শুক্রবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

অর্থমন্ত্রীর ব্যবসাবান্ধব বাজেটে চ্যালেঞ্জ দেখছেন ব্যবসায়ীরা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটকে পুরোপুরি ব্যবসাবান্ধব বললেও প্রতিদিনই বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠন একের পর এক দাবি জানাচ্ছেন। ব্যবসার ক্ষেত্রে বাজেটে যে বাধাগুলো আছে তা সমাধানের তাগিদ দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের দাবির পাল্লা অনেক ভারি। এরমধ্যে অধিকাংশই শুল্ক ও কর হ্রাসসংক্রান্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়িত না হলে সংশ্লিষ্ট দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা বলছেন, করোনাকালে দেশে বিনিয়োগ আগের তুলনায় কমবে। এ সময়ে এমন উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ঘোষিত বাজেট আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবায়নে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে।

২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট-পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেট ব্যবসাবান্ধব। আমি মনে করি, ব্যবসায়ে সুযোগ-সুবিধা বাড়লে উৎপাদন বাড়বে। আর উৎপাদনে যেতে হলে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। কারণ লোকবল ছাড়া উৎপাদন সম্ভব নয়। এ কারণে ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেটে সুযোগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে করোনা মহামারির মধ্যেও চলতি বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮.২ শতাংশ ধরেছিল সরকার। তা অর্জিত না হওয়ায় এবার সেই লক্ষ্যে রাশ টেনেছেন অর্থমন্ত্রী। নতুন প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭.২ শতাংশ। করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান নিয়ে সমালোচনা হলে অর্থমন্ত্রী ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, নতুন বাজেট ব্যবসাবান্ধব। বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। ফলে সব সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে তাঁরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন।

এদিকে কেমন হল সংকটকালীন এ প্রস্তাবিত বাজেট? তা নিয়ে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অর্থমন্ত্রী বাজেটকে পুরোপুরি ব্যবসাবান্ধব বললেও প্রতিদিনই পণ্যভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠন একের পর এক দাবি জানাচ্ছেন। সেসব দাবির অধিকাংশই শুল্ক ও কর হ্রাসসংক্রান্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাঁদের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়িত না হলে সংশ্লিষ্ট দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নতুন বাজেটে আরও ছাড় চান ব্যবসায়ীরা। এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএ বলছে, সুশাসন নিশ্চিত করে বাস্তবায়নই বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। সেই সাথে সব রকম আগাম আয়কর প্রত্যাহারের দাবি তাদের। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন বাজেটে পোশাক মালিকদের দাবি দাওয়ার তেমন প্রতিফলন হয়নি। গত ৫ জুন বাজেটোত্তর সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া জানায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। তাদের মতে, বাজেটে দেয়া বিভিন্ন কর ছাড়ে সুবিধা পাবেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। তবে সুশাসন নিশ্চিত করে এর বাস্তবায়নই হবে মুখ্য চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি দাবি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রীম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের।

সাংবাদিক সম্মেলন করে বিজিএমইএ বাজেটের প্রশংসা করলেও তাদের মত প্রকাশ করতে গিয়ে জানান, বাজেটে অনেকে অনেক কিছু পেলেও পোশাক মালিকদের দাবি দাওয়ার খুব বেশি প্রতিফলন হয়নি। তারা জানায়, করোনা পরিস্থিতিতে বাজেটে অন্তর্ভুক্তের জন্য করসংক্রান্ত বিজিএমইএ’র বেশকিছু প্রস্তাব করেছিল, যা শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানো ও কর্মসংস্থানের জন্য অপরিহার্য ছিল। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে তার প্রতিফলন হয়নি। এসময় সংগঠনটি রপ্তানি ধরে রেখে কর্মসংস্থান বাড়াতে নতুন ও অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানিতে প্রণোদনার হার ৪ থেকে বৃদ্ধি করে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করে। সাথে নন কটন পোশাক রপ্তানিতে ১০ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানায়। বিজিএমইএ’র প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহারের অনুরোধটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করছি। এই সংকটময় সময়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হবে। এ মুহূর্তে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ক্যাশ-ফ্লো ম্যানেজ করা। যেটি করতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। কর কিছুটা কমলে ক্যাশ-ফ্লোতে কিছুটা স্বস্তি আসবে। একই সঙ্গে রপ্তানির উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ আগামী ৫ বছরের জন্য স্থিতিশীল রাখা প্রয়োজন। এটি করা হলে উদ্যোক্তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মধ্যমেয়াদি ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে। নতুন বাজেটে প্রণোদনা ৪ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়ে ফারুক হাসান বলেন, নন-কটন পোশাক রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা দেয়া হলে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি নন-কটন বস্ত্র ও পোশাক খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য একটি বিশেষ স্কিম গ্রহণ করা দরকার। 

বাজেটে শতভাগ রপ্তানিমুখী বন্ডেড ওয়্যার হাউস বা স্পেশাল বন্ডেড ওয়্যার হাউস লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ওপর সুতা ও কাপড়ের প্রচ্ছন্ন রপ্তানির বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় বস্ত্রকলের মালিকেরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা শর্তটি বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেছেন, কোনো প্রকার আলোচনা না করেই বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রস্তাবটি দেয়া হয়েছে। এটি প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করবে। বিটিএমএ সভাপতি বলেন, বিদেশ থেকে কাপড় আমদানিতে ট্যারিফ ভ্যালু এখনই পরিবর্তন করা সম্ভব না হলে সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ন্যূনতম ৫০ শতাংশ ধার্য করার অনুরোধ করছি। এ ছাড়া বস্ত্র খাতে ব্যবহৃত সব ধরনের যন্ত্রাংশ ১ শতাংশ শুল্ক দিয়ে আমদানির সুযোগ দাবি করেন তিনি।

একইসাথে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) বাজেটে তৈরি পোশাকের মতো রপ্তানিমুখী চামড়া খাতে সমান হারে করপোরেট কর আরোপ করার দাবি জানিয়েছে। পোশাক কারখানার করপোরেট কর ১২ শতাংশ। তবে পরিবেশবান্ধব কারখানার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ। ইএবির সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানান। একই সঙ্গে ভ্যাট আইনকে ব্যবসাবান্ধব ও যুগোপযোগী করতে আমদানি পর্যায়ে আগাম কর ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন।

এদিকে রিকন্ডিশন্ড বা পুরোনো গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডা গত বুধবার নিজেদের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পুরোনো গাড়ি আমদানিতে ৪৫ শতাংশ অবচয়-সুবিধা দাবি করেছেন। একই সঙ্গে ১২-১৫ আসনের মাইক্রোবাস আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার চেয়েছেন। বাজেটে নছিমন-লেগুনার মতো দুর্ঘটনাপ্রবণ যানবাহন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে বিকল্প গণপরিবহন হিসেবে মাইক্রোবাসকে জনপ্রিয় করার কথা বলা হয়েছে। সে জন্য ৭-৯ আসনের মাইক্রোবাসের সম্পূরক শুল্ক কমানো হয়েছে। তবে দেশে ১২-১৫ আসনের মাইক্রোবাস জনপ্রিয়। সেখানে সম্পূরক শুল্ক হ্রাস করা হয়নি। ফলে নছিমন-লেগুনার বিকল্প হওয়ার সুযোগ নেই মাইক্রোবাসের। বারভিডার সভাপতি আবদুল হক সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। দেশে গাড়িশিল্প প্রতিষ্ঠার নামে ‘স্ক্রু ড্রাইভিং শিল্প’ না গড়তে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গাড়ির অভ্যন্তরীণ বাজার এক লাখ ইউনিট হলেই গাড়িশিল্প প্রতিষ্ঠা যুক্তিযুক্ত হবে। গাড়ি মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এলে বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি সোনার অলংকারের ওপর ৫ শতাংশের পরিবর্তে দেড় শতাংশ ভ্যাট আরোপ করার দাবি জানিয়েছে। বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে তারা সোনার অলংকারের মজুরির ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের আহ্বান জানিয়েছে। জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি এনামুল হক ও সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগারওয়ালা অর্থমন্ত্রীকে দেয়া এক চিঠিতে এ দাবি জানান। তাঁরা বলেন, সোনা মূল্যবান ধাতু হওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট বড় অঙ্কের অর্থে পরিণত হয়। ফলে এ দেশের স্বল্প ও মধ্যম আয়ের গ্রাহকেরা ভ্যাট দিতে অনাগ্রহ দেখান।

বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন থেকে সরে আসা, আগাম কর প্রত্যাহারসহ কর ব্যবস্থা সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন চট্টগ্রাম চেম্বার ও বাংলাদেশ সেন্টার অব এক্সিলেন্স। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে উদ্যোক্তারা জমি নেয়ার সময় ভ্যাট দেয়ার বিধান ছিল না। এখন রাজস্ব বোর্ড বলছে, ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। তাহলে তো নীতির ধারাবাহিকতা থাকল না। নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি। 

সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি আলমগীর কবির বলেন, বাজেটে আগাম কর ২ শতাংশ চূড়ান্ত দায় হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে। এটা এই শিল্পের জন্য বড় বোঝা। আবার টনপ্রতি ক্লিংকারে ৫০০ টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে। তাতে সিমেন্টের কাঁচামালের ওপর ১০-১১ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিতে হয়, যেটা শিল্পের কাঁচামালের জন্য অনেক বেশি। এই খাতে একই পণ্যে দুবার কর দিতে হচ্ছে। আগাম কর প্রত্যাহার ও কাঁচামালের শুল্ক যৌক্তিক না করলে এই খাতে উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

বাজেট প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) জানায়, করোনাকালে দেশে বিনিয়োগ আগের তুলনায় কমবে। এর মধ্যে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময়ে এমন উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ঘোষিত বাজেট আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবায়নে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে। গতকাল বৃহস্পতিবার সংগঠনটির সভাপতি অনোয়ার-উল আলম চৌধুরি (পারভেজ) এ সময় লিখিত বক্তব্যে বলেন, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন তার দিকনির্দেশনা চায় বিসিআই। কারণ বিগত কয়েক বছরে বেসরকারি বিনিয়াগ ২৩ শতাংশের কাছাকাছি আছে। এদিকে কিছু সুপারিশও করছে বিসিআই। এর মধ্যে ৩ কোটি টাকার টার্নওভারে ন্যূনতম কর হার ০.৫০% থেকে কমিয়ে ০.২৫ % করা হয়েছে। তবে টার্নওভারের ন্যূনতম হার ৪ কোটিতে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের উপর ১৫% কর আরোপের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। তারা বলছে, এ কর আরোপে দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

দেশে উৎপাদিত প্লাস্টিকের খেলনার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অব্যাহতি দাবি করেছেন প্লাস্টিকশিল্পের মালিকেরা। তাঁরা বলছেন, প্লাস্টিকের খেলনা উপখাতের দ্রুত বিকাশ হচ্ছে। আমদানি বিকল্প উন্নত মানের খেলনা প্রস্তুত হচ্ছে। রপ্তানিও হচ্ছে বিদেশে। ভ্যাট অব্যাহতির সুযোগ চাওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীরা যুক্তি দিয়েছেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ, দেশীয় খেলনা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই ছোট ছোট। তাদের ভ্যাট দেয়ার সামর্থ্য নেই। ভ্যাটের কাগজপত্র ব্যবস্থাপনা করার মতো সক্ষমতাও তাদের নেই। এসব ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে হলে ভ্যাট প্রত্যাহার করা দরকার। একই সঙ্গে খেলনা আমদানিতে ট্যারিফ মূল্য বাড়ানোর অনুরোধ করেন। তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরে বাজেটে প্লাস্টিকশিল্পের ওপর আরোপিত ৩ শতাংশ আগাম কর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। এছাড়া দেশে উৎপাদিত খেলনার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারসহ ১৫টি দাবি জানান তারা। 

প্রস্তাবিত বাজেট ই-কমার্সবান্ধব হয়নি বলে অভিমত খাত সংশ্লিষ্টদের। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা করোনার মধ্যে কমবেশি সব ধরনের ব্যবসা লোকসানের মুখে পড়েছে। এ সময়ে ই-কমার্স উদীয়মান ব্যবসা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মানুষের আগ্রহ ও নির্ভরতা বেড়েছে অনলাইন কেনাকাটায়। এ ব্যবসাকে এখনো কোনো শ্রেণিভুক্ত করা হয়নি। উদীয়মান ব্যবসা হিসেবে ই-কমার্সের ওপর থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার করা হলে এটি মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্যতা পেত। 

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে দেশের উদ্যোক্তাদের ছাড়ের পর ছাড় দেয়া হয়েছে। তবে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের লেনদেনে আরও স্বচ্ছতা আনতে কিছু ক্ষেত্রে কঠোর শর্তও আরোপ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে উৎসে অগ্রিম করের হার। ফলে করের বোঝা বাড়বে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। ২০২১ সালের অর্থবিল ঘেঁটে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এবারে উৎসে করের ক্ষেত্রে ভুগতে হতে পারে। কারণ, উৎসে করের হার বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য সরবরাহের বিপরীতে উৎসে করহার চার ধাপের পরিবর্তে তিন ধাপ করা হয়েছে। যেমন এত দিন ১৫ লাখ টাকার কম পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা হলে ২ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হতো। এখন থেকে ৫০ লাখ টাকার কম সরবরাহ করা হলে ৩ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হবে। ফলে যারা ১৫ লাখ টাকার কম মূল্যের পণ্য সরবরাহ করবেন, তাঁদেরও প্রতিটি সরবরাহে ৩ শতাংশ হারে উৎসে দিতে হবে। ৫০ লাখ টাকার বেশি কিন্তু দুই কোটি টাকার কম পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা হলে ৫ শতাংশ উৎসে কর দিতে হবে। এখানেও আগের চেয়ে ১ শতাংশ বেশি উৎসে কর দিতে হবে। আর দুই কোটি টাকার বেশি পণ্য সরবরাহ হলে ৭ শতাংশ উৎসে কর কাটা হবে, যা এত দিন ছিল ৫ শতাংশ। উৎসে কর বাড়ানোর ফলে দেশের মেগা প্রকল্পে যেসব প্রতিষ্ঠান সিমেন্ট, রডসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করে, তারাই বেশি ভুগবে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় প্রতি চালানেই দুই কোটি টাকার বেশি পণ্য সরবরাহ করে থাকে। তাই তাদের বিল পরিশোধের সময় আগের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি, অর্থাৎ ৭ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হবে। এর মানে হলো, তাদের লেনদেনের ওপর কমপক্ষে ৭ শতাংশের বেশি মুনাফা করতে হবে।

এদিকে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের একটি সুপারিশও রাখা হয়নি। ১৩টি প্রস্তাবের সব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন রিহ্যাব নেতারা। তারা বলেছেন, আবাসন খাতে ক্রান্তিকাল চলছে। এ অবস্থা উত্তরণে বিশেষ অর্থায়ন তহবিল, জমি ও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ব্যয় কমানো ও কর অবকাশ সুবিধাসহ কিছু সুপারিশ বাজেট অনুমোদনের সময় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় ডিসিসিআই বলছে, বর্তমান বাজেটে রাজস্ব ঘাটতি ও অর্থায়ন একটি চ্যালেঞ্জ। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিডিপির এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে করোনা সংক্রমণ রোধ করা এবং সবার জন্য করোনা টিকা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যদিও এটি একটি ব্যয়বহুল বাজেট, এর মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসায়ীদের আর্থিক প্রণোদনা, সামাজিক নিরাপত্তার ব্যয় বৃদ্ধি ও জনগণকে করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় বরাদ্দে উদ্যোগ থাকার কারণে জীবনজীবিকার ভারসাম্য রক্ষায় এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট হয়েছে বলে ডিসিসিআই বিশ্বাস করে। তবে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হবে, তাই রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানাচ্ছে, ঢাকা চেম্বার। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ