শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

করোনাকালে মানুষের জীবন নিয়ে পিশাচের বাণিজ্য

 ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : সারা বিশ্বে করোনা মহামারি শুরু হয়েছে গত বছর মার্চে চীনের উহান প্রদেশ থেকে। এ মহামারি শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য চীন বহুবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং প্রায় দেড়শ’ কোটির বিশাল দেশকে দ্রুতই তারা করোনামুক্ত করে ফেলেছে। সারা বিশ্বে করোনা মহামারি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লেও চীন প্রথমে ঘরোয়া পদ্ধতিতে তার ভ্যাকসিন দিয়ে সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে এখন চীনে করোনা নেই বললেই চলে। শুধুমাত্র মিয়ানমার সীমান্তে কখনও কখনও দু’চারজন রোগী শনাক্ত হয়। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চীন রোগীদের আইসোলেশনে নিয়ে তাদের করোনামুক্ত করে ফেলে।

কিন্তু গোটা ইউরোপ, আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ায় এখন করোনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কখনও যুক্তরাজ্যে, কখনও যুক্তরাষ্ট্রে, কখনও স্পেন ইটালিতে, কখনও এশিয়ায় করোনা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ ঘটাচ্ছে। করোনার এখন অনেক জাত। এক জাত পর্যুদস্ত হয়তো আর এক ভয়ঙ্কর জাত সামনে এসে দাঁড়ায়। এশিয়ার ১৩০ কোটি মানুষের দেশ ভারতে করোনা এখন নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে। মানুষ মরছে। চিতার আগুন ২৪ ঘন্টা জ¦লছে। মাঠঘাট বিনোদন কেন্দ্র সব কিছুই এখন শ্মশান। শব দাহ করার জন্য সেগুলোকে শ্মশান বানানো হয়েছে। ঘটছে শত শত হৃদয়বিদারক ঘটনা। এ ট্রাজেডির যেন শেষ নেই। ভারত সরকারের কর্মকা-ে মনে হয়, তারা এই মহামারিকে যেন প্রকৃতির উপর ছেড়ে দিয়েছেন, যেভাবে ঝড়ের তা-বকে ছেড়ে দেয়া হয়। ফলে সেখানে মাানুষের মনে কোনো আশা নেই, ভরসা নেই। তারপর কা-জ্ঞানহীন ধর্মীয় মেলার আয়োজন করে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশকে স্বাগত জানানো হয়েছে। হয়েছে কুম্ভ মেলাও। সেখান থেকে নতুন করে হাজার হাজার লোক করোনা আক্রান্ত হয়েছে। তারা আবার অন্যদের মধ্যে দাঁড়িয়েছে ফলে এখন তা জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। সেখানকার হাসপাতালে বেড নেই, রোগীদের জায়গা নেই, প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নেই। হাসপাতাল ‘হাউসফুল’, শ্মশান হাউসফুল, মানুষ মরছে।

এক নীট সরকারের নষ্ট চিন্তাই নষ্ট নীতির কারণে সেখানে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন সরকার যেন অনেকখানি আড়ালে আড়ালে চলে গেছে। এখন সেখানকার চরম সাম্প্রদায়িক শাসক গোষ্ঠীকে আর প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। করোনা নিয়ন্ত্রণে তাদের এই ব্যর্থতা ভোটেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, প্রায় সব জায়গায় জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। এরা ধরে নিয়েছিল, ব্যাপকভাবে গোমূত্র পান করিয়ে তারা দেশ থেকে করোনা হটিয়ে দেবে। কিন্তু সেটা হয়নি। বরং ওসব নোংরামির কারণে সম্ভবত করোনা আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মোদির নির্বাচনি এলাকায় নেমেছে ব্যাপক ধস। মানুষ বিজেপিকে ঝাঁটা মেরে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। 

এ তো গেল ভারতের কথা, কিন্তু আমরা কী করলাম। বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক নয়। এখানে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ নেই। এখানে কি ভারতের ৪ মুসলিম যুবক হিন্দুর পরিত্যক্ত ৮০০ শব দাহ করেছে। আমাদের ধর্ম সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেয় না। কিন্তু প্রথম থেকেই বাংলাদেশ এই মহামারি নিয়ে, মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করার একটা সুযোগ সরকার করে দিয়েছে। এখনও দিয়েই যাচ্ছে। যারা করে দিয়েছে বা দিয়েই যাচ্ছে, তারা নিজেদের ও ভারতের স্বার্থ দেখছে। করোনা প্রাদুর্ভাবের একেবারে শুরুতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র করোনা পরীক্ষার এক কিট আবিষ্কার করে পরীক্ষার অনুমতি চাইছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে অনুমতি পাওয়া যায়নি। গণস্বাস্থ্যকে আজ এখানে পাঠায়, ফলে সেখানে আজ এ পরীক্ষা করে কাল সে পরীক্ষায়, পরশু দিন কমিটির সামনে পাঠায়। সেখানে থাকে বেক্সিমকোর প্রতিনিধি। আপত্তি তাদের বেশি। গণস্বাস্থ্যের বক্তব্য বেক্সিমকোর প্রতিনিধি কেন? তার জবাব মেলে না। এভাবে বছর পার হয়ে গেছে। 

আসলে সরকার ঠিক ধরে নিয়েছিল যে, তারা বেক্সিমকোকে লাভ করিয়ে দেয়ার জন্য উৎপাদন নয় টিকা আমদানি করবে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে। গণস্বাস্থ্য বলেছিল, তাদের পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব যার করোনা আছে, তাকে আলাদা করে রাখলেই সঙ্কটের অনেকখানি সমাধান হবে, যা চীন করেছে। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটেনি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের কোম্পানি বেক্সিমকোর টাকা বানানোর সুযোগ করে দেবার জন্য সকল আয়োজন করা হলো। বাংলাদেশে টিকা সরবরাহের জন্য বেক্সিমকো সেরামের  সঙ্গে চুক্তি করল। টাকা অগ্রিম পেমেন্ট করা হলো ভারতের সেরামকে।

কিন্তু এই পর্যায়ে চীন বলল, বাংলাদেশ যদি তাদের টিকার যৌথ পরীক্ষায় রাজী থাকে তবে, সে টিকার মালিকানা বাংলাদেশের হবে। কিন্তু এ প্রস্তাব নিল না সরকার। নানা টালবাহনা করে দীর্ঘসূত্রিতার আশ্রয় নিল। আজ জানাবে, কাল জানাবে বলতে থাকল। বিরক্ত হয়ে চীন ঐ প্রস্তাব থেকে সরে গেল। অবারিত হলো বেক্সিমকো ভারত থেকে টিকা আমদানির পথ।  সেরামের এস্ট্রাজেনেকা টিকা বাংলাদেশে আসতে শুরু করল। কথা ছিল সেরাম বাংলাদেশকে প্রতি মাসে ৫০ লাখ টিকা সরবরাহ করবে।

ঠিক আছে, টিকা কিনুক বাংলাদেশ। কিন্তু বেক্সিমকোর মধ্যস্থতায় কেন? এ প্রশ্ন উঠল। সরকার যদি সরাসরি সেরাম থেকে টিকা কিনে আনতো, তাহলে টিকা প্রতি খরচ কমপক্ষে ৭৭ টাকা। সেটাও সেরামের বিপুল লাখ। কারণ সেরাম ইউরোপীয় দেশসমূহে যে দামে টিকা দিয়েছে, বাংলাদেশকে দিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে। কেন? কেন তখন বাংলাদেশ রাশিয়া বা চীনের টিকা প্রতিযোগিতামূলক দামে আনবার ব্যবস্থা করলো না। 

এখন বাংলাদেশের আম-ছালা দুইই গেছে। টিকা আর আসছে না। সেরাম বলেছে, ভারতেই টিকার ব্যাপক চাহিদার ফলে সেরাম তার প্রতিশ্রুত টিকা বাংলাদেশকে দিতে পারবে না। ভারত সরকার নিষেধ করে দিয়েছে। ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের খুব পীরিতÑ স্বামী-স্ত্রীর মতো  নাকি সম্পর্ক। তাহলে তারা আমাদের টিকা আটকাবে কেন? আটকে যে দেবেই এবং আটকে দিয়ে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে সেটা  জানাই ছিল। কারণ কোন ইস্যুতেই ভারত বাংলাদেশকে দেয়া কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। পদ্মার পানি দেয়নি, তিস্তার পানি দেয়নি, অভিন্ন নদীগুলোর পানির হিস্যা পাওয়া যায়নি। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। পিঁয়াজ রফতানি কোনো ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ করে দিয়েছে, চাল রফতানি বন্ধ করেছে, পচা চাল দিয়েছে। সেই ভারত সহজভাবে জীবন রক্ষাকারী সেরামের টিকা বাংলাদেশে আসতে দেবেÑ সেটা আশা করাই ছিল বোকামি। আমরা এখন সেই বোকামির ফাঁদে পড়েছি।

আমাদের হাতে এখন কোনো টিকা নেই। চীন বা রাশিয়া থেকে টিকা আমদানির চেষ্টা চলছে। সেখানেও আমলাতান্ত্রিক ফাঁদ পাতা হয়ে গেছে, যাতে টিকা সহজে আসতে না পারে। এখানেও কেউ পয়সা খেতে চায়। এদিকে নতুন করে টিকার নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ এখন করোনার মরণ থাবার মধ্যে বন্দী হয়ে পড়েছে। টিকাবিহীন কোটি কোটি মানুষের অবধারিত মৃত্যুর প্রতীক্ষা করা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছু করার আছে বলে মনে হয় না। এখন ফের সেই দীর্ঘসূত্রিতার কমিটি করা হয়েছে। তারা রাশিয়া নয় চীন- কোথায় প্রতিযোগিতা মূল্য সস্তা সেটা খুঁজে বের করে রিপোর্ট। সেসব রিপোর্ট পর্যালোচনা হবে। তারপর সিদ্ধান্ত হবে। তারপর চুক্তি। তারপর আসতে পারে চীন-রাশিয়ার টিকা। ততোদিনে অপঘাতে কত মানুষের মৃত্যু হবে সে কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এখন আপনারা প্রতিযোগিতা খুঁজছেন। তা হলে সেরামের টিকা আমদানির সময় প্রতিযোগিতা খোঁজেননি কেন? সেরাম থেকে টিকা আমদানি করতে বেক্সিমকো যে কোটি কোটি টাকা নানবান করেছে, তার একটা ভাগ নিশ্চয়ই এই আপনারা পেয়েছেন। তা না হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দামে তারা টিকা আনতে পারলেন না কেন? বেক্সিমকো বলছে, সরকার ভারত সরকারকে চাপ দিয়ে টিকা আনুক। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, চুক্তি হয়েছে বেক্সিমকোর আর সেরামের মধ্যে বেক্সিমকো টিকা নিয়ে আসুক। টিকা আসছে না। আসার কোনো লক্ষণও নেই। নানাবিধ চাপে সেরামের সিইউ পালিয়ে গেছেন লন্ডনে। কে কার চুক্তির খবর রাখবে। মানুষ মরবে বেক্সিমকো আর সরকার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবেন।

এখানে প্রতিরোধে দাঁড়াতে হবে জনগণকেই। তাদেরই প্রতিরোধ গড়ে তুলে এই রক্তচোষা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই বিষচক্র ভেঙে দিতে হবে। মানুষকে বাঁচতে হবে। বাঁচাতে হবে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ