শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

সাজজাদ হোসাইন খান:

 ॥ উনচল্লিশ ॥

 

আগানগরের খুশির চুলগুলোও আউলাঝাউলা হয়ে পড়লো। তাছাড়া পড়াশোনায়ও ঠিকঠাক মতো মন বসছিল না। কি করে বসবে! একবার ঠাকুরপাড়া একবার অশোকতলা, আবার আগানগর। একেক সময় একেক বাতাস একেক ছবি। টুল টেবিলও আলাদা। নানাবাড়িতেও মন খারাপের ব্যারাম। নানী- খালাদের চোখের পানি হাঁটা-চলা শুরু করেছে। খুশি আর বেদনা হাঁটছে পাশাপাশি। দেখলাম হুমায়ুন মামার চেহারায়ও বেজার বেজার ভাব। 

নৌকা সাজানো হলো। বিছানাপত্র বালিশ টালিশ দিয়ে। সকালটা পানসে পানসে লাগছে। রাতে বৃষ্টি হয়েছে মুষলধারায়। সূর্যটা পর্দার আড়ালে। বৃষ্টি ঝরবে কি ঝরবে না এমন আলোচনা হলো নানা-মামাদের মধ্যে। মাঝিরা বললো বৃষ্টি নামলে নামুক। আমরা ঠিকঠাক নৌকা পৌঁছে দেব। তারপর ভৈরব স্টেশন, তেমন কি আর। আম্মা বললেন চল রওয়ানা হই। এখনতো আকাশ পরিষ্কার। বাড়ির সবাই জড়ো হয়েছে ঘাটলায়। প্রতিটি চোখেই যেন উড়ছে বেদনার উড়না। আল্লাহ’তায়ালার নাম নিয়ে নৌকা ভাসালো মাঝিরা। আম্মাও দোয়াদরুদ পড়ে ফুঁ টু দিলেন। আমি দেখছি নানাবাড়ি যাচ্ছে দূরে। 

অমরনাথপুর পার হতেই মেঘনা। দূরে দেখা যাচ্ছে ভৈরবের পুল। এখানে এসেই মাঝিরা পাল খাটালো। তরতর করে আগে বাড়ছে নৌকা। মাথার তালুতে সূর্য উঠতেই নৌকা এসে ভিড়লো ভৈরববাজার ঘাট। পেঁয়াজ-মরিচের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। ভৈরব বড়সর একটা নৌবন্দর। হরেক রকম ব্যবসাবাণিজ্য হয় এখানে। আগে এলাকাটির নাম ছিল উলুকান্দির চর। বড় মামার কাছে জেনে ছিলাম। এক সময়ের চর এখন বিশাল বাজার। বাজারের মাঝ বরাবর পথেই আমাদের রিক্সা রেল স্টেশন পর্যন্ত চলে এলো। বেশি সময় অপেক্ষায় থাকতে হলো না। হাজির হলো ফোঁস ফোঁস রেলগাড়ি। ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে। ফেরিওয়ালাদের দৌড়ঝাঁপ, হাঁকডাক। তারপর গাড়ির বাঁশির চিৎকার। কান ঝালাপালা আর কি। আগের নিয়মেই চড়তে হলো রেলগাড়িতে। এক কামড়ায় আমি আর বড় মামা। অন্য কামড়ায় আম্মা। একটু অপেক্ষা। ঘন্টা বাজালো এক লোক। এরপর দুটি চিৎকার। ইঞ্জিনের মগজ ফেটে বেড়িয়ে এলো কালো ধোঁয়া, উড়লো আকাশে। ইঞ্জিনের পেট বরাবর জ্বলছে আগুন। ধাউ ধাউ। চলতে শুরু করলো রেলগাড়ি। ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক। 

জানালার বাইরে নজর ফেললাম। গাছ গ্রাম যাচ্ছে পেছনে, আর রেলগাড়ি দৌড়াচ্ছে আগে। গাড়ির একটা অন্যরকম দুলুনি। ঘুমঘুম লাগছিল আমার। অনেক কষ্টে চোখের পাতা দু’টি আলাদা রাখলাম। সময় ঘষে ঘষে যাচ্ছে রেলের চাকা। কিছু দূর পার হয়েই থামছে রেল। মানুষ উঠছে নামছে। এই করে করেই দাঁড়ালো এসে গাড়ি। একটা জমজমাট এলাকা। বেশ বড়সর আলতায় চুবানো দালান।

এক মাথা নিমতলী ছুঁই ছুঁই। অন্য মাথা গিয়ে ঠেকেছে নবাবপুর রোড। দাঁড়িয়ে আছে অনেক গাড়ি। বড় মামা বললেন আমরা এসে গেছি। এই তো ঢাকার ফুলবাড়িয়া স্টেশন। অনেক লোক নামছে। প্রায় শখানেক তো হবেই। এরি মধ্যে আব্বা এসে হাজির। বড় মামা আম্মাকে নামালেন। আব্বার পেছন পেছন আমি। হৈ হৈ রৈ রৈ তামাম স্টেশন জুড়ে। রেল দালানের মূল দরজা পেরিয়ে এলাম। পার হবার সময় টিকেট দেখালেন মামা। দরজায় দাঁড়ানো ছিল এক লোক পুলিশের মতো। সাদা রঙের পোশাক। তখনই দেখলাম দরজার ওপর দিকে লেখা আছে ফুলবাড়িয়া। বড়সর হরফে। তখনই একটা ধাক্কা খেলাম। ভুল এলাকায় নেমে পড়লাম নাতো। আমরাতো নামবো ঢাকায়। হাঁটতে হাঁটতে বড় মামাকে বললাম এটিতো ঢাকা না, ফুলবাড়িয়া লেখা। মামা হাসলেন। মামা জানালেন ঢাকা আর ফুলবাড়িয়া একই কথা। এই জবাব মোটেই পছন্দ হলো না আমার। চুপ মেরে থাকলাম। মগজে বিভ্রাটের বাতাস বইছে হু হু। আব্বা তাকালেন আমার দিকে। তারপর তিনিও হাসলেন, বললেন কেন ফুলবাড়িয়া আর ঢাকা এক বরাবর, একটু বাদেই খোলাসা করছি। আগে গাড়ির ঝামেলাটা শেষ করতে দাও। স্টেশন থেকে নেমেই দেখি সারি সারি ঘোড়ার গাড়ি। পাশে রিক্সাও আছে অনেক। আব্বা দরদাম করে ঠিক করলেন ঘোড়ার গাড়ি, তিন আনায়। যে এলাকাটিতে গিয়ে ঘোড়া দাঁড়িয়ে যাবে সেই পাড়ার নাম নাকি শান্তিবাগ। আমরা গাড়িতে উঠলাম। ঘোড়া উসখুস করছে। যেন দৌড় দেবে এখনি। এরি মধ্যে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। দেরি না করে রওয়ানা দিলো গাড়ি।  ঘোড়া চলছে ঠকঠক । দুলছে গাড়ি ডানে বাঁয়ে। ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে নজর ফেললাম। রাস্তার খাম্বায় জ্বলছে বাতি মিটমিট। আশপাশের বাড়িঘরগুলো নজরে আসছে আবছা আবছা। রিক্সার টুং টাং শব্দ,  ঘোড়ার চিৎকার, মাঝেমধ্যে যাচ্ছে বাস-গাড়ি। মজাই লাগছিল ঘোড়ার গাড়ি যাত্রা। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ