রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

‘কঠোর’ এবং ‘সর্বাত্মক’ লকডাউনের এদিক-সেদিক

আশিকুল হামিদ : সরকারের আড়ালে আমলাদের কীর্তিকলাপ নিয়ে আজকাল সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যঙ্গাত্মক আলোচনা শুরু হয়েছে এবং সে আলোচনা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। শুনতে খারাপ লাগলেও এমন পরিস্থিতির জন্য জনগণ নয় বরং সর্বতোভাবে আমলারাই দায়ী। এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে কথিত সর্বাত্মক লকডাউনের কথা বলা হচ্ছে। জেলায় জেলায় কার্যকর করা লকডাউন যখন শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে তেমন এক সময়ে গত ২৫ জুন সন্ধ্যায় ঘোষণা করা হয়েছিল, আগামী সোমবার তথা ২৮ জুন থেকে সারাদেশে শুধু লকডাউন নয়, ‘কঠোর’ এবং ‘সর্বাত্মক’ লকডাউন জারি ও কার্যকর করা হবে। নতুন পর্যায়ের এই লকডাউনের গুরুত্ব বোঝানোর উদ্দেশে সরকারের পক্ষ থেকে নানা পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল, জনগণ যাতে ভয় পায় এবং লকডাউনের বিধিনিষেধ মেনে চলার প্রস্তুতি নেয়।
এ উদ্দেশে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়েছিল যে, কঠোর ও সর্বাত্মক লকডাউন যাতে কার্যকর হতে পারে সেজন্য পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও মাঠে নামানো হবে।
‘কঠোর’ এবং ‘সর্বাত্মক’ এই লকডাউনের আগাম ঘোষণা আসলেও জনগণের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল। প্রতিক্রিয়াও যথেষ্টই লক্ষ্য করা গেছে। যেমন অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে পড়ার ভয় থেকে জনগণের একটি অংশ রাতারাতি রাজধানী ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য উন্মত্তের মতো চেষ্টা শুরু করেছিল। জনগণেরই অন্য একটি অংশকে আবার ঢাকায় ফেরার বা ঢোকার জন্য তৎপর হতে দেখা গেছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞায় সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচল না করলেও যারা যাওয়ার তারা যেমন, তেমনি যারা ফেরার তারাও রাত বা দিনের পরোয়া করেনি। প্রবল বৃষ্টিও তাদের থামিয়ে রাখতে পারেনি। সবাই কেবল ছুটেছে- কেউ ঢাকার দিকে, কেউ বা আবার ঢাকার বাইরের নানাদিকে।
শুধু ছুটে যাওয়ার কারণে নয়, কেনাকাটার কারণেও মানুষের পকেট থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেছে। কোনো কোনো মহলের হিসাবে মাত্র দুদিনের মধ্যেই কয়েক কোটি টাকা বাড়তি গুনতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। বলাবাহুল্য, ভীতিই ছিল অন্তরালের প্রধান কারণ- কেউই জানতো না, কতদিন চলবে এই নতুন লকডাউন। সেজন্য যাদের যা কিছু ছিল তা দিয়েই মানুষ বিশেষ করে চাল-ডাল কিনেছে। আগোরা ও স্বপ্নর মতো বড় বড় শপিংমলগুলোও শনিবার সকালে খালি হয়ে গিয়েছিল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। ভীত ও শংকিত মানুষ যা পেয়েছে তা-ই কিনেছে। কেনার জন্য রীতিমতো যুদ্ধও করেছে তারা। কিন্তু প্রায় সবাইকেই খালি হাতে না হলেও নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। কারণ, খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষই তাদের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য কিনতে পেরেছে। ক্যাশ কাউন্টটারে গিয়ে দাম পরিশোধ করার জন্যও প্রত্যেককে গড়ে ৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটেছিল ২৭ তারিখ-অর্থাৎ রোববারই। আর এর কারণ, আগের রাতে সরকারের পক্ষ থেকে এক ঘোষণায় জানানো হয়েছিল, সোমবার থেকে নয়, কঠোর এবং সর্বাত্মক লকডাউন হবে বৃহস্পতিবার তথা ১ জুলাই থেকে। লক্ষণীয় যে, অমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাও প্রচার করা হয়েছিল রাত ১২টার দিকে- প্রায় মধ্যরাতে। বলা হচ্ছে, সিদ্ধান্তটি নিশ্চয়ই মধ্যরাতে নেয়া হয়নি। নেয়া হয়েছিল আরো আগেই। তখন যদি সঙ্গে সঙ্গে বা স্বল্প সময়ের মধ্যে জানিয়ে দেয়া হতো তাহলেও বহু মানুষের শারীরিক কষ্ট ও মানসিক চাপ অনেক কমে যেতো। কারণ, বিশেষ করে ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য যারা গাড়ি যোগাড়ের চেষ্টায় ছিলেন তারা একটু দম ফেলার সময় পেতেন। অন্যদিকে চাল-ডাল কেনার চেষ্টায় যারা ছিলেন তারাও কিছুটা স্বস্তি পেতে পারতেন। কিন্তু মানুষকে এটুকু স্বস্তি ও শান্তি দেয়ার সামান্য চিন্তা বা সদিচ্ছাও ছিল না সেই তাদের মনে, যারা জড়িত ছিলেন সিদ্ধান্ত তৈরির প্রক্রিয়ায়। যেন-তেন কেউ নন তারা, তাদের প্রত্যেকেই এক-একজন কীর্তিমান আমলা!  
বলাবাহুল্য, আমলাদের প্রসঙ্গ অকারণে টেনে আনা হচ্ছে না। পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে, রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রে লকডাউনের ঘোষণা, এর মেয়াদ বাড়ানো এবং প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তার পেছনে রয়েছে এই আমলাদের কর্মকাণ্ড। যেমন করোনার প্রাথমিক দিনগুলোতে কিছু না বুঝেই তারা পাশ্চাত্যের অনুকরণে ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে ‘সামাজিক’ দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা জারি করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কিছুই বুঝতে পারেনি। অথচ কথাটা হওয়া উচিত ছিল একজন থেকে অন্যজনের ‘শারীরিক’ দূরত্ব- যা ইদানীং বলা হচ্ছে এবং মানুষেরও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। এদিকে সাধারণ মানুষেরাও বলেছেন, লকডাউনের মতো জটিল অথচ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়ে অবশ্যই সহজ ও সরল পন্থা নেয়া দরকার ছিল। বাসের বা যানবাহনের কথাই বলা যাক। বাস মালিকদের সঙ্গে যোগসাজসের ভিত্তিতে আমলারা একদিকে সরকারের নামে বাসের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়েছেন, অন্যদিকে করোনার সংক্রমণ যাতে না ঘটতে পারে সে যুক্তি দেখিয়ে বাসে দু’জনের সিটে একজন করে যাত্রী ওঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। এর অজুহাতেই ৬০ শতাংশ ভাড়া  বাড়ানো হয়েছে। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে বিষয়টির মধ্যে আপত্তির কোনো কারণ থাকার কথা নয়। কেননা, এভাবে কথিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হলেও হতে পারতো।
অন্যদিকে বাস্তব অবস্থা কিন্তু অমন যুক্তিকে সমর্থনযোগ্য করতে পারেনি। কারণ, দু’জনের সিটে একজন করে যাত্রী ওঠানোর মাধ্যমে কোনোভাবে দূরত্ব বজায় রাখা যেমন সম্ভব হয়নি তেমনি বাসে ওঠার সময় যাত্রীদের ঠেলাঠেলিও রয়েছে স্বাভাবিক সময়ের চাইতে অনেক বেশি। বাস স্ট্যান্ডগুলোতেও ভিড় বেড়েছে অবিশ্বাস্যভাবে। এর ফলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যুক্তি বা অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারেনি। বরং করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশংকা বেড়েছে, করোনা ছড়িয়ে পড়েছেও।
ওদিকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সময় কমিয়ে দেয়া হলেও হাট-বাজার, অফিস-আদালত এবং ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকছে যথারীতি। রাস্তায় ও মার্কেটে তো বটেই, অফিস-আদালতেও প্রায় কারো মধ্যেই মুখে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সামান্য লক্ষণ দেখা যায়নি, এখনও দেখা যাচ্ছে না। ফলে লংঘিত হচ্ছে সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব  বজায় রাখার নির্দেশনা। অন্যদিকে এমন অবস্থার মধ্যেও গঠনমূলক ও সম্ভাবনাময় কোনো ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক এলাকায় শুধু সেই লকডাউনই ঘোষণা করা হচ্ছে, যা শুরু থেকেই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। এই তো ক’দিন আগে রাজধানীর চারপাশের সাত জেলায় লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। এসব জেলায় ২২ থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব ধরনের কার্যক্রম ও যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধ করেছে সরকার। সরকারের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই সাত জেলায় ঢাকা থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস চলবে না; দূরের যাত্রার ট্রেন চলাচল করলেও সাত জেলার কোথাও থামবে না। এছাড়া ঢাকা থেকে যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলও এসব জেলায় বন্ধ থাকবে।
কিন্তু সরকার নিষিদ্ধ করলেও সাত জেলায় শুধু নয়, সাধারণভাবে দেশের কোনো এলাকাতেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হচ্ছে না। এর ফলে বিশেষ করে ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে দ্রুত করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে চলেছে। অতি উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ৪০টি জেলা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, ২৩ জুন পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৭২৭ জন, যা গত আড়াই মাসের মধ্যে একদিনে সর্বাধিক। দুই মাসের বেশি সময় পর সেদিন শনাক্তের হারও ২০ শতাংশ পার হয়ে গেছে এবং মারা গেছে ৮৫ জন।
খবরে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে করোনা শুরুর প্রাথমিক দিনগুলোতে সংক্রমণ এবং মৃত্যু দুটিই বেশি ছিল ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। কিন্তু এখন বেশি হচ্ছে ঢাকার বাইরে- উত্তর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এর প্রধান কারণ লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মানুষের চলাচল এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানা।
প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, লকডাউনের জেলা হলেও সেখানে এখনও প্রতিদিন প্রচণ্ড যানজট হচ্ছে এবং কেউই সামাজিক দূরত্বসহ বিধিনিষেধ মেনে চলছে না। এর ফলে নারায়ণগঞ্জে শুধু নয়, সীমান্তবর্তী ১৫টি জেলাসহ সারাদেশেই করোনার সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। মাত্র পাঁচ জেলায় সংক্রমণ কিছুটা কমলেও ১৬ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সংক্রমণের হার পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে রাজধানীর চারপাশের সাত জেলায় লকডাউন কার্যকর করা হলেও এসব জেলায় ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত সংক্রমণ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে মানুষকে লকডাউন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীকে অনেক বেশি কঠোর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহার আগে  সংক্রমণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা না গেলে দেশের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়বে। মৃত্যু ঘটবে অসংখ্য মানুষের। তাছাড়া করোনাও সহজে যাবে না।
সরকারের আড়ালে তৎপর আমলারা এসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখছেন বলে মনে হয় না। এজন্যই একদিকে তারা লকডাউন ঘোষণার সহজ পথে হাঁটছেন, অন্যদিকে  দু’জনের সিটে একজন বসানোর নামে ঠেলাঠেলি এবং ভিড় বাড়ানোর বিপদজনক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন। তাদের ভাষাও এখনও জনগণের জন্য সহজবোধ্য হতে পারেনি। করোনায় বিপন্ন হয়ে পড়া সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যাপারেও লক্ষ্য রাখছেন না তারা। মূলত আমলাদের এই মানসিকতার ভিত্তিতেই নতুন পর্যায়ে কঠোর এবং সর্বাত্মক লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রথম দু’দিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে প্রচণ্ড ধাওয়ার মুখে রাখার পর হঠাৎ করে ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্তও আমলাদের স্বার্থেই নেয়া হয়েছে বলে জোর আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, ২৮ জুন থেকে কার্যকর করা হলে আমলারা তাদের বেতন ও ঈদের বোনাসসহ অন্যান্য ভাতা পেতেন না।
ফলে সাধারণ মানুষের মতো তারাও সমস্যায় পড়তেন। এজন্যই তারা ১ জুলাইকে বেছে নিয়েছেন, যাতে ওই তারিখের মধ্যে বেতন ও ঈদের বোনাসসহ সকল ভাতা পাওয়া সম্ভব হয়। সাধারণ মানুষের যতো কষ্টই হোক না কেন, আমলারা নিজেদের স্বার্থকে এভাবেই নিশ্চিত করেছেন।  
কিন্তু কঠিন সত্য হলো, আমলারাই সব নন। সরকারের উচিত জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া এবং জনগণকে কম কষ্ট দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া। নতুন পর্যায়ের কঠোর এবং সর্বাত্মক লকডাউনে জনগণ যাতে ভোগান্তির শিকার না হয়-বিশেষ করে তারা যাতে আয়-রোজগার করতে পারে এবং তাদের যাতে অনাহারে কাটাতে না হয়- এসব বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। কেবলই আমলাদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ