সোমবার ০৮ আগস্ট ২০২২
Online Edition

সুরমায় কমলেও পানি বাড়ছে কুশিয়ারায় ॥ ত্রাণ নিতে আসা মানুষের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ 

সিলেট মহানগরীর প্রতিটি এলাকায় সুরমার পানি ঢুকে কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কোমড় পানি। গতকাল শনিবার দুপুরে নগরীর প্রাণকেন্দ্র তালতলা হোটেল গুলসানের সামনে থেকে ছবিটি ক্যামেরাবন্দী করেছেন দৈনিক সংগ্রামের সিলেট ব্যুরোর ফটো সাংবাদিক ফয়সল আহমদ

সিলেট ব্যুরো : সিলেটে গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নগরীর প্রায় সবকটি ওয়ার্ডে সুরমা নদীর পানি ড্রেন দিয়ে ঢুকে পড়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পাশাপাশি সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জে সুরসা-কুশিয়ারা ও বরাকের তিন মহুনার বাঁধ ভেঙে বন্যার পানিতে সয়লাব হয়ে গিয়েছে এসব উপজেলা। এদিকে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ত্রাণ নিতে আসা অসহায় মানুষের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে বলে জানা গেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছেন। নগরীর অভিজাত এলাকা নামে খ্যাত উপশহরের বন্যা কবলিত বাসাবাড়িতে লোকজন না থাকায় প্রতিদিনই চুরি সংঘটিত হচ্ছে। বানভাসিদের মধ্যে সরকারের ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন লক্ষাধিক বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ। গণমানুষের সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে সিলেটের কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর এলাকায় দলের কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ শাবাহ উদ্দিন আহমদ ও কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের নেতৃত্বে সিলেট মহানগর ও জেলার নেতৃবৃন্দ বানভাসিদের মাঝে নগদ অর্থ ও খাবার বিতরণ করেছেন।

গতকাল শনিবার নগর জামায়াতের আমীর মো: ফখরুল ইসলামের সম্মতিতে নগর জামায়াতের সেক্রেটারি মো: শাহজাহান আলীকে আহবায়ক করে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও অসহায় মানুষের পাশে দাড়ানোর জন্য একটি ত্রাণ টিম গঠন করা হয়েছে। 

গতকালই তারা উপশহর এলাকার এ, বি, সি, ডি, জি, এফ, এইচ ও শহরতলীর টুকেরবাজার, তেমুখীসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যার্ত মানুষের মাঝে নগর অর্থ ও শুকনা খাবার বিতরণ করেন। তাদের এ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলে জানা যায়। এদিকে, সিলেটে সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমলেও ফুঁসে উঠেছে কুশিয়ারা নদী। 

গতকাল শনিবার প্রবাসী অধ্যুষিত বিশ্বনাথ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম কুশিয়ারা নদীর পানিতে সয়লাব হয়ে গিয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জেও কুশিয়ারা নদীর বিরূপ আকার ধারণ করেছে। উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের মধ্যে দু’টি ইউনিয়নের অনেক গ্রাম ডুবে গেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সাংবাদিক সম্মেলন করে সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জকে বন্যা কবলিত এলাকা ঘোষণা করার জোর দাবি জানিয়েছেন। 

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সুরমা নদীর পানি শুক্রবারের চেয়ে শনিবার দুটি পয়েন্টেই কমেছে। কুশিয়ারার পানি দুটি পয়েন্টে বাড়লেও কমেছে একটি পয়েন্টে। 

পাউবো সূত্রে আরও জানা যায়, কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় ছিল ১৩ দশমিক ৬৭ মিটার। শনিবার সকাল ৯টায় এ পানিসীমা হয় ১৩ দশমিক ৬০ মিটার। এ নদীর পানি সিলেট পয়েন্টে শুক্রবার ছিল ১১ দশমিক ০৯ মিটার, গতকাল সকালে হয়েছে ১১ দশমিক ০৫ মিটার।

তবে কুশিয়ারার পানি বেড়েছে মৌলভীবাজারের শেরপুর ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে। শেরপুরে শুক্রবার পানিসীমা ছিল ৭ দশমিক ৮১ মিটার, গতকাল তা হয় ৭ দশমিক ৯২ মিটার। ফেঞ্চুগঞ্জে শুক্রবার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ মিটার, শনিবার হয়েছে ৯ দশমিক ৮১ মিটার।

পাউবো সিলেটের উপসহকারী প্রকৌশলী নিলয় পাশা জানান, উজানে বৃষ্টি না হলে পানি আরও কমবে। পানি কমতে শুরু করলেও সুরমা, কুশিয়ারায় এখন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। তবে কমার ধারা অব্যাহত থাকলে দু’একদিনের মধ্যেই বিপৎসীমার নিচে নেমে যাবে পানিসীমা। তবে কুশিয়ারা নদীর পানি কমতে থাকলেও তা ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ হয়ে নামবে। ফলে ওই এলাকায় পানি বাড়ছে। এই দুই উপজেলার কিছু এলাকা প্লাবিতও হতে পারে।

এদিকে, সিলেট মহানগরীর বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে অনেকেই নিজের বাসাবাড়ি ছেড়ে গেছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। সেই সুযোগে বেড়েছে ছিঁচকে চোরের উপদ্রব। এ ছাড়া বন্যাদুর্গতা কয়েকটি এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ অবস্থায় চোরদের জন্য তৈরি হয়েছে মহা সুযোগ। ইতোমধ্যে অনেকের বাসাবাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটছে। চুরি ঠেকাতে পানিবন্দী অবস্থায়ও বাসিন্দারা বাসাবাড়ি পাহারা দিচ্ছেন।

গত ১০ মে থেকে সিলেটে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। সেই সঙ্গে উজান থেকে একের পর এক নামতে শুরু করে পাহাড়ি ঢল। ফলে ১১ মে থেকে  সিলেটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে থাকে। আর গত ১৩ মে থেকে সিলেট নগরের নিম্ন ও সুরমা তীরবর্তী এলাকাগুলো প্লাবিত হতে থাকে। ফলে ২০০৪ সালের মতো ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি দেখা দেয় সিলেটে।

বন্যা পরিস্থিতির কারণে নগরের শাহজালাল উপশহর, যতরপুর, শেখঘাট, কলাপাড়া, সোনাপাড়া, মেন্দিবাগ, মাছিমপুর, ছড়ার পার, চালিবন্দর কানিশাইল, মণিপুরি রাজবাড়ি, তালতলা, জামতলা এলাকার বাসিন্দারা গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পানিবন্দী অবস্থায় আছেন। এর মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ আছে শাহজালাল উপশহর, কলাপাড়া, মেন্দিবাগ ও মাছিমপুরসহ কয়েকটি এলাকায়। এ অবস্থায় সিলেট মহানগরীতে বেড়েছে ছিঁচকে চোরের উপদ্রব।  

নগরের জামতলা এলাকার বাসিন্দা ফারজানা নিশাত বলেন, ঘরের ভেতর হাঁটুপানি। চার দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। পরিবারের সবাই শিবগঞ্জের আরেকটি বাসায় উঠেছেন। এ সুযোগে গত বুধবার রাতে জানালার লক ভেঙে চুরির চেষ্টা করেছিল চোরেরা। তবে পাশের বাসার লোকজন টের পেয়ে চিৎকার দিলে দুই ব্যক্তিকে পালিয়ে যেতে দেখেন তারা। পরে তারা আমাদের খবর দেন। বৃহস্পতিবার দিনে গিয়ে দেখি, জানালার গ্রিল সামান্যে কেটে ফেলেছে। প্রতিবেশীরা টের না পেলে চোরেরা ঘরের সবকিছু নিয়ে যেতো। 

ত্রাণ নিতে আসা মানুষদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ : সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে গতকাল শনিবার ত্রাণ বিতরণ করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ এমপি। তবে তিনি ত্রাণ বিতরণ স্থল ত্যাগ করার পরপরই সেখানে ত্রাণ প্রত্যাশীদের মাঝে শুরু হয় কাড়াকাড়ি ও হট্টগোল। শনিবার সকাল ১০টায় উপজেলার থানাবাজার পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। 

জানা আয়, মন্ত্রী ইমরান আহমদ শনিবার সকালে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে কোম্পানীগঞ্জ আসেন। এ সময় ১২০ প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী নিয়ে আসেন তিনি। প্রতিটি ইউনিয়নের ২০ জন করে ৬ ইউনিয়নে ১২০ জনের জন্য ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে আসেন। কিন্তু মন্ত্রী ত্রাণ বিতরণ করবেন এমন খবর পেয়ে বন্যাকবলিত এলাকার প্রায় ৫শত মানুষের সমাগম হয় থানাবাজার নামক স্থানে। মন্ত্রী ৪-৫ জনকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে তিনি এখান থেকে চলে যান। মন্ত্রী যাওয়ার পরপরই সেখানে শুরু হয় ত্রাণ নিয়ে কাড়াকাড়ি। ধস্তাধস্তি করে অনেকেই ছিনিয়ে নেন ত্রাণের পেকেট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশলাঠিচার্জ করে। প্রায় ২০ মিনিট পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এদিকে, ত্রাণ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরেছেন বেশিরভাগ বানভাসি মানুষ।

এ বিষয়ে উপজেলার ইছাকলস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদুর রহমান সাজু ও পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াদ আলী জানান, মন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে এক ইউনিয়নে ২০ জনকে ত্রাণ দেওয়ার তালিকা করা হয়। কিন্তু মানুষ জড়ো হন কয়েক শ। কাকে রেখে কাকে দিবো এই ত্রাণ? গ্রাম ও ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী দিলে এমন মারামারি ও অনাকাঙ্খিক্ষত ঘটনা ঘটতো না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লুসিকান্ত হাজং বলেন, আমরা আজকে (শনিবার) ত্রাণ দেওয়ার জন্য ২০০ জনের তালিকা করেছিলাম। মন্ত্রীকে দিয়ে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। কিন্তু খবর পেয়ে সেখানে তালিকার বাইরের লোকজন এসে হট্টগোল শুরু করেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ