শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 

সাজজাদ হোসাইন খান

॥ বিয়াল্লিশ ॥

শান্তিবাগের দুপুরটা ছিলো শান্ত, ঝিরঝির। একটা দুটা মানুষ পথে দোকানে। এমনিতে এপাড়ায় মানুষজন কম। তাছাড়া সব বাড়ির আব্বা তখনো অফিসআদালতে। গাছগাছালিতে ছাওয়া।  বেশির ভাগই আম। দু’একটি কাঁঠালগাছ নজরে আসে। ঘরগুলোও অদ্ভুত ধরনের। প্রায় ঘরই কাঠের পাটাতন। আব্বা বলেছিলেন বিক্রমপুরের লোকরা নাকি এমন ঘরবাড়িতে বসবাস করে। এলাকায় যারা জায়গা জমি কিনেছে তাদের অনেকেই সেখানকার লোক। এজন্যে ঘরগুলো এ ধরনের। আমি অবাক অবাক নজরে আব্বার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বিক্রমপুর আবার কোথায়? বিক্রমপুর ঢাকার পাশেরই একটি অঞ্চল। নামিদামি এলাকা। এ নিয়ে অন্যসময় কথা হবে। আমিও অপেক্ষায় থাকলাম। এরিমধ্যে স্কুল আবার জমজমাট। স্কুলের পেছন দিকটায় ফকিরাপুল বাজার। সদর সড়ক পার হতে হয়। সে সড়কে বাসটাস চলে। মাঝেমধ্যেই আমরা দল বেঁধে সে এলাকায় ঢুকতাম। সারি সারি দোকান ছিলো। বেশ সাজানো গোছানো। নওয়াব স্টোর নামে একটি দোকান। নানারকম পশরায় ভরা। বিস্কুট আছে অনেক পদের। নারিকেলি নামে এক ধরনের বিস্কুট পাওয়া যেতো সেখানে। অনেক মজার। প্রায়ই দিনই সে বিস্কুটের জন্য সেখানে যেতাম। একআনার বিস্কুট কিনতাম। পাকেট ভর্তি। কামড়ে কামড়ে পড়তো নারিকেলের টুকরা। ঘি ঘি গন্ধ ভাসতো। তৌফিক একদিন বললো চল স্টেডিয়াম দেখে আসি। স্টেডিয়াম আবার কি চিজ? রেজাউল জানালো সেখানে নাকি খেলাধুলা হয়। ফুটবল ক্রিকেট আরো কত খেলা। একদিন ঠিকঠিকই স্টেডিয়াম দেখতে গেলাম। কায়েকজন মিলে একসাথে। তৌফিক আগে আগে। কারণ তৌফিক জানতো কোন পাশে স্টেডিয়াম। নওয়াব স্টোরের সামনে দিয়েই পথ। কিছুদূর যেতেই একটি খাল। সে খালের উপর কাঠের পুল। পুলের দু’ধারে জনাকয়েক ফকির। কানা লেংড়া জাতীয়। রেজাউল জানালো এই যে দেখছ এটির নামই ফকিরের পুল। বিকালের দিকে আরো ফকির জমা হয় এখানে। ভাবনারা কেবল গুত্তা খাচ্ছে। কি আজব কাহিনী। ফকিরদের নামেই একটা এলাকার নাম হয়ে গেলো।

পুল থেকে আট-দশ কদম আগে বাড়লেই বড় রাস্তা। ডানে বাঁয়ে বাড়ি ঘর। বেশির ভাগই টিন- ছাপড়া। দু’একখানা দালানও আছে। খোলা জায়গায় আসতেই তৌফিক বললো ঐ যে স্টেডিয়াম। দেখ না লোকজন কাজ করছে। তোরানা বললি খেলার মাঠ। মাঠ কোথায়? এতো দালান। রেজাউল জানালো দালানের ভিতরেই মাঠ। আরো কাছে গেলেই বুঝতে পারবি। বুঝা গেলো শেষে। লোহার শিকের মস্তবড় গেইট। শিকের ফাঁক দিয়ে দেখলাম মাঠ। ইয়া বড়। ইট টিট নিয়ে ছোটাছুটি করছে কিছু লোক। তখনও উপরের দিকে কাজ হচ্ছিলো। নিচে সারি সারি কামরা। সেগুলোতে আস্তর-টাস্তর হচ্ছে। আমরা হাঁটছি আর এদিক সেদিক নজর ফেলছি। কদ্দুর যেতেই আর এক মাঠ। ডান পাশে। এটিও বিশাল। মাঠের অনেকটা কিনার ঘেঁষে পুরানো একটি মসজিদ। দেয়াল টেয়াল দেখে তেমনটাই ধারণা হলো। মনে মনে ভাবলাম এযে  দেখছি মাঠের সাগর। ভিতরে মাঠ, বাইরেও মাঠ। তৌফিক জানালো এ মাঠের নাম নাকি পল্টন ময়দান। এখানে সভাটভা হয়। বিকাল বেলা মানুষজন আড্ডা ফাড্ডা দেয়। আমরা হাঁটতে হাঁটতে আবার আগের জায়গায়ই এসে দাঁড়ালাম। আমিতো অবাক। মাথা চক্কর দিচ্ছে। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে এসেই শেষ। বোকা বোকা চোখে ওদের দু’জনকেই দেখছিলাম। আমার হালত আন্দাজ করে একসাথে হেসে উঠলো তৌফিক আর রেজাউল। মাথায় গরম বাতাস এসে ধাক্কা দিচ্ছে।  সূর্য তখন অনেকটা হেলে পড়েছে পশ্চিমে। রেজাউল তাড়াহুড়া করতে লাগল। চল বাড়ি যাই। এমনিতে অনেক সময় কাবার করে ফেলেছি। আম্মা নির্ঘাত আগুন হয়ে আছেন। আমার মনেও ভয়েরা ছটফট করছে। এক প্রকার দৌড়েই ফিরলাম বাড়ি। স্টেডিয়াম ভ্রমণ পিছনে ফেলে। কপাটে শিকল টানা। এ বাড়ি ও বাড়ি গেলে এমনটাই করেন আম্মা। সব ঘর-বাড়ির দস্তুর একই রকম।  শিকলটা যেন ভরসা। শেকল খুলে ঘরে ঢুকি। ঘরে ঢুকে দেখি আম্মা নানাদের বাসায়। আড্ডায় ব্যস্ত। যাক বাবা বাঁচা গেলো এ যাত্রা। কিছুক্ষণ বাদেই আম্মা ঘরে ফিরলেন। আমি আঁড়চোখে আম্মার মেজাজের পেছন পেছন হাঁটছি। ভয়ে ধরফর করছে বুক। না তেমন কিছুই ঘটল না। শুধু বললেন এতো দেরি হলো যে! না সত্য না মিথ্যা এমন একটা ভাব করে কাটিয়ে দিলাম। এদিকে আম্মা আমার খাবার দাবার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বুকের ধুকপুকানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ