রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

আগামী বাজেটের আকার ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াচ্ছে

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : আগামী ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এই বাজেটের মধ্যে মোট রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে তিন লাখ ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। যা জিডিপি’র ১১ দশমিক ২ শতাংশ। করোনার পর চাঙ্গা হয়ে উঠবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি-এমন ধারণা নিয়ে মোট রাজস্বের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকেই আয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ৩০ হাজার ৭৮ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।  এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ শতাংশের সমান। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, আগামী বাজেট হবে সম্প্রসারণমূলক। বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হবে জিডিপির ৬ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। সেই হিসাবে আগামী অর্থ বছরে বাজেট ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, যা হবে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
জানা গেছে, বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী ৩ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সরকার নতুন বাজেটের আকার ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ধরে এগোচ্ছে, যা শেষ মুহূর্তে কিছু বাড়তে-কমতে পারে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এদিকে করোনাভাইরাসের থাবায় গত বছরের মার্চ থেকেই বিপর্যস্ত হয়েছে অর্থনীতি। উৎপাদনের চাকা ঘোরেনি বহুদিন। নিম্ন আয়ের মানুষ জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। রপ্তানি আয় কমেছে। আমদানিও হ্রাস পেয়েছে। এক রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী আয় ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই হয়েছে নেতিবাচক। সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রা এক দফা কমিয়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ করা হয়। এখন আরেক দফায় তা কমিয়ে ৬ শতাংশের নিচে আনা হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। সূত্র বলছে, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে ধরা হচ্ছে। করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব মেনে নিয়ে প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণের উচ্চাভিলাষী পথে আর যাচ্ছে না সরকার। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১ শতাংশের বেশি কমানো হবে। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য থাকবে ৭ শতাংশের ঘরে।
আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ তাহলে কত হবে? চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ শতাংশের সমান। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, আগামী বাজেট হবে সম্প্রসারণমূলক। এতে ঘাটতি ধরা হবে জিডিপির ৬ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। সেই হিসাবে আগামী অর্থ বছরে বাজেট ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, যা হবে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। জানা গেছে, ঘাটতি অর্থায়নের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যাংকঋণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে, সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে নেওয়া হবে ২৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের চার মাস বাকি থাকতেই অবশ্য সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকার সম পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার আশা করছে অর্থ বিভাগ।
এদিকে বাজেটের আয়ের বড় অংশ আসে এনবিআরের মাধ্যমে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে এনবি আরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম আট মাস জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বাকি চার মাসে আদায় করতে হবে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। করোনাকালে লক্ষ্যমাত্রার কতটা রাজস্ব আহরণ সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। সেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এবার এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য বাড়ানো হচ্ছে, যার আকার হবে ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো।
বাজেট ব্যয়ের একটি বড় অংশ খরচ হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। আগামী বাজেটে এডিপির আকার ধরা হচ্ছে ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মতো, যা চলতি অর্থবছরের মূল বরাদ্দের চেয়ে ১২-১৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও আগামী অর্থবছরের জন্য এডিপির আকার প্রক্ষেপণ করা আছে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর জানান, বাজেট বাস্তবসম্মত করা উচিত। ভালো খবর যে গত অর্থবছরের প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে এবং চলতি অর্থবছরেরটিও কমিয়ে আনা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরেরটিও বাস্তবসম্মত করা হচ্ছে বলে শুনতে পাচ্ছি। বাজেট ঘাটতি ৭ থেকে ৮ শতাংশ করলেও কোনো অসুবিধা হবে না। মানুষের হাতে ভালো টাকা নেই বলে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা নেই-এটা একদিক থেকে ভালো খবর। তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে বিনিয়োগ কমে যাওয়া। এই চ্যালেঞ্জ সরকার কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটাই এখন বড় বিষয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন বাজেটের (প্রস্তাবিত) আয়-ব্যয়ের হিসাবে ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ১৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। আসন্ন বাজেটে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় অগ্রাধিকার খাতগুলোয় প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করাই হবে প্রধান অগ্রাধিকার। এজন্য স্বাস্থ্য, কৃষি, সমাজকল্যাণ, খাদ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ নজর দেয়া হবে।
কোভিড-১৯ মোকাবিলায় আগামী বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থাকছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আকারও বাড়ছে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি বাজেটের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। আর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৈঠকে। এজন্য এসএমই খাতে আরও অর্থায়ন করা হবে। এ ছাড়া আগামী বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি।
চলতি বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত দুই শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। গত বছরের জুন মাসে যখন চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয় তখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়া এবং দেশব্যাপী ‘কঠোর লকডাউন’-এর কারণে এখন মনে হচ্ছে এই প্রবৃদ্ধি কোনোভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। এই প্রবৃদ্ধির হার কাটছাঁট করে ৬ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা কিনা বাজেটে প্রক্ষেপিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে ২ দশমিক ১ শতাংশ কম।
বৈঠকে রাজস্ব আয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ সময় এনবি আরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, করোনার কারণে দেশে ব্যবসাবাণিজ্য গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাহত হচ্ছে। তাই রাজস্ব আদায়ও হচ্ছে না কাক্সিক্ষত হারে। এ বছরও আদায় ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছুঁয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বৈঠকে চলতি বছরে রাজস্ব আদায়ে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল আগামী অর্থবছরের জন্যও একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়।
এ দিকে বিগত কয়েক বছরের বাজেট ঘাটতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। মূল বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। ঘাটতি ছিল ৬৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
আগামী বাজেটে ৫টি খাতে বিশেষ জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। এগুলো হলো- স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা, শিক্ষা ও কৃষি। এ সময়ে ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক সহায়তার ব্যবহার বাড়ানো এবং ব্যাংক ঋণ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অর্থনীতিতে কিছু অস্বাভাবিক বিষয়ে রয়েছে। যেমন আমাদের নমিন্যাল জিডিপি ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। সেখানে জিপিডির অনুপাতে রাজস্ব আদায় সাড়ে ৮ শতাংশ। এটি অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে এখনো করোনায় প্রান্তিক মানুষকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সে বিষয়ে জোর দিতে হবে। বাজেটের মূল বিষয় হলো অর্থের জোগান। সেক্ষেত্রে ঘাটতি মোকাবিলায় দেশীয় উৎসের চেয়ে কীভাবে বিদেশি সহায়তা বাড়ানো যায়, সেদিকে জোর দেয়া উচিত। কারণ বিদেশি অনুদান পেলে তা ভালো। আর অনুদান না পেলে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়া হলেও সে ঋণের সুদের হার খুব কম। তিনি আরও বলেন, অর্থ পাচার রোধে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।
ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, চলতি অর্থবছরে ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তায় আনার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া নগদ সহায়তা দেওয়া হবে ৩৫ লাখ মানুষকে। কিন্তু সমস্যা হলো উদ্যোগ থাকলেও সহযোগিতা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে এখানে সংস্কার আনতে হবে। ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, সামাজিক নিরাপত্তায় জিডিপির ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া উচিত। আর স্বাস্থ্য খাতেও বরাদ্দ দিতে হবে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে মানবসম্পদের উন্নয়ন জরুরি। এজন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ