শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

কঠোর বিধি-নিষেধে বিপদে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষ

ইবরাহীম খলিল : মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে গাজীপুরসহ ঢাকার চারপাশের সাত জেলায় কঠোর বিধিনিষেধ। ভারতীয় রূপ ঢাকা যেন আসতে না পারে সেজন্যই এই ব্যবস্থা। বলা হচ্ছিল এই বিধিনিষেধের ফলে ঢাকা থেকে ওই জেলাসমূহে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। আবার এসব জেলা থেকে কোন মানুষ ঢাকার ভেতর আসতে পারবে না। গাজীপুরে সরেজমিনে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে জানা গেল, জেলার হাইওয়ে পুলিশ জেলার মহাসড়কগুলোর বিভিন্ন পয়েন্টে যাত্রীবাহী যানবাহন আটকে দেয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন গাজীপুর জেলার বাইরে থেকে আসা যাত্রীরা। অনেক যাত্রী পুলিশকে অনুরোধ করে প্রবেশের চেষ্টা করেও ঢুকতে পারেননি। বাধার মুখে কেউ কেউ বিকল্প রাস্তা দিয়ে জেলায় প্রবেশ করেন। পরিবহনের চালকসহ যাত্রীদের অনেকেই লকডাউনের তথ্য জানেন না বলে দাবি করেছেন।
লকডাউনের সরকারি আদেশে বলা আছে, ২২-০৬-২০২১ ইং তারিখ মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এসময় বন্ধ থাকবে সরকারি বেসরকারি অফিস, চলবে না লঞ্চ ফেরি স্পিডবোট, লকডাউনের আওতাভুক্ত জেলাতে ট্রেন না থামানোর  নির্দেশনা দেওয়া হয। পরে অবশ্য ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম গত সোমবার  সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মঙ্গলবার থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সাত জেলায় লকডাউন আরোপ করা হয়েছে। এই সাত জেলায় কী কী বন্ধ থাকছে প্রশ্ন করলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সব বন্ধ থাকবে। মানুষও যাতায়াত করতে পারবে না। শুধুমাত্র মালবাহী ট্রাক এবং অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া কিছু চলবে না। জেলাগুলো ব্লকড থাকবে, কেউ ঢুকতে পারবে না। এসব জেলায় জরুরি সেবা ছাড়া সব কিছুই বন্ধ থাকবে।
গতকাল বুধবার সকালে গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা এলাকায় দেখা গেল রাস্তায় আনাগোনা করা অধিকাংশ মানুষের মুখে মাস্ক নাই। তারা রাস্থায় চলছেন অনেকটা ফ্রি স্টাইলে। গণপরিবহন দূর পাল্লার বাস ছাড়া রিকশা, অটোরিকশা সিএনজি সবই চলছে। তবে যারা জরুরি প্রয়োজনে বাসার বাইরে কিংবা কোথাও যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলেন তাদের পড়তে হয়েছে বিপদে।
রিকশা অটোরিকশা সিএনজি রাস্তায় বের হওয়া মানুষগুলোর কাছ থেকে নিয়েছে গলাকাটা ভাড়া। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি ভাড়া নেওয়া হয় যাত্রীদের কাছ থেকে। ভোক্তভোগীরা জানান, যারা শ্রীপুর থেকে গাজীপুর যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলেন, তাদের ৪ থেকে ৫শ’ টাকা দিয়ে পৌঁছাতে হয়। তাও আবার কয়েক জায়গায় গাড়ি থেকে ওঠা নামা করে। যেখানে পুলিশের চেকপোস্ট সেখানে ডান অথবা বামের শাখা রাস্তা দিয়ে ঘুরে আবার ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কে ওঠতে হয়েছে। আবার অনেকেই সাহস করে পুলিশের চেকপোস্ট পার হতে গিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে ফিরে। তবে তারা কিছুদূর পিছনের দিকে গিয়ে শাখা রাস্তা দিয়ে ঘুরে পুলিশ চেকপোস্ট পার হয়ে আবার মহাসড়কে ওঠে আসেন।
রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তায় দেখা গেল পুলিশী চেকপোস্ট। সেখানে যারাই ব্যক্তিগত গাড়ী দিয়ে মহাসড়ক ব্যববহার করে রাজধানী ঢাকায় আসতে চেয়েছেন তাদের আটকে দিয়ে পেছনে পাঠাতে দেখা গেছে। তবে তারা কেউ খুব বেশি একটা পেছনে যাননি বলেই জানা গেল। গাড়ির চালকরা জানান, রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তার একটু পেছনেই ডান পাশ দিয়ে রয়েছে একটি শাখা সড়ক রয়েছে। এই শাখা সড়ক ব্যবহার করেই ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালারা চেকপোস্টের সমস্যা উতরে যেতে পেরেছেন।
এদিকে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে টঙ্গি পর্যন্ত নির্মাণাধীন মহাসড়কের দুই পাশে শত শত হোটেল খোলা রাখতে দেখা গেছে। কিছু কিছু জায়গায় ভ্রাম্যমান দোকান বসতে দেখা গেছে। মাঝেমধ্যে পুলিশ এসে তাদের উঠিয়ে দিয়েছে। তবে সেখানে মানা হয়নি স্বাস্থ্যবিধি। এমনকি অনেকের মুখে মাস্ক দেখা যায়নি।
 রাস্তা নির্মাণাধীন থাকার কারণে গণপরিবহন না থাকলেও বেশ কয়েক জায়গায় পন্যবাহী পরিবহনের জ্যাম পড়েছে। তাতে যোগ হয়েছে অটোরিকশা, রিকশা, মোটর সাইকেল এবং সিএনজি। লক্ষনীয় বিষয় হলো এদিন কোনো পিক আপ ভ্যানে করে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা যায়নি। এই সুযোগে সিএনজি অটো রিকশা ইচ্ছে মতো যাত্রীদের পকেট কাটতে পেরেছে। বিশেষ করে নারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা বেশি আদায় করা হয়েছে বলে জানা গেল ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে। বিপদে পড়ে গাজীপুর বাইপাস থেকে বোর্ড বাজার যাবেন বলে রিকশাকে বললে ভাড়া ১৫০ টাকা চাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন মধ্যবয়সী একজন নারী। তিনি বলেন, বিপদে পড়ে রাস্তায় বের হয়ে কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়েছি।
যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় সারা গাজীপুরজুড়ে শ্রমিকদের পায়ে হেটে কর্মস্থলে যেতে দেখা গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব পরিবহনের মাধ্যমে শ্রমিকদের আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
টঙ্গী রেল জংশনের স্টেশন মাস্টার মো. হালিমুজ্জামান জানান, লকডাউনের কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও টঙ্গী রেল ষ্টেশনে কোন ট্রেন থামেনি। এছাড়াও বন্ধ রয়েছে গাজীপুর থেকে কমলাপুর রুটে চলাচল করা তুরাগ ডেমো ও কালিয়াকৈর কমিউটার ট্রেন। অনেক যাত্রী স্টেশনে এসে ট্রেন না পেয়ে ফিরে গেছে।
গাজীপুরের সবশেষ পুলিশী চেকপোস্ট টঙ্গি ব্রীজের দক্ষিণ পাড়ে। সেখানে পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। গাজীপুরের কোন গাড়ী যাতে ঢাকায় প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য কঠিন মূর্তি ধারণ করে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সদস্যরা। তবে তাদের চোখের সামনে দিয়ে পায়ে হেঁটে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করছেন। আলাপ করে জানা গেল তারা নানাভাবে দুর্ভোগ পোহাতে পোহাতে পকেটের টাকা খোয়াতে খোয়াতে টঙ্গি ব্রীজের উত্তরপাড়ে এসে পৌঁছান। পরে পায়ে হেঁটে ব্রীজ পার হয়ে আবদুল্লাহপুরে দাড়িয়ে থাকা ঢাকা সিটির ভেতরে চলা গাড়িতে করে যার যার গন্তব্যে পৌছাচ্ছেন।
গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়নি। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আম নিয়ে আসা আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের গাজীপুরের প্রবেশপথগুলোতে করোনার নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। জেলার কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনার চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে করোনা ইউনিটে ১৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ