শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

শুধু লকডাউনই সমাধান নয়

বেড়ে চলা মৃত্যু এবং দ্রুত অবনতিশীল অবস্থার কারণে সরকার আবারও লকডাউনকেই সমাধানের পন্থা হিসেবে বেছে নিয়েছে। গত বুধবার রাতে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত লকডাউনের মেয়াদ বাড়িয়েছে সরকার। কথা ছিল ১৬ জুন মধ্যরাতে লকডাউন শেষ হয়ে যাবে। মেয়াদ বাড়ানোর কারণ জানাতে গিয়ে বলা হয়েছে, শনাক্ত রোগীদের সংখ্যা, করোনায় মৃত্যু এবং নতুন শনাক্তের হারÑ এ তিনটি বিষয়েই পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশে পরিস্থিতির আশংকাজনক অবনতি ঘটেছে। 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে বুধবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে করোনায় মৃত্যু ঘটেছে ৬০ জনের। ৪ মের পর ৪৩ দিনে এটাই মৃত্যুর সর্বাধিক সংখ্যা। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় মারা গিয়েছিলেন ৫০ জন। তাছাড়া আগের দিন মঙ্গলবার থেকে বুধবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় শনাক্তদের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। ৩ হাজার ৩১৯ জনের স্থলে হয়েছে প্রায় ৪ হাজার। সেদিন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্তদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট লাখ ৩৭ হাজার ২৪৭ জন। উদ্বেগের কারণ হলো. প্রাথমিক পর্যায়ের দিনগুলোতে হঠাৎ বিপদে পড়লেও ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। তখন শনাক্তের হার নেমে এসেছিল মাত্র তিন শতাংশে। 

এরপর মার্চ থেকে আবার বাড়তে শুরু করে এবং এপ্রিল জুড়ে চলে করোনার তা-ব। এপ্রিলে শনাক্তের হার ২৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। মৃত্যুর সংখ্যা শত পেরিয়ে যায়। মে মাসে কিছুটা কমলেও জুন মাসের শুরু থেকেই করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। বুধবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ৪০ দশমিক ৩৮ এবং রংপুর বিভাগে ৩০ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়েছে। অন্য বিভাগগুলোর পাশাপাশি ঢাকা বিভাগেও বেড়েছে সংক্রমণ। বুধবার এই হার উঠেছিল ১২ দশমিক ৩২ শতাংশে, আগের দিনও যা ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

এভাবে সব মিলিয়েই পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকায় সরকার লকডাউনের মেয়াদ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করেন, দরকার যখন ছিল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে কঠোর নজদারির ব্যবস্থা করা সরকার তখন প্রশ্নসাপেক্ষ লকডাউন কার্যকর করেছে। সে কারণে তো বটেই, অন্য কিছু বিশেষ কারণেও সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীতে যানবাহনের চলাচল এরকম একটি বড় কারণ। বাস মালিকদের সঙ্গে যোগসাজসের ভিত্তিতে সরকার একদিকে বাসের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে করোনার সংক্রমণ যাতে না ঘটতে পারে সে যুক্তি দেখিয়ে বাসে দু’জনের সিটে একজন করে যাত্রী ওঠানোর ব্যবস্থা করেছে। এর অজুহাতেই ৬০ শতাংশ ভাড়া  বাড়ানো হয়েছে। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে বিষয়টির মধ্যে আপত্তির কোনো কারণ থাকতে পারে না। কেননা, এভাবে কথিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে বা হতে পারে। 

অন্যদিকে বাস্তব অবস্থা কিন্তু অমন যুক্তিকে সমর্থনযোগ্য করতে পারেনি। কারণ, দু’জনের সিটে একজন করে যাত্রী ওঠানোর মাধ্যমে কোনোভাবে দূরত্ব বজায় রাখা যেমন সম্ভব হয়নি তেমনি বাসে ওঠার সময় যাত্রীদের ঠেলাঠেলিও রয়েছে  স্বাভাবিক সময়ের চাইতে অনেক বেশি। বাসস্ট্যান্ডগুলোতেও ভিড় বাড়ছে অবিশ্বাস্যভাবে। এর ফলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যুক্তি বা অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারছে না। সঙ্গত কারণেই করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশংকা বাড়ছে, করোনা ছড়িয়ে পড়ছেও।

ওদিকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সময় কমিয়ে দেয়া হলেও হাট-বাজার, অফিস-আদালত এবং ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকছে যথারীতি। রাস্তায় ও মার্কেটে তো বটেই, অফিস-আদালতেও প্রায় কারো মধ্যেই মুখে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সামান্য লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে লংঘিত হচ্ছে সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা।  

রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রে এভাবে চলছে বলেই লকডাউন ঘোষণা, এর মেয়াদ বাড়ানো এবং প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, কোনো বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তৈরির প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তি বা কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও চিন্তার গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন করার এবং সংশয় প্রকাশ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। যেমন করোনার প্রাথমিক দিনগুলোতে কিছু না বুঝেই তারা পাশ্চাত্যের অনুকরণে ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে ‘সামাজিক’ দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ফলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কিছুই বুঝতে পারেনি। অথচ কথাটা হওয়া উচিত ছিল ‘শারীরিক’ দূরত্বÑ যা ইদানীং বলা হচ্ছে এবং মানুষেরও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। 

আমরা মনে করি, লকডাউনের মতো জটিল অথচ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ে অবশ্যই সহজ ও সরল পন্থা নেয়া দরকার। বন্ধ করলে সবই বন্ধ করতে হবে। দু’জনের সিটে একজন বসানোর নামে ঠেলাঠেলি এবং ভিড় বাড়ানোর বিপদজনক সিদ্ধান্ত নেয়া চলবে না। সেই সাথে করোনায় বিপন্ন হয়ে পড়া সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যাপারেও লক্ষ্য রাখতে হবে। নাহলে সারাদেশেই প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে উঠবে, কেউই লকডাউন বা আইন মানতে চাইবে নাÑ যার লক্ষণ এরই মধ্যে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। এজন্যই সরকারের উচিত সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা করা এবং লকডাউনের কারণে মানুষের যাতে আয়-রোজগার কমে বা বন্ধ হয়ে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। সরকারকে একই সাথে শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি খাবারের আয়োজন করতে হবে। আমরা চাই, মানুষ যাতে খাবার ও চিকিৎসার অভাবে কষ্ট না পায় এবং আর কোনো মানুষেরই যাতে করোনায় মৃত্যু না ঘটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ