শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে দেশের করোনা পরিস্থিতি

ইবরাহীম খলিল : চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে দেশের করোনা পরিস্থিতি। দিন যতই যাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সীমান্ত জেলা বিভাগীয় শহর পার হয়ে এখন ঢাকামুখী করোনা ভাইরাস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঢাকায় চলে এলে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সহজ হবে না। তারা মনে করেন বিচ্ছিন্ন লকডাউনের কারণেই কমছে না সংক্রমণ।  
লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকায় সপ্তাহ ব্যবধানে দেশে করোনা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। করোনার দাপটে সীমান্তবর্তী জেলাগুলো টালমাটাল। গতকালই দেশে ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। শনাক্ত হয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি। এরমধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে।  গত এক সপ্তাহ ধরে ৫০ থেকে ৬০ এর মধ্যে ছিল মৃতের সংখ্যা। গতকাল তা বেড়ে ৮২ জনে পৌঁছালো। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় শুধু উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেই মারা গেছেন ৪০ জন। সর্বোচ্চ শনাক্তের হার ঝিনাইদহে ৫৫ শতাংশ। ঢিলেঢালা লকডাউন-মানুষের উদাসীনতায় জেলায় বাড়ছে সংক্রমণ বলে জানান চিকিৎসকরা।
দিন যতই যাচ্ছে করোনা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। বাড়ছে  লাশের সংখ্যা। জনমনে বাড়ছে আতংক। আবারো শনাক্তের হার অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সবমহলে বেড়েছে উদ্বেগ। নতুন করে বাড়ানো হচ্ছে লকডাউন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার ডেল্টা ধরনের প্রভাবের মধ্যেই এখন ভাইরাসটির সাউথ আফ্রিকান, নাইজেরিয়ান ও ইউকে ভ্যারিয়েন্টও সক্রিয় হয়ে উঠছে। তবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি অল্প সময়ের মধ্যে মারত্মক শারীরিক জটিলতা তৈরির মাধ্যমে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভারতকে যেভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে, তাতে করোনার এই ধরনটি বড় উদ্বেগের কারণ। এরপরও করোনার বিস্তার ঠেকাতে যে কাজগুলো  করা দরকার ছিল তার কিছুই করা হয়নি। প্রয়োজনের তুরনায় স্বল্প সংখ্যক নমুনা পরীক্ষা ও অ্যান্টিজেন টেস্টের ভেতর দিয়ে সংক্রমণ কত বিস্তৃতভাবে ও কোন ভ্যারিয়েন্টের মাধ্যমে ছড়িয়েছে তার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামের রাস্তায় বের হলে মনে হয় ভাইরাসের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাজারের ভিড় কিংবা যানজটে আটকে থাকা অবস্থাতেও অনেকে মাস্ক পরার বিষয়টি গ্রাহ্য করেন না। গণপরিবহণেও নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই। সব জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি এক জায়গায় অনেক লোক জড়ো হওয়ার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।
এছাড়া সরকারকে অবশ্যই দ্রুততার সঙ্গে ভ্যাকসিন ক্রয় এবং সারা দেশের মানুষকে তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে সবাইকে সংক্রমণের সেই গুরুতর অবস্থা থেকে সুরক্ষিত রাখা যায়। তা ছাড়া, সংক্রমণ তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। এ ছাড়া, হাসপাতালগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ও অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উচ্চ সংক্রমণের এলাকাগুলোতে কোভিডের উপসর্গ নিয়ে অনেক মৃত্যুর ঘটনা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। মহামারির একেবারে শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরীক্ষা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্নকরণ ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। যা এই ভাইরাসের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাথমিক উদ্যোগ।
এদিকে সপ্তাহের ব্যবধানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, মৃত্যু ও সুস্থতা- সব সূচকেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এই সময়ে নমুনা পরীক্ষা বেড়েছে ২৭ হাজার ৪৬টি, শনাক্ত রোগী বেড়েছে আট হাজার ৩৬৯ জন, সুস্থ রোগী বেড়েছে এক হাজার ৫২৩ এবং মৃত্যু বেড়েছে ১২৫ জন।
চলতি বছরের ২৩তম এপিডেমিওলজিক্যাল সপ্তাহের (৬ জুন থেকে ১২ জুন) তুলনায় ২৪তম এপিডেমিওলজিক্যাল সপ্তাহের (১৩ জুন থেকে ১৯ জুন) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ সময়ে শনাক্ত রোগী আট হাজার ৩৬৯ জন (৫৫ দশমিক ১৬ শতাংশ) ও মৃত্যু বেড়েছে ১২৫ জন (৪৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ) হয়েছে। একই সময়ে নমুনা পরীক্ষা ২২ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং সুস্থ রোগী ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২৩তম এপিডেমিওলজিক্যাল সপ্তাহে এক লাখ ২২ হাজার ১০৩টি নমুনা পরীক্ষা, ১৫ হাজার ১৭২ জন শনাক্ত, ১৪ হাজার ৫৯৯ জন সুস্থ ও ২৭০ জনের মৃত্যু হয়।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২৪তম এপিডেমিওলজিক্যাল সপ্তাহে এক লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯টি নমুনা পরীক্ষা, ২৩ হাজার ৫৪১ জন শনাক্ত, ১৬ হাজার ১২২ জন সুস্থ ও ৩৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত সপ্তাহের তুলনায় করোনা ও উপসর্গে মৃত্যু বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। ঈদুল ফিতরের পর থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণের হার লাগামহীন। শুধু হাসপাতাল নয়, বাড়ছে আইসিইউ ইউনিটেও রোগীর চাপ।
ঢাকা বিভাগের ৩ জেলায় সংক্রমণ বেড়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। গতকাল স্বাস্থ্য বুলেটিনে এই তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম।
নাজমুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর জেলায় সংক্রমণের হার উচ্চ। এরপর আছে গোপালগঞ্জ এবং টাঙ্গাইল। একইভাবে চট্টগ্রাম বিভাগের শতকরা হারে শনাক্ত বান্দরবানে বেশি। যদিও সেখানে নমুনা সংগ্রহ অত্যন্ত কম। কিন্তু আমরা যদি বেশি সংখ্যক রোগীর কথা বিবেচনা করি তাহলে চট্টগ্রাম জেলায় সংক্রমণের হার বেশি। এর পাশাপাশি কুমিল্লা জেলায় নমুনা সংগ্রহ হয়েছে কম, কিন্তু শতকরা হিসাবে সেখানে শনাক্তের হার অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি।
রাজশাহী এবং খুলনা হচ্ছে এই মুহূর্তে উদ্বেগের জায়গা। রাজশাহীতে শনাক্তের হার ১৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে গতকালের পরিস্থিতি অনেক ভালো ছিল, সেখানে ৬ শতাংশের কম। নাটোরে ৩৭ শতাংশের বেশি, নওগাঁতে ৩৫ শতাংশের বেশি। এটি অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে এই পরিস্থিতির আশু কোনও উন্নতি আমরা দেখছি না। খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গায় ৩৬ শতাংশের বেশি, যশোরে ৩৮ শতাংশ, খুলনায় ৩৮ শতাংশের বেশি। এসব জেলায় সংক্রমণের হার অন্য যেকোনও জেলার তুলনায় বেশি।
রাজশাহী মেডিকেলে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরো ১০ জন। রোগী ভর্তি রয়েছেন ৩৫৯ জন। আর শনাক্তের হার ৪৭ এ ঠেকেছে। শয্যা সংকটে হিমশিম অবস্থা হাসপাতালের। পরিস্থিতি অবনতির দিকে উত্তরাঞ্চলের আরেক বিভাগ রংপুরেও। ২৪ ঘণ্টায় ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর দিনাজপুরে মারা গেছেন একজন
গত কয়েক দিনে উত্তরাঞ্চলের পাশাপাশি সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপের দিকে দক্ষিণাঞ্চলেও। জেলায় শনাক্তের হার ঠেকেছে ৩৮ শতাংশে ।
জুন মাসের শুরু থেকেই যশোরে সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হার ৩৮ শতাংশ। মারা গেছেন ৬ জন জানান  সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন।
সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরায় কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না সংক্রমণ। ২৪ ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে জেলার মেডিকেলে। জেলায় অক্সিজেনের সংকট মোকাবিলায় চলছে সিলিন্ডার দিয়ে সেবা বলে জানান সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. কুদরত ই খুদা। ঝিনাইদহে শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে সংক্রমণ। জেলায় ২৪ ঘণ্টায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনাক্তের হার ঠেকেছে ৫৫ শতাংশে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরেক জেলা চুয়াডাঙ্গায় আক্রান্তের হার ৫১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আর মারা গেছেন ৩ জন।
চট্টগ্রাম মহানগর ও তার আশপাশের জেলাগুলোতে ভারতীয় ডেল্টা ধরন শনাক্তের পর থেকে আবারও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বন্দরনগরীতে মারা গেছেন একজন। ৬৪২ নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত ১৩৬ জন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ