেখে না। মাস্তান নিয়ন্ত্রিত সরকার দেখেও দেখে না। এই সমস্যা সমাধানের পথ কারো জানা নেই। দরিদ্র মানুষেরা শূন্য হাতে ঘরে ফিরে যায়। এই হলো ট্রাক সেলের অবস্থা। 

ধরা যাক আগে আমি ভাড়া থাকতাম, এখন ভাড়া থাকি লালবাগে। আমি বকসীবাজার ট্রাকসেলের লাইনে দাঁড়াতে পারবো না। আমাকে দাঁড়াতে হবে লালবাগ ট্রাকসেলের লাইনে। তার ওপর টোকেনের উৎপাত। তার ওপর নি¤œবিত্ত নি¤œমধ্যবিত্তের গ্লানি তো আছে। এই দুর্বৃত্তগীরি দেখার কেউ নেই। সরকার তো নেই। এই নিয়ে বেশ আছি আমরা পিছিয়ে পড়া নাগরিকরা।

এবার একটি ছবির কাহিনী, টিসিবির ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, তারা পণ্য বিক্রি করছে, জীর্ণশীর্ণ পোশাকের মা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন কে জানে। তার দু’বছরের মেয়ে রহিমা মায়ের হাত ধরেই দাঁড়িয়েছিল। ট্রাক থেকে ছিটকে পড়ছে দু-একটা করে চাল, সেগুলো আছে ট্রাকের নিচে। রহিমা দু’হাত দিয়ে টেনে টেনে চালগুলো, সামান্য এক জায়গায় জড়ো করছে। 

মা যদি ট্রাকসেলের চাল না পায়। তবে রহিমার হাতের আঁজলা দিয়ে টেনে আনা চালই সম্ভবত ভরসা। এই ছবিটি গত বুধবার (১ জুন) প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে। শিশুটিকে দেখে চোখ ফেটে পানি আসে। মাথাপিছু আয়ওয়ালাদের ঘরেও কি এইটুকু শিশু সন্তান আছে? তারা কি কল্পনা করতে পারেন যে, তার ওই ছোট্ট শিশু ট্রাকের নিচ থেকে আঁজলা দিয়ে চাল তুলে আনছে? আল্লাহ মাবুদ, আমরা এ অবস্থা থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই। ক্ষমা করো প্রভু।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ