শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

জীবন গড়ার গল্প বলেছেন ইসলাম তরিক

তাজ ইসলাম :

তুহিন ও তমাল ওরা জমজ দুই ভাই। গল্পকারের কলমের যাদুতে  গ্রীষ্ম  দুপুরের উদাস হাওয়া হঠাৎ তাদেরকে ভেসে নিয়ে গেল অন্যজগতে।” সেই জগত অন্য একটি দেশ, স্বপ্ন সুন্দর ও বিশ্বাসের কেন্দ্রভূমি, অন্য একটি শহর। যে শহরে তারা গেল সে শহরের মানুষ অতিথিপরায়ণ। তারা মানুষের দুঃখে দুঃখী হয়। গল্পকারের ভাষায়  তারা শহরের ভেতর ঘুরতে থাকে। এমন সময় একজন বালক তাদেরকে সালাম দিয়ে বলল,’ প্রিয়ভাই তোমাদেরকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তোমাদের বিশ্রামের প্রয়োজন। তোমরা আমাদের মেহমানদারি গ্রহণ করতে পারো। আমাদের কুঁড়েঘরে তোমাদের স্বাগতম।’ এমন বেশ কিছু মানবিক গুণাবলী চিত্রিত হয়েছে এই বইয়ের প্রথম গল্প  নবির শহর  শীর্ষক গল্পে।

গল্পে নবির শহরের মানুষের মাঝে সততা, ন্যায়পরায়ণতার দৃশ্য চিত্রায়ন করেছেন সহজ শব্দে, সরল বয়ানে। গল্পটি স্বপ্ন ও কল্পনার জালমিশ্রিত একটি চমৎকার শিশুতোষ গল্প। তবে এতে মাঝে মাঝে শব্দের কিছু বিভ্রাট লক্ষ্য করা যায়। এটি ঠিক প্রিন্ট মিসটেক নাকি লেখকের অসতর্কতা তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।” মায়ের ডাকে তমাল ধরপর করে উঠল। তুহিন ব্যথায় কাঁকিয়ে উঠল।

নানাভাই মাহফুজের মনের অনাবিল আনন্দ অনুধাবন করলেন। তিনি বললেন, ‘মাহফুজ বিশ্বজাহানের এসব মনোরম দৃশ্য দেখে তোমার মতো জ্ঞানীরাও মুগ্ধ হয়ে মহান রবের শুকরিয়া আদায় করেন। কিন্তু মূর্খরা এসব বুঝতে পারে না বলে নিশ্চুপ থাকে। এজন্যই তো আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা জানে আর যারা জানে না, তারা সবাই কি সমান হতে পারে?’ লেখকের উদ্দেশ্য মূলত তার পাঠক মনে নিজের চিন্তা আর দর্শন পৌঁছে দেয়া। সে দিকে খেয়াল রেখেই লেখক তার বয়ান পদ্ধতিতে যুক্ত করেছেন জ্ঞানীর বাণী আর ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি। কিন্তু ভুলে গেছেন তার পাঠকদের কথা। লেখকের উদ্দিষ্ট পাঠক হলো শিশু ও কিশোর। সেই শিশু কিশোরের সামনে বাণীর পৌনঃপুনিকতায় পাঠক ক্লান্ত হতে পারে। এটিও খেয়ালের আওতায় রাখতে হবে। এই গল্পের প্লট রচিত হয়েছে মাহফুজকে আবর্তন করে। হঠাৎ এক লাইনে তামিম এসে আর নেই। আমরা সহজেই ধরে নিতে পারি এই তামিমটাও মাহফুজই হবে। এটি বড় একটি অসতর্কতা। গল্প লেখা থেকে শুরু করে প্রেসে যাওয়া, প্রুফ দেখা, সবশেষে বই আকারে মুদ্রণেও থেকে গেছে তামিম। এটি মারাত্মক ভুল না, মারাত্মক উদাসীনতা।       নানাভাই তামিমের যুক্তিযুক্ত কথা শুনে মুচকি হেসে বললেন,...... (পৃষ্টা ১৯) আবার  তামিম বলল, নানাভাই,..... (পৃষ্ঠা  ২১) এখানে তামিমের আগমন অতর্কিত ও অপ্রত্যাশিত। হঠাৎ আগন্তুকের মতো মনে হয়। এই বিষয়গুলো গল্পের সৌন্দর্য ব্যাহত করে। গল্পকারের মনযোগ প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অহংকার ছেড়ে বিনয়ী হই” একটি চমৎকার শিক্ষণীয় গল্প। এরকম গল্প শিশু-কিশোরদের চরিত্র গঠনে সহায়ক।

 মিথ্যা ছেড়ে সত্য বলি এই গল্পে মিথ্যার পরিণতি কি তা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে বাবলু। বাবলুর গল্পটি সাজাতে তার আশপাশে এসেছে জামিল, জুনাইদসহ অনেকেই। তামিম ঘোরের কথা আগেও বলেছি। তামিম তার অনেক গল্পেই হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে পাঠককে চমকে দিয়েছে।” মিথ্যা ছেড়ে সত্য বলি” তেও 

অবাক- বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করল তামিম ( পৃষ্ঠা৩২)।

 মিথ্যায় সাময়িক মজা থাকলেও গল্পকার এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বাবুলের শোচনীয় পরিণতির মাধ্যমে তার পাঠককে যথাযথ বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছেন।

রুনা আর রুবেল তারা ভাইবোন। গল্পকার রুনার চরিত্র চিত্রায়ন করেছেন পরোপকারী হিসেবে। গল্পের আবহে অংকিত হয়েছে মানুষ মানুষের জন্য। আমরা পরস্পর পরস্পরের জন্য। সার্থকভাবে অংকন করেছেন সে বিষয়টি। আমরা সবাই পরের তরে” পরের কথা ভাবলে,পরের উপকার করলে নিজের সম্মানও বৃদ্ধি পায়। রুনা মনে মনে খুশিই হবে যখন শুনতে পায় সোহেলের দাদার কণ্ঠে” তোমার এ উপকারের প্রতিদান আল্লাহ তোমাকে অবশ্যই  দান করবেন।”  কি সেই উপকার তা জানতে হলে পড়তে হবে গল্পটি। তবে দাদার বক্তব্য তোমার কথা অনেক শুনেছি দাদুভাই’র পরের বক্তব্যে অনেকগুলো নসিহত গড়গড় করে বলে যাওয়া রুনার জন্য অতিরিক্ত। যা গল্পের মেদ বলেই মনে হয়।

বিশ্বজগতের শ্রেষ্ঠ ও সুন্দরতম সৃষ্টি গল্পের একসময় হালকা বাতাসে ঘনকুয়াশা ধীরে ধীরে সরে গেল।..... এ জগতে মানুষ শুধু সুন্দরতম সৃষ্টিই নয়, মানুষই      পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব। এ পর্যন্ত পড়ে এর ভিতরে তথ্যের ভারিক্কি আর ভাবের গভীরতায় মাঝে মাঝে মনে হয় এটি কি শিশুকিশোর গল্প ? না কি প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য রচিত? তবে শিশুকিশোর হলেও সহজসরল শিশুকিশোর না এরা খুব জ্ঞানী পাঠক। আমরা মনে করি গল্পে উপদেশ থাকবে তবে এত কোটেশন ক্ষণে ক্ষণে গল্পের মেজাজকে প্রবন্ধের দিকে ঠেলে দেয়। ইসলাম তরিক রচিত জীবন গড়ার গল্প” বইয়ে গ্রন্থিত সবগুলো গল্পই মূলত পাঠকদের চরিত্র গঠনে          সুপরামর্শমূলক একটি উত্তম গল্প সংকলন। এমনই আরো কিছু গল্পের শিরোনাম যথাক্রমে আমরা সবাই পরের তরে”  লোভের ফাঁদে পা দেবো না” হিংসা ভুলে উদার হই। 

ইসলাম তরিক গল্পের জন্য গল্প লিখেন না। তিনি গল্প লিখেন তার পাঠককে একটি সুন্দর বার্তা পৌঁছে দিতে। সুন্দর সমাজ গঠনে ভালো মানুষের দরকার। ভালো মানুষের জন্য উত্তম চরিত্র জরুরি। চরিত্র গঠনের এই বার্তাটি তার পাঠককে পৌঁছে দিতেই তার এই প্রচেষ্টা। বইটি পৌঁছে যাক পাঠকের হাতে হাতে এই কামনা আমাদের। বইটির প্রকাশক: পুন্ডপ্রকাশ বগুড়া। পরিবেশনায় অন্যধারা পাবলিকশন্স, ঢাকা ১২১৫। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী মোমিন উদ্দীন খালেদ। আর বিনিময় মূল্য ধার্য করা হয়েছে ১৮০ টাকা।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ