শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ধলু

খালীদ শাহাদাৎ হোসেন:

আমাদের লাল গাভীটা সে বছর ধবধবে সাদা একটা এড়ে বাছুর প্রসব করলো। বকের মত ধলা বলে মা ওর নাম দিলো ‘ধলু’। নাদুস নুদুস লম্বাটে চেহারা। পেটপুরে দুধ খেয়ে খড়ের গাদার উপর ঘুমায় অথবা ইচ্ছেমতো লাফিয়ে লাফিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। দৌড়িয়ে একবার এদিক একবার ওদিক ছোটে। ঐ লাল গাভীটা অনেক দুধ দিতো। সেকালের রেওয়াজ ছিল গ্রামের কেউ দুধ বিক্রি করলে লোকে তাকে ছোটলোক বলে হেয় প্রতিপন্ন করতো।

সকালে আমাদের সংসারের জন্য যতটুকু প্রয়োজন আর বিকেলে সদ্য ভূমিষ্ঠ চাচাতো ভাইপো আলমগীরের জন্য প্রতিদিন একসের করে দুধ দেওয়ার পর গাভীর ওলানে অনেক দুধ অবশিষ্ট থাকতো তা ধলু একাই খেত। গ্রামে কারো দুধের প্রয়োজন হলে মা তাদেরকে অবারিত বিতরণ করে দিতেন। আব্বা হাট থেকে ঘুঙ্গুর এনে ধলুর গলায় পরিয়ে দিলেন। ধলু যেদিকে যায় ঢংঢং করে ঘুঙ্গুর বাজে। ধলু আমার থেকে সাত আট বছরের ছোট। আমি ছেলেবেলা থেকেই শীর্ণ দেহে বড় হয়েছি। আদর করে আমি ধলুকে ঘাস খাওয়াতাম। দুপুরে খালে-পুকুরে গোসল করাতাম। এক বছর বয়সে এতো বড় হয়ে উঠলো যে, ওর পিঠে চড়ে বাড়ির পাশের ছোট খাল পাড়ি দিতাম।

ধলুর দুই দাঁত উঠতেই পূর্ণ বয়স্ক ষাঁড়ের মত বড় হয়ে গেল। ডোম ডেকে খাসি করানো হলো। খড়ভূষি ঘাসের সাথে মা প্রতিদিন ভাতের ফেনা, চাউল ধোয়ার পানির সাথে কুঁড়ো জ্বাল দিয়ে খেতে দিতেন। ফলে অতি আদরের ধলু আলসে স্বভাবের হয়ে গেল। সারাদিন খায় ঘুমায় আর জাবরকাটে। ঘাড়ে জোয়াল নিতে চায় না। ধান মাড়াই মলনে জুড়ে দিলে শুয়ে পড়ে। রোদে বাড়ির বাইর হয় না। গোছর দেয়া ঘাস খায়না। খড়ের গাদায়, গাছের ছায়ায় অথবা গোয়ালে শুয়ে জাবর কাটতে থাকতো।

আমার আব্বার লেখাপড়া ছিল মাদ্রাসা লাইনে। চালচলনে ছিলেন সাহেবী ভাব। সাত ভাইবোনের ছোট, সকলের আদর-আহ্লাদে ছোটবেলা থেকেই সাংসারিক কাজ-কর্মে ছিলেন উদাসীন। ক্ষেতের ফসলের সাথে তার স্বল্প চালানের ষাট-সত্তর মণ মালামাল বহনের একটা ডিঙি নৌকা ছিলো। বেপারীরা ধান-চাউলসহ বিভিন্ন মালামাল হাটে হাটে বিক্রি করে লাভ বাবদ যা দিতো তাতেই স্বচ্ছলভাবে সংসার চলতো। বাপ-চাচাদের এজমালিভাবে আর একটা নতুন বাড়ি করার সিদ্ধান্ত হল। বড় চাচা আমাদের নৌকার চালানের সব টাকা নিয়ে মাটি কাটার কাজে খরচ করে ফেললেন। ঐ টাকা আর ফেরৎ পাওয়া গেলনা। হঠাৎ এই নগদ বাড়তি আয় কমে যাওয়ায় সংসারের স্বচ্ছলতায় ভাটা পড়ে গেল। নৌকাখানা রোদ-বৃষ্টি আর বর্ষার পানিয়ে ডুবে কাঠ পচে নিঃশেষ হয়ে গেল।

উনিশ শত পঁয়ষট্টি সনের এগারো মে, সারা দেশব্যাপী রাতভর কালবৈশাখীর তাণ্ডব বয়ে যায়। আমাদের কাঠের দোতলা বসতঘরখানা সেই ঝড়ে ভেঙ্গে চুরমার। চালের টিন উড়ে অন্য গ্রামে গিয়ে দুমড়ে মুচড়ে পড়লো। রান্নাঘর গোয়ালঘর সবই লণ্ডভণ্ড। জমির ফসলাদিরও হলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। সংসারে তখন খুবই আর্থিক অনটন। রান্নাঘরের চুলার উপর বাঁশের ভাঙ্গা খুঁটি দিয়ে কোন রকম একটা ছাপড়া তোলা হলো। আমরা নোয়াচাচার ঘরে থাকতে লাগলাম। আব্বা ধার-কর্জ করে বড়ঘর তোলার আয়োজন করতে থাকলেন। গ্রামে আমার এক ফুফুকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার ছেলে আবদুল খালেক সব সময় আমাদের প্রতি সদয় ছিলেন। প্রতিদিন মিস্ত্রির সাথে কায়িক পরিশ্রমসহ ঘর তুলতে তার নিজস্ব কিছু টাকা খরচ করেন। এভাবে ধার-কর্জ করে জোড়া-তালি দিয়ে ঘর তোলা শেষ হতে না হতেই খালেক ভাইসহ পাওনাদারেরা টাকার জন্য চাপ দিতে থাকলো। অভাব আর দরিদ্রতার কাছে ¯েœহ-মমতা মনের অজান্তে হেরে যায়। উপায়ান্তর না দেখে একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আব্বা সংসারের আদরের গোধন ধলুকে ওপাড়ার রওশন শিকদারের কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হলেন। রওশন শিকদার ছিলেন গ্রামের একজন সাদামনের মানুষ। সদাচরণের জন্য গ্রামে সবার কাছে তিনি মুসল্লি মিয়া নামে পরিচিত ছিলেন। আব্বার সাথে তার মনের মিল থাকায় দুইজনের মাঝে গভীর সম্পর্ক ছিল।

আমরা যখন ধলুকে বিক্রি করে দিলাম তখন ছিল বর্ষাকাল। আমাদের পাড়া হতে উত্তরপাড়ার দূরত্ব কম হলেও এক মাইল। আমাদের গ্রামটি বিলের মধ্যে হওয়ায় চলাচলের উপযোগী রাস্তা না থাকায় প্রায় ছয় মাস নৌকায় এবং বাকি ছয়মাস কোন প্রকার পায়ে হেঁটে চলতে হতো। ধলুকে বর্ষাকালের প্রথম দিকে বিক্রি করে দেয়ায় ছয় মাসে তার বিষয়টি অনেকটা ভুলেই গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে শূন্য গোয়ালঘর দেখে মনে কষ্ট লাগতো। অঘ্রাণ মাসে আমন ধান কাটা শেষ হলে গ্রামের মানুষ তাদের গবাদি পশু ঘাস খাওয়ার জন্য উন্মুক্ত মাঠে ছেড়ে দিত। ছয় মাস গোয়ালে আবদ্ধ থাকার পর অন্যান্য পশুদের সাথে ধলুও বাইরে যাবার সুযোগ পেলো। প্রথম দিনেই সে সরাসরি আমাদের গোয়ালঘরে এসে হাজির। ধলুকে দেখে আমরা তো হতবাক। আমার ছোট ভাই ওমর হাতে করে এক গোছা খড় এনে ওর মুখে তুলে দিলো। মা ভাতের ফেনের গামলা ওর মুখের কাছে ধরতেই এক নিঃশ্বাসে সব খেয়ে পুরো বাবুয়ানী ভঙ্গিতে গোয়ালঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সন্ধ্যায় ধলু তার নতুন মালিকের গোয়ালে না ফেরায় এ বাড়ি ও বাড়ি খোঁজ করতে করতে সবশেষে আমাদের বাড়িতে এসে তাকে পেল। গলায় রশি পরিয়ে সামনে একজন পিছনে একজন পিটাতে পিটাতে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেল। যতই সে পিটানি খায় বার বার পিছনে ফিরে যাবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকলো। আমরা শুধু দর্শকের মতো অসহায় দৃষ্টিতে তার ফেরত নেয়ার দৃশ্যটি অবলোকন করতে থাকলাম। ঐদিন থেকে ধলুর নতুন এক বাতিক শুরু হলো। সুযোগ পেলেই সে কখনো রশি ছিঁড়ে কখনো মাঠ হতে সরাসরি আমাদের গোয়াল ঘরের গড়ার পাশে শুয়ে অলক্ষ্যে জাবর কাটতো। ধলুর ক্রয়সূত্রে মালিক রওশন শিকদার একজন ধৈর্যশীল ব্যক্তি ছিলেন। তার বড় ছেলে আবদুল্লাহ আমার সহপাঠী ছিল। সে কোনদিন গরুর খোঁজ নিতে আসতো না। মেঝো ছেলে ঝিলুকে নিয়ে বার বার ভিন্ন পাড়ায় এসে খাল পার করে গরু ফেরত নিতে নিতে তারা বিরক্ত হয়ে ওঠেন। ধলু নামক অবুঝ পশুটিকে প্রতিবার ফেরত নেয়ার সময় যেভাবে বেধড়ক পেটানো হতো এমন পিটুনি খেয়ে কোন মানুষ দ্বিতীয়বার ফিরে আসতো বলে মনে হয় না। চোখের সামনে গরুকে পিটুনি দেখে আব্বা রওশন চাচাকে একবার বললেন, মুসল্লি ভাই এই বর্ষা গেলেই চল্লিশ টাকা দিয়ে গরুটা আপনার কাছ থেকে ফেরত নিয়ে আসবো। মুসল্লি চাচা তাতে রাজিও হয়ে গেলেন।

এই বিশ্বের মালিক তার কিছু প্রিয় বান্দাদেরকে আর্থিক অনটনে ফেলে হৃদয়ে স্নেহ-মমতার আবেগ ভরে দিয়ে এমন এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেন যা উত্তরণের সাধ্য তাদের নেই। এই অবুঝ পশুটির কে তার রাখাল আর কে তার মালিক এই বিদ্যাজ্ঞান জানা নেই। যে ঘরে জন্ম নিয়ে আদরে সে বড় হয়েছে, আমৃত্যু সেই অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা বড়ই হৃদয়বিদারক বটে।

আমার আব্বা গ্রামের মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করতেন। মাসিক কোন বেতন ছিল না। রমজান মাসে তারাবির জামাত ও ঘরে ঘরে মিলাদ পড়িয়ে যে হাদিয়া পেতেন ঐ টাকায় আমাদের ভাইবোনের ঈদের পোশাক, মায়ের একটা আটপৌরে শাড়ি, বাবার একটা লুঙ্গি কেনা হতো। সে বছর পৌষের শীতে রমজান মাস এলো। আমরা ইফতারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় দেখি ধলু আমাদের গোয়াল ঘরে শুয়ে শুয়ে মনের সুখে জাবর কাটছে।

হঠাৎ চাচা রওশন শিকদারের হাঁক-ডাক শোনা গেল। তার ছেলে ঝিলু লাঠি পেটা করতে করতে ধলুকে শোয়া থেকে দাঁড় করিয়ে বাপ-বেটা দুইজনে রাগের সাথে বেধড়ক পিটাতে পিটাতে তাড়িয়ে নিতে ব্যতিব্যস্ত। আব্বা ঘর থেকে বের হয়ে এসে বললেন, মুসল্লি ভাই বেলাতো ডুবু ডুবু। ইফতারির সময় হয়ে গেছে আসেন আমাদের সাথে ইফতার সেরে গরু নিয়ে যাবেন। তিনি আব্বার দিকে তাকিয়ে রাগত স্বরে বললেন, মৌলভী সাব আপনি কথা রাখতে পারেন নাই। আমরা আপনার এই গরুর আচরণে বিরক্ত হয়ে গেছি। আর নয় আগামী হাটে ওকে বিক্রি করে দেব।

ইফতার খেতে খেতে ঘরের সবাই ধলুর বিষয়ে কথা তুললাম। আজ যেভাবে চৌফালা বাঁশ দিয়ে বেধড়ক পিটাতে পিটাতে ধলুকে নিয়ে গেছে এ দৃশ্য দেখে সবাই মনেপ্রাণে খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম। মা আবেগের সাথে বললেন, ধলুতো এখন আমাদের বাড়ির থেকেও ভাল খাবার খায়, ভালো গোয়ালে থাকে তারপরও মনের টানে সে বার বার ছুটে আসে। বেচারা ঝিলুর বাপের কি দোষ দেব। আমরা এতোদিনে একসাথে চল্লিশ টাকা জোগাড় করতে পারি নাই। পরে আমরা সবাই একমত হলাম যে এবারের ঈদে কেউ নতুন কোন জামা কাপড় নিবোনা। আব্বার যা আয় হয় তা দিয়ে ধলুকে ফিরিয়ে আনা হবে। রমজান মাসে আব্বা প্রতি দিনই ইফতারের দাওয়াত পান। রাতের খাবার খেয়ে তারাবি শেষ করে ঘরে ফেরেন। প্রতিদিন বিভিন্ন খতমে যে হাদিয়া পান তা একটা কৌটায় জমা রাখেন।

শবে ক্বদরের রাতে আব্বা ঘরে ফিরে কৌটায় জমা রাখা সব টাকা গুনে দেখেন চল্লিশ টাকা হয়ে আরো পাঁচ টাকা বেশি। পূর্বের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আব্বাকে বলা হলো তিনি যেন পরের দিন ভোরে মুসল্লি মিয়াকে চল্লিশ টাকা দিয়ে ধলুকে নিয়ে আসেন। ঝিলু রশি ধরলে তার হাতে রাখালী বাবদ বাকি পাঁচ টাকা দিবেন।

পরদিন ভোরে আমাদের ঘুম ভাঙ্গার আগেই আব্বা ধলুকে আনতে ওপাড়ায় চলে গেলেন। মা উঠান লেপে ধামায় কিছু ধান রাখলেন ধলুকে বরণ করতে। গ্রামের দুই প্রান্তে দুই পাড়ার বসতি ঘর। মাঝে মধ্য ডাঙ্গায় প্রায় আধা কিলোমিটার ফাঁকা। মা সহ আমরা দুই ভাই কাচারিঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম ধলুকে ফিরিয়ে আনার দৃশ্য দেখার জন্য। উচ্চতায় আব্বা ছিলেন ছয়ফুটের মত এবং স্বাস্থ্যবান। সব সময় লম্বা সাদা পাঞ্জাবী পরতেন। রাস্তায় বের হলে তাকে অনেক দূর থেকে চেনা যেতো। কিছুক্ষণ পর স্কুলের সামনে আব্বাকে ফেরত আসতে দেখা গেল। কিন্তু সাথে তো ধলু নেই। তিনি একাই হেঁটে আসছেন। মা বললেন, মনে হয় তারা চল্লিশ টাকায় গরু দিতে রাজি হয় নাই। বর্তমানে এ গরুর দাম কম হলেও ষাট-সত্তর টাকা হবে।

আব্বা আসা পর্যন্ত আমরা কি হয়েছে জানার অপেক্ষায় থাকলাম। কিছুক্ষণ পর আব্বা বাড়িতে এসে পৌছলেন। মা বললেন ওরা কি ধলুকে দিল না? আব্বা গভীর মনোকষ্টে ক্ষীণ স্বরে জবাব দিলেন গতকাল ওরা খান্দারপাড়ের হাটে ধলুকে বিক্রি করে দিয়ে ঐ টাকায় একটা লাল আবাল কিনে এনেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ