শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

বুবু

সা’দ সাইফ:

এসএসসি শেষ করার পর কলেজে ভর্তি হওয়ার কয়েকদিন  বাকি। ভর্তি করানোর মতো টাকাও নেই মাহিনের বাবার কাছে। পরিবারে প্রচণ্ড অভাব-অনটন। বাবার ঠিকমতো না হচ্ছে কাজ না চলছে ভালোমতো সংসার। চার সদস্যের নিম্নবিত্ত পরিবারে অভাব যেন নিত্যসঙ্গী।

পড়ালেখার প্রতি প্রচণ্ড টান মেধাবী মাহিনের। অথচ কলেজে ভর্তি হতে পারছে না সে।

দু’ভাই-বোনের মধ্যে বোন বড়। তারপর মাহিন।

কলেজে ভর্তি হওয়ার আর হাতেগোনা  দুইদিন বাকি আছে। সময় একদম ঘরের দোরগোড়ায়। 

মাহিনের ভেতরে একধরনের অদৃশ্য অনুভুতি, সকিছুটা চাপা কান্নার মতো। অথচ সে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না। কোনদিকে তাকিয়েই বা বলবে?

‘এই নে, যা ভর্তি হয়ে আয়’  টাকাটা মাহিনের হাতে গুঁজে দিলো বড়বোন। মাহিনের চঞ্চল মনটা খুশিতে আরো চঞ্চল হয়ে উঠল। ছোট্ট করে বলে উঠল, ‘থ্যাঙ্কিউ বুবু!’

মাহিনের অধিকাংশ দরকার, সংকটের সময় ত্রাতার ভূমিকায় হাজির হয়ে যায় তার বড়বোন। 

এই যেমন গতবছর ভ্রমণে যাওয়ার সময় আশপাশের সমবয়সীরা ভ্রমণে যাচ্ছে। মাহিন ঘরে গোমড়া মুখে চুপটি করে বসে আছে। বোন ঘরে ঢুকেই মাহিনের অবস্থা বুঝতে পারে। ‘কীরে পিকনিকে যাবি না?’ মাহিন কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে বসে ছিল।

‘ঠিক আছে, রেডি হয়ে নে। আমি টাকা দিচ্ছি।’ কথাগুলো বলতেই বুবুকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল মাহিন। একদম শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। 

মাহিনের বুঝ হওয়ার পর থেকে প্রয়োজনীয় এটা-সেটা বাবার থেকে বোনের কাছ থেকেই পেয়েছে বেশি। প্রতিবছর ঈদের সময় ছোটভাইটির জন্য বিশেষ বিশেষ গিফটের কমতি থাকে না বোনের পক্ষ থেকে। অথচ বোনটি নিজের কথা একবারের জন্যও ভাবে না। ভাববেই বা কী করে! ভাইটা-ই যে তার সবকিছু। প্রাণভোমরা। টিউশন বা হ্যান্ডিক্র্যাফটের ওপর যা আয় হয় সবই রেখে দেয়। সবটাই ছোটভাইয়ের জন্য। সেবার অষ্টম শ্রেণির সমাপনির বৃত্তির ফলাফল দিলো। মাহিনের ট্যালেন্টপুল বৃত্তির খবরে বড়বোনের খুশি আর কে দেখে! আশপাশের সকল প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে গিয়ে মিষ্টি বিতরণ করেছিল। গর্বে বোনটার বুক ভরে গেছিল সেদিন। 

আবার অল্পের জন্যে যখন এসএসসিতে প্লাস মিস হলো তখন এই বোনটাই তার পাশে অটল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। কোন ধরনের হতাশা তাকে আঁকড়ে ধরতে পারে নি। আগলে রেখেছিল ছা-পোষা মুরগির মতো। ভাইয়ের প্রতি বোনের নিখাদ এ ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না। দৃষ্টি উদাস চোখে জানালার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে মাহিন। চিন্তা জগতে আচ্ছন্ন সে। আজ আট মাস হলো সে বাড়ির বাইরে। বোনটাকে তার দেখতে খুব ইচ্ছে করে। তার মধুমাখা ডাক কিংবা জাদুমাখা শাসন ভীষণভাবে মিস করে সে। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর এত দীর্ঘ সময় সে বাড়ির বাইরে থাকেনি। বোনের কথা মনে হতেই বুকের ভেতর একধরনের ধরপাকড় শুরু হয়ে যায় তার। মাঝেমাঝে বোনটার জন্য তার খুব কষ্ট হয়। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সময় যখন খুব টাকার দরকার তখন নিজের বিয়ের জন্য তিলে তিলে কষ্টে গড়া গয়না কী হাসিমুখেই না বিক্রি করে দিয়েছিল বোনটা! কোনরকম আড়ষ্টতা কাজ করেনি তার ভেতরে। নিরুপায় মাহিন ওটা শোনার পর ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিল সেদিন, অনেকটা অগোচরে। 

এখন পর্যন্ত বোনটার জন্য তেমন কিছুই করতে পারেনি মাহিন। কিন্তু খুব ইচ্ছে অনেক বড় কিছু করে দেখানোর। বোনের ত্যাগের মূল্য তাকে কিছুটা হলেও দিতে হবে। আর কারো জন্য না হোক, বোনটার জন্যই তাকে বড় হতে হবে, অনেক বড়, পাহাড় সমান বড়।

ভাবতে ভাবতে ছলছলে পাশে রাখা ফোনটায় রিং বেজে উঠল। ফোনের ওপর চোখ রাখতেই স্ক্রিনের ওপর বড় করে ভেসে উঠল বুবু.....।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ