শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

‘নবিনামা’ নিয়ে কবি সায়ীদ আবুবকরের মুখোমুখি

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবি সায়ীদ আবুবকর। জন্ম ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ যশোর জেলায়। ‘প্রণয়ের প্রথম পাপ’ (১৯৯৬) কাব্যগ্রন্থ দিয়ে তাঁর বাংলা সাহিত্যে অনুপ্রবেশ। ‘প্রণয়ের প্রথম পাপ’ কাব্যগ্রন্থের জনপ্রিয়তার কারণে ‘প্রণয়ের প্রথম পাপের কবি’ কবি নামে তিনি খ্যাত। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৪, যার মধ্যে দুটি মহাকাব্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলোÑ প্রণয়ের প্রথম পাপ (১৯৯৬), জুলেখার শেষ জাল (২০০৪), সাদা অন্ধকারে কালো জ্যোৎ¯œায় (২০০৬), বঙ্গেতে বসতি (২০০৮), এবার একটিবার একসাথে (২০১০), কাগজ কুসুম (২০১৪), আমার কোথাও যাওয়ার নেই (২০১৭), মহাকালের কান্না (২০১৮), নবিনামা (২০২১) প্রভৃতি। নবিনামা তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ। এটি একটি মহাকাব্য, যা রচিত হয়েছে মানবতার মুক্তিদূত মহানবী হযরত মহম্মদ (স)কে নিয়ে। মহাকাব্যটি প্রকাশিত হয় ২০২১-এর বাংলা একাডেমি বইমেলায়। ইতোমধ্যে ‘নবিনামা’ নিয়ে পাঠকদের মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।  ৫৭৫ পৃষ্ঠার দীর্ঘ এ মহাকাব্যটি নিয়ে কবি সায়ীদ আবুবকরের মুখোমুখি হন তরুণ কবি ও রম্য লেখক রুকাইয়া মুন। তাঁর নেওয়া কবির এ সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে এখানে তুলে ধরা হলো।Ñসাহিত্য-সম্পাদক

রুকাইয়া মুন: আসসালামু আলাইকুম, প্রিয় কবি। কেমন আছেন?

সায়ীদ আবুবকর: ওয়ালাইকুমুস সালাম। আলহামদুলিল্লাহ। আপনাদের দোয়ায় ভালো আছি। 

রুকাইয়া মুন: ২০২১-এর বাংলা একাডেমি বইমেলায় আপনার নতুন মহাকাব্য ‘নবিনামা’ প্রকাশিত হয়েছে সরলরেখা প্রকাশনাসংস্থা থেকে। গ্রন্থটি নিয়ে ইতোমধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে পাঠকদের মধ্যে। প্রাথমিকভাবে নামটি শুনে মনে হয় এটি একটি নবী-জীবনী। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী? এটি নবী-জীবনী, নাকি ¯্রফে মহাকাব্য?

সায়ীদ আবুবকর: অনুগ্রহ করে এটাকে কেউ সাদামাটা জীবনী বলবেন না, এটি একটি মহাকাব্য। মহাকাব্য যেহেতু সাহিত্যের একটি উৎকৃষ্ট শাখা, এখানে নবীর (স) জীবনকাহিনীর চেয়ে সাহিত্যের উপাদানই পাবেন বেশি। সত্যি বলতে কী, রসুলের নিখুঁত জীবনী রচনা করার মতো স্পর্ধা আমার নেই কারণ আমি কোনো ইসলামিক স্কলার নই। কিন্তু আমি আজীবন রসুলের (স) একজন আশেক। আমার সারা জীবনের স্বপ্নই ছিলো প্রাণাধিক প্রিয় রসুলের (স) উপর একটা মহাকাব্য রচনা করার। বরং ইউরোপিয়ান মহাকাব্যসমূহের আদলেই লেখার চেষ্টা করেছি এ মহাকাব্যটি। 

রুকাইয়া মুন: তাহলে জীবনী ও মহাকাব্যের মধ্যে পার্থক্য কী?

সায়ীদ আবুবকর: পার্থক্য অনেক। জীবনী হলো সত্যাশ্রয়ী আর মহাকাব্য হলো সাহিত্য। সাহিত্য সবসময়ই কল্পনাশ্রয়ী হয়ে থাকে। মহাকাব্যে একজন মহান যোদ্ধা থাকবেন, তিনি হবেন উৎকৃষ্ট মানব। কমপক্ষে দুটি দেশ বা জাতির মধ্যে যুদ্ধ থাকতে হবে, মহাকাব্যের নায়ক সেখানে লড়াই করে যাবেন ন্যায় ও সত্যের জন্যে।মহাকাব্য হলো জাতি-জাগানিয়া গান, যে-গান শুনে আত্মভোলা জাতি ফের খুঁজে পায় দিশা।

রুকাইয়া মুন: ‘নবিনামা’য় মোট ২৩টি সর্গ রয়েছে। ৫৭৫ পৃষ্ঠার এত বড় মহাকাব্য লিখতে আপনার কতদিন সময় লেগেছে? ‘নবিনামা’ লেখার প্রেক্ষাপটটা কি বলবেন দয়া করে?

সায়ীদ আবুবকর: ‘নবিনামা’ আমি একটানা লিখেছি পাঁচ মাস ধরে। এডিট করেছি দু-মাস। করোনাকালীন অবসরটা আমাকে সুযোগ করে দিয়েছিল আমার স্বপ্নের মহাকাব্য ‘নবিনামা’ লিখে শেষ করে ফেলার। ২০২০ সালের ১৭ মার্চে শুরু করে জুলাই মাসের শেষ দিকে আমি এটা লিখে শেষ করি। এক মাস ফেলে রেখে এডিট করি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসব্যাপী। তবে এর শুরুর ইতিহাস অনেক আগেকার। অনেকেই জানেন, আমি কাজী নজরুল ইসলামের অসমাপ্ত মহাকাব্য ‘মরু-ভাস্কর” শেষ করার মানসে এর বাকি অংশ লেখা শুরু করি ১৯৯৮ সালে, যা ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয় তখনকার জনপ্রিয় সাহিত্যপত্রিকা পাক্ষিক পালাবদলে। নজরুল লিখেছিলেন মহানবীর (স) কৈশোর পর্যন্ত; আমি শুরু করেছিলাম “যৌবন” থেকে। নজরুলের স্টাইলে আমি মোট চারটি সর্গ লিখেছিলাম তখন। প্রশংসার বানে আমাকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন পালাবদলের পাঠকেরা। ‘মরু-ভাস্কর’ নিয়ে চিঠির পর চিঠি ছাপা হতো পালাবদলে। কিন্তু একদিন প্রখ্যাত কবি ও জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান আমাকে তাঁর বাসায় ডেকে নিয়ে অনেক উপদেশ দিলেন। পালাবদলের তিনি ছিলেন একজন নিয়মিত লেখক। তিনি আমার লেখার প্রশংসা করলেন বটে, কিন্তু বললেন, “তোমার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে মহানবীর (স) উপর তোমার পড়াশুনা যথেষ্ট নয়।” তিনি আমাকে বিশে^র বিখ্যাত কিছু সীরাতগ্রন্থের নাম বলে দিলেন। বিষয়টা আমাকে ভাবিয়ে তুললো। বইগুলো আমি যতো পড়তে থাকলাম, ততই বুঝতে পারলাম আমার কমতির কথা। তারপর তো বন্ধই হয়ে গেল ‘মরু-ভাস্কর’ লেখা। কিন্তু আমার হৃদয়ের মধ্যে রয়ে গেল ‘মরু-ভাস্করে’র রেশ। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম, নজরুলের মতো করে নয়, আমার মতো করেই আমাকে লিখতে হবে রসুলের (স) উপর একটি বৃহৎ মহাকাব্য, যা আমি শুরু করেছিলাম মূলত ২০১৭ সালে কিন্তু অফিসিয়াল কাজের ব্যস্ততার কারণে সময় করে উঠতে পারছিলাম না কিছুতেই। করোনার ছুটি আমার জন্য বয়ে আনলো সেই সুবর্ণ সুযোগ।  

রুকাইয়া মুন: বাংলা ভাষায় মহাকাব্য লিখেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত (মেঘনাদবধ কাব্য), কায়কোবাদ (মহাশ্মশান), নবীনচন্দ্র সেন (পলাশীর যুদ্ধ), হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় (বৃত্র-সংহার) প্রভৃতি। অন্যান্য মহাকাব্যের সাথে ‘নবিনামা’র পার্থক্য কী?

সায়ীদ আবুবকর: আমি ‘নবিনামা’ লেখার জন্যে মধুসূদন, কায়কোবাদ, নবীনচন্দ্র ও হেমচন্দ্র কারো স্টাইল অনুসরণ করিনি। তবে মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র চৌদ্দমাত্রার অমিত্রাক্ষর ছন্দ অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি মাত্র, যদিও তাকে আধুনিকায়ন করে তার রূপ বদলে দিয়েছি একেবারে। ‘নবিনামা’কে পাঠক গদ্যকবিতার স্টাইলে পড়তে পারবেন। বাংলা ভাষার উল্লিখিত মহাকাব্যসমূহে মহম্মদ (স)-এর মতো উন্নত ও মহান কোনো চরিত্রের সন্ধান আপনি পাবেন না। কতটুকু সফল হয়েছি তার মূল্যায়ন করবেন পাঠকেরাই। 

রুকাইয়া মুন: ইংরেজি ভাষার মহাকবি মিল্টন। তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্য ‘প্যারাডাইস লস্ট’, যা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল বাংলার প্রথম মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে। গ্রিক ভাষার মহাকবি হোমার বিখ্যাত তাঁর অমর মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’র কারণে। পাশ্চাত্য এসব মহাকাব্য ‘নবিনামা’র উপর কোনো প্রভাব বিস্তার করেছে কিনা?

সায়ীদ আবুবকর: আগেই বলেছি ‘নবিনামা’ আমি লেখার চেষ্টা করেছি পাশ্চাত্যের         মহাকাব্যসমূহের আদলে। দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’, ভার্জিলের ‘ইনিড’, মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’, হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ ছিল আমার চোখের সামনে। তবে সত্যি বলতে কী, যার কাব্যভাষা, স্টাইল ও কাহিনীবর্ণনার ধরন আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে, তিনি হলেন হোমার। বিশেষ করে হোমারের ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যই আমাকে আন্দোলিত করেছে বেশি। ‘নবিনামা’র স্টাইলে এই ইলিয়াডেরই প্রভাব রয়ে গেছে, তা আমি বিনয়ের সাথে স্বীকার করতে চাই। 

রুকাইয়া মুন: ‘নবিনামা’র গঠনশৈলী সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন। ‘নবিনামা’ কোন ছন্দে রচিত হয়েছে বা কী কী ছন্দবৈচিত্র্য প্রয়োগ করা হয়েছে, পাঠকদের উদ্দেশ্যে অনুগ্রহ করে বলুন।

সায়ীদ আবুবকর: ‘নবিনামা’ মূলত চৌদ্দ মাত্রার অমিত্রাক্ষর অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। তবে মাঝেমধ্যে প্রচুর অন্ত্যমিলেরও প্রয়োগ করেছি আমি। মহাকাব্যের যেখানে যেখানে ভাবাবেগের আতিশয্য ঘটেছে সেখানে অন্ত্যমিলসমৃদ্ধ পয়ার ছন্দ ও অনেকগুলো সনেটের ব্যবহার করেছি, যা সচেতন পাঠকের দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে না। চৌদ্দমাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে প্রয়োগ করেছি নানাভাবেÑ৮+৬=১৪ অথবা ৬+৮=১৪ অথবা ৪+৩+৩+৪=১৪ অথবা ৭+৭=১৪। ভাষার মধ্যে আমি গদ্যের বহতা আনার চেষ্টা করেছি, যাতে পাঠকেরা কোনো বিরতি ছাড়াই গল্প পড়ার মতো করে পৌঁছে যেতে পারেন কাহিনীর শেষ প্রান্তে। 

 রুকাইয়া মুন:  নবিনামায় আপনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রচুর উপমা ও অলঙ্কার ব্যবহার করেছেন। যেমন-

মহম্মদ নাম

        যে পাখি জবানে নিলো, মিষ্টি হলো সুর,

        তার গানে মুগ্ধ হল জগৎ তামাম;

        মহম্মদ নাম জপে নাচলো ময়ূর,

        বাড়লো জগৎজুডে ময়ূরের দাম;

        মহম্মদ নাম যেই জপলো আঙুর-

        আপেল-বেদানা-কলা-আনারস-আম,

        মুহূর্তে মিষ্টিতে তারা হলো ভরপুর;

        তাই দেখে লিচু-চেরি-জামরুল-জাম

        তারাও তুলল কন্ঠে মহম্মদ-সুর,

        তারাও সুমিষ্ট হয়ে ছড়ালো সুনাম।

কিংবা শেষ সর্গে-

        মৃত্যুর কি সাধ্য,এসে মোছে এই নাম-

        যে-নাম রয়েছে ঘিরে সমস্ত মোকাম,

        যে-নামে ভ্রমর নাচে ফুল থেকে ফুলে,

        যে-নামে বাতাস নাচে জাহাজে মাস্তুলে,

        যে-নামে গানের পাখি গায় তার গান,

        যে নামে বেলাল হাঁকে মিনারে আযান!

        মহম্মদ বেঁচে আছে , হে আবুবকর,

        যেখানে লুকিয়ে আছে তোমার অন্তর।

‘নবিনামা‘র উপমা ও অলঙ্কার সম্পর্কে আপনার কাছে কিছু কথা জানতে চাচ্ছি।

সায়ীদ আবুবকর: ঠিকই ধরেছেন। কবিতা তো উপমা ও অলংকারের খেলা। আর মহাকাব্য তো মহাকাব্যই হয়ে ওঠে না, যদি না তাকে মুড়িয়ে দেওয়া হয় উপমা ও অলঙ্কারে। ‘নবিনামা’র পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রচুর সিমিলি, মেটাফোর, পারসোনিফিকেশান, অক্সিমোরোন, এনেকডোট প্রভৃতি ফিগার অব স্পিচ। আর মহাকাব্যের অনিবার্য একটি উপাদান হলো এপিক সিমিলি, যেটা আপনারা ‘নবিনামা’র মধ্যেও পাবেন। আপনার উদ্ধৃত প্রথম কাব্যাংশে আমি ব্যবহার করেছি সিমিলি ও পারসোনিফিকেশান; সেই সাথে ইমেজারি বা চিত্রকল্প। মহম্মদ নাম জপার গুণে বিভিন্ন সৃষ্টিকুল যে অনন্য গুণে গুণান্বিত হয়ে উঠলো তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এই অংশে। দ্বিতীয় উদ্ধৃত কাব্যাংশে মৃত্যুকে পারসোনিফাই করা হয়েছে, যার ক্ষমতাই নেই মহম্মদ নামের অস্তিত্বকে মুছে ফেলার। পাঠক যখন এভাবে লক্ষ্য করে করে কবিতা পড়তে থাকেন তখনই কেবল তার পক্ষে সম্ভব হয় প্রকৃত কাব্যরস আস্বাদন করা। 

রুকাইয়া মুন:  আধুনিক কালে কবিদের মহাকাব্য রচনা না করার কারণ কি বলে আপনি মনে করেন? অনেকে মনে করে থাকেন মহাকাব্যের দিন শেষ, এ সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?

সায়ীদ আবুবকর: এর অন্যতম কারণ হতে পারে আধুনিক মানুষের কর্মব্যস্তততা ও ভিতরকার অস্থিরতা। ছোটগল্প ও ছোট ছোট কবিতার প্রতি পাঠকদের এখন আগ্রহ বেশি, যে-কারণে লেখকরাও পাঠকদের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। তবে তারচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের দেশের খুব কম কবিই বৃহত্তর পরিসরের কাজ করার ক্ষমতা রাখেন। মহাকাব্যের মধ্যে যে গ্রান্ড স্টাইল ও গ্রান্ড ক্যারেক্টর থাকা প্রয়োজন. খুব কম সংখ্যক কবির মধ্যে এ ধরনের চরিত্রকে ধারন করার ও এ ধরনের স্টাইল ব্যবহার করার ক্ষমতা আছে। ছোট ছোট কবিতা দিয়ে বড় কবির পরিচয় পাওয়া যায় না। বড় কবি চেনা যায় বড় বড় কবিতা দিয়ে। টি এস এলিয়টের ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’, ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘ইমমর্টালিটি ওড’ বা ‘মাইকেল’, শেলির ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উয়িন্ড’, কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দ্য এনসান্ট মেরিনার’, রবার্ট ফ্রস্টের ‘হোম বেরিয়াল’,  রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’, নজরুলের ‘মানুষ’, জসীম উদ্দীনের ‘কবর’, ফররুখ আহমদের ‘কারবালা’, শামসুর রাহমানের ‘চাঁদ-সদাগর’, আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ প্রভৃতি মোটেই ছোট কবিতা নয়। এঁরা সবাই উচ্চ মাপের কবি। প্রচলিত ট্রেন্ড বা যুগধর্মের কারণে হয় তো এনারা মহাকাব্যমুখী হন নি। কিন্তু আল মাহমুদ ঠিকই মহাকাব্যের ¯্রােতে ফিরতে চেয়েছিলেন। সেন্ট লুসিয়ান কবি ডেরেট ওয়ালকট (১৯৩০-২০১৭) ১৯৯২ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান তাঁর মহাকাব্য ‘ওমারোস’ (১৯৯০)-এর জন্য। আমাদের দেশের কয়জন কবি এর খোঁজখবর রাখেন? যাঁরা মনে করেন মহাকাব্যের দিন শেষ, তাঁদেরকে আমি ‘ওমারোস’ পড়ার আহ্বান জানাই।   

রুকাইয়া মুন:  আপনি অত্যন্ত ছন্দ-সচেতন কবি বলেই আমরা জানি। ‘নবিনামা’য় আছে নিখুঁত ছন্দ এবং কোথাও কোথাও  চরণের শেষে শেষে অন্ত্যমিলের ব্যবহার। আধুনিককালে যাঁরা ছন্দহীন কবিতা লেখেন তাঁদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

সায়ীদ আবুবকর: আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত কবিদের মধ্যে ছন্দ জানেন না বা তাঁদের কবিতায় ছন্দ প্রয়োগ করেননি এমন কোনো কবি আছেন বলে আমার জানা নেই। তরুণদের অনেকের মধ্যে ছন্দ প্রয়োগ না করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এর প্রধান কারণ একটাই, আর তা হলো, এঁরা আদৌ ছন্দ জানেন না; ছন্দশাস্ত্র অধ্যায়ন করার মতো ধৈর্য এঁদের নেই। কবিতা রচনা তো এক ধরনের ধৈর্য-পরীক্ষার ব্যাপার। এ কি মামুর বাড়ির গাছের পাকা আম যে, ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে পাড়লাম আর খেলাম কেউ কিছু বললো না! ডাক্তারি পাশ না করে যেমন ডাক্তার হওয়া যায় না, তেমনি ছন্দ ও অলঙ্কার শাস্ত্র না জেনেও ভালো কবি হওয়া যায় না। তরুণদের জন্যে আমার পরামর্শ, কবিতা লেখার আগে অন্তত বাংলা কবিতার প্রধান তিনটি ছন্দÑস্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ভালো মতো আয়ত্ত করে নিন। 

রুকাইয়া মুন:  কবি-সাহিত্যিকরা পুরস্কারের জন্য লেখেন না। তবুও মেধা ও শ্রমের স্বীকৃতি পেলে মানুষ আনন্দিত হয়। আপনি দেশে ও দেশের বাইরে সাহিত্যে অবদানের জন্য লালন পদক (২০০৯), উৎসঙ্গ সাহিত্য সম্মাননা (২০১২), সৈয়দ আলী আহসান পদক (২০১৭), রক পেবলস ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি এওয়ার্ড(২০১৭), দেশজ সাহিত্য পদক (২০১৮) সহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কারের ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কী?

সায়ীদ আবুবকর: পুরস্কার লেখক হতে কখনো সাহায্য করে বলে আমি বিশ^াস করি না। বরং এর উল্টোটাই হতে দেখেছি সব সময়। অনেককেই দেখেছি জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছেন। এর কারণ হলো, পুরস্কারপ্রাপ্তির পর তাঁরা এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভুগেছেন এই ভেবে যে, বাংলা সাহিত্যে তাঁদের অবস্থান পাকাপোক্ত হয়ে গেল। এরপর তাঁরা আর লিখতে পারেননি। ফলে আম ও ছালা দুটোই হারিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁদের হাপিত্যেশ করতে হয়েছে কারণ ধারাবাহিকতা না থাকলে আপনি আর লিখতে পারবেন না। আমি তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পুরস্কার-টুরস্কার পাইনি। ছোটো খাটো যেসব পুরস্কার পেয়েছি তার মধ্যে ভারতের উড়িশ্যা থেকে প্রাপ্ত ‘রক পেবলস ইন্টারন্যাশনাল লিটারেরি এওয়ার্ড ২০১৭’ উল্লেখযোগ্য। পুরস্কারটি গ্রহণ করতে আমি ভারতে গিয়েছিলাম। 

রুকাইয়া মুন:  নবী মহম্মদ (স) মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয। আপনি ‘নবিনামা’য় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাসাল্লাম-এর জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সন্নিবেশিত করেছেন। এক্ষেত্রে ইতিহাস সচেতনতার বিষযটি আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

সায়ীদ আবুবকর: নবী মহম্মদ (স) যেন তেন বিষয় নয়। তিনি কয়েক শ কোটি মুসলমানের ভালবাসা ও আবেগের বিষয়। সুতরাং তাঁর নামের সাথে যে-কোনো কাল্পনিক কথা জুড়ে দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই। তাই আমাকে সবসময়ই ইতিহাস-সচেতন থাকতে হয়েছে। আপ্রাণ চেষ্টা করেছি ইতিহাসকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে। হোমার ‘ইলিয়াড’ লিখেছিলেন দেবদেবি ও কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে। কিন্তু আমার মহাকাব্যের নায়ক একটি ঐতিহাসিক চরিত্র, যিনি আধুনিক সভ্যতার জনক এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও মহানবী। সুতরাং আমার এখানে কল্পনার সুযোগ কম। এটা আমার মাথায় রাখতে হয়েছে। 

রুকাইয়া মুন: মহাকাব্য লেখকের অন্তর-অনুভূতির প্রকাশ নয়, বস্তুপ্রধান ঘটনা-বিন্যাসের প্রকাশ; গীতিকাব্যোচিত বাঁশির রাগিনী নয়, যুদ্ধসজ্জার তূর্য-নিনাদ। এছাড়াও, আমরা জানি এটি সাধারণত মহাকায়, মহিমোজ্জ্বল, ব্যাপক হিমাদ্রি-কান্তির মত ধীর, গম্ভীর, প্রশান্ত, সমুন্নত ও মহত্ত্ব্যঞ্জক। মহাকাব্যে কোনো দেবতা বা অসাধারণ গুণসম্পন্ন পুরুষের কিংবা একবংশোদ্ভব বহু নৃপতি বা রাজা-বাদশাহর বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রিয় কবি, আপনার ‘নবিনামা’র মহানায়ক সম্পর্কে পাঠকের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলবেন কি?

সায়ীদ আবুবকর: যথার্থই বলেছেন। মহাকাব্যে লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে, ঘটনার ঘনঘটা থাকবে বেশি, বাঁশির সুরের চেয়ে রণহুঙ্কারই থাকবে বেশি এবং এর মহানায়ক হবেন কোনো রাজা-বাদশাহ কিংবা বীর, সাদামাঠা মানুষ হবেন না কিছুতেই। আমার মহাকাব্যের নায়কও কোনো সাধারণ মানুষ নন, তিনি মহান ¯্রষ্টার মনোনীত মহাপুরুষ, যিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন অসভ্যতার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবজাতিকে মুত্ত করার জন্য। এজন্যে তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে সমস্ত জীবন। সহ¯্র বীরের অধিক বীরত্বে উজ্জ্বল তাঁর একক জীবন। কিন্তু তিনি আজীবন ছিলেন যুদ্ধবিরোধী; তাঁর উপর শত্রপক্ষের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধকেই তাঁকে প্রতিহত করতে হয়েছে বারবার। তিনি ছিলেন দয়ার সমুদ্র; ক্ষমা ও ভালবাসাই ছিলো তাঁর মুখ্য অস্ত্র। মক্কা বিজয়ের পর যখন বনু খুযায়াহ বনু লুসাইয়ের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেললো, তিনি বলে উঠলেন:

                   ওহে বনু খুযায়াহ!

তোমাদের হাতকে তোমরা হত্যা হতে 

সংযত রাখো। যদি হত্যাই সমস্ত

সমস্যার সমাধান হতো, তাহলে তো

অতীতের হত্যাযজ্ঞ আনতে পারতো 

শান্তি পৃথিবীতে। হত্যা নয়, প্রেম দিয়ে

এসো করে তুলি পৃথিবীকে শান্তিময়।

এমন এক চরিত্র আমার এ মহাকাব্যের নায়ক, যাঁর মহান ব্যক্তিত্ব, শৌর্য-বীর্য ও ঔদার্যের কাছে শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়ে নির্যাতিত মানবতা এবং পরাজিত হয় মানবজাতির শত্রুরা। 

রুকাইয়া মুন: মহাকাব্যের আখ্যান-বস্তু পৌরাণিক বা     ঐতিহাসিক। বিশ্বনাথ বলেছেন, ইতিহাসোদ্ভবংবৃত্তমন্যদ্বাসজ্জনাশ্রয়ম্। নায়ক (কখনো কখনো একাধিক নায়কও থাকিতে পারে)  ধীরোদাত্তগুণসমন্বিত অর্থাৎ সমস্ত সদ্গুণের সমষ্টিভূত। ‘নবিনামা’য় মহানায়কের পাশাপাশি আর  কোনো নায়কোচিত চরিত্র আছে কিনা কিংবা কোন খলনায়ক আছে কিনা? খলনায়ক হিসেবে কাকে দেখানো হয়েছে?

সায়ীদ আবুবকর: বাস্তবিকই ‘নবিনামা’র প্রধান চরিত্রের মধ্যে সমস্ত সদ্গুণের বিস্তার ঘটেছে। তবে এ মহাকাব্যে একই সাথে এসেছে আবুবকর, ওমর, আলী, হামজার মতো অনেক মহান চরিত্র। পাশাপাশি এসেছে আবু জেহেল, আবু লাহাব, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই, মক্কা বিজয়ের পূর্ব-পর্যন্ত আবু সুফিয়ান ও হিন্দার মতো ঘৃণ্য খলচরিত্রও। বদরের যুদ্ধ পর্যন্ত খলনায়ক থেকেছে আবুল হাকাম বা আবু জেহেল; বদরের যুদ্ধের পর ও মক্কাবিজয়ের পূর্ব-পর্যন্ত আবু সুফিয়ান। 

রুকাইয়া মুন: রাসূল (স)-এর একাধিক পুণ্যবতী স্ত্রী ছিলেন। এছাড়া ছিলেন মা আমিনা, দুধমাতা হালিমা ও প্রিয় কন্যা ফাতিমার মতো মহিয়সী রমণীরা। ‘নবিনামা’য় কোন্ কোন্ নারী চরিত্র প্রধান্য পেয়েছে?

সায়ীদ আবুবকর: যে-সমাজে কন্যাশিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো জঘন্য প্রথা চালু ছিলো, সমাজে নারীদের তেমন কোনো মর্যাদা ছিলো না, ইসলামের আবির্ভাবের পর সেখানে নারীরা পুরুষের সমান মর্যাদায় আসীন হন। নবী (স) বলেন, “মায়ের পায়ের তলে সন্তানের বেহেস্ত।” এভাবে রমণীদেরকে তিনি মহাসম্মানের আসনে  ওঠান। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে, ইসলামে নারী চরিত্র কত গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গত কারণেই ‘নবিনামা’য় অনেক মহিয়সী রমণী বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছেন। মক্কী জীবনে খাদিজার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মা-খাদিজার মৃত্যুর পর আয়েশা ও ফাতিমার চরিত্র উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তবে মহাকাব্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ফাতিমার উজ্জ্বল উপস্থিতি জানান দিয়ে যায় প্রধান নারীচরিত্র হলেন ফাতিমা। নারী-খলচরিত্রের মধ্যে হিন্দা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে।  

রুকাইয়া মুন:  ‘নবিনামা‘র পরে আগামীতে আপনার কী কী বই আসছে?

সায়ীদ আবুবকর: যিনি খাঁটি শিল্পী, তাঁর কোনো কিছুতেই কখনো তৃপ্তি আসে না। নতুন নতুন সৃজনে তাই তাঁকে নিমগ্ন থাকতে হয় সর্বক্ষণ। তদ্রƒপ আমিও কখনো বসে নেই। নতুন নতুন কাজ নিয়ে আমি ব্যস্ত থাকি সবসময়। কিন্তু গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার আগে সে-সম্বন্ধে আমি কখনো কথা বলতে পছন্দ করি না কারণ বহু যাচাই বাছাই করার পরই আমি কোনো লেখা প্রকাশ করার জন্য দেই; নিজের তুপ্তি না আসা পর্যন্ত কোনো লেখাকে স্বীকৃতি দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কোনো কিছু লিখে ফেললেই তো তা লেখা হয়ে ওঠে না; ভাস্করের মতো তার উপর অনেক কাটা-ছেঁড়া করতে হয়, তারপরেই না তা শিল্প হয়ে ওঠে।  

রুকাইয়া মুন: আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, কবি। ভালো থাকবেন।

সায়ীদ আবুবকর: আপনাকেও ধন্যবাদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ