রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

ইতিকাফ এক অনুপম ইবাদত

ড. ফেরদৌস আলম ছিদ্দিকী: ইতিকাফ এক অনুপম ইবাদত। পৃথিবীর সকল ঝামেলা থেকে নিজেকে মুক্ত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এ ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিকাফকারী ব্যক্তির পুরো সময় ইবাদতের মধ্যে গণ্য হয়ে থাকে। এ সময় একজন প্রকৃত ইতিকাফকারী আল্লাহর ঘরে ইবাদতে মশগুল থাকার মাধ্যমে নিজের অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে থাকে। তিনি আল্লাহর ঘরের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার এক স্থায়ী অনুপ্রেরণা লাভ করেন। এ অনুপ্রেরণা তাকে যাবতীয় অপরাধ ও অপকর্ম থেকে নির্লিপ্ত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।

ইতিকাফ শব্দের অর্থ অবস্থান করা, কোন বস্তুর উপর স্থায়ীভাবে থাকা। ইতিকাফের সময় নিজের সত্তাকে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয় এবং নিজেকে মসজিদ থেকে বের হওয়া ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখা হয় বিধায় একে ইতিকাফ বলা হয়। পরিভাষায় ইতিকাফের নিয়তে পুরুষের ঐ মসজিদে অবস্থান করা যেখানে প্রতিদিন পাঁচবার জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করা হয় এবং মহিলার নিজ ঘরে সালাতের স্থানে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়। ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান পর্যায়ক্রমে মসজিদুল হারাম, মসজিদুন নববী এবং মসজিদুল আকসা। এরপর জুমুআর মসজিদ ও পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামায়াতের সাথে আদায় করা হয় এমন মসজিদ।

রমাদানের বিশ তারিখ আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্বে শেষ দশকের ইতিকাফের নিয়ত করে ইতিকাফকারী মসজিদে প্রবেশ করবে এবং শরয়ীভাবে ঈদের চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে ইতিকাফ শেষ করবে। শেষ দশদিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুআক্কাদায়ে কিফায়া। এলাকাবাসীর কোন একজন সেটি আদায় করলে সকলে দায়মুক্ত হবে। কেউ আদায় না করলে সকলেই সুন্নাত তরকের জন্য দায়ী হবে। মানতের ইতিকাফের জন্য সাওম রাখা শর্ত। এজন্য মানতের ইতিকাফ কমপক্ষে একদিন করতে হবে। কেননা একদিনের কম সময়ে সাওম সহীহ হয় না। এছাড়া নফল ইতিকাফের জন্য নির্ধারিত কোন সময় নেই এবং এর জন্য সাওম রাখাও শর্ত নয়। এক্ষেত্রে ইতিকাফ স্বল্প সময়ের জন্য হতে পারে। এমনকি মসজিদে না বসে মসজিদ অতিক্রম করার সময়ও নফল ইতিকাফের নিয়ত করলে সেটি সহীহ হবে। (ফাতাওয়া ও মাসাইল, ৪র্থ খ-)

ইতিকাফের গুরুত্ব অত্যধিক। এর গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে অঙ্গীকারাবদ্ধ করলাম যে,) তোমরা উভয়ে আমার (কাবা) গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।’ (সূরাহ বাকারাহ: ১২৫) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘আর মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় তোমরা স্ত্রীদের নিকট গমন কর না।’ (সূরাহ বাকারাহ: ১৮৭) বান্দাহ যখন নিজেকে ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে আটকিয়ে রাখে তখন সে অপরাধ থেকে বিরত থাকার সুযোগ লাভ করে এবং অসংখ্য সওয়াবের অধিকারী হয়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘সাঈদ ইব্ন জুবাইর আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইতিকাফকারী ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন, সে ইতিকাফ এবং মসজিদে আবদ্ধ থাকার কারণে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে এবং তার নেকীর হিসাব সব ধরনের নেক কাজ সম্পাদনকারী ব্যক্তির ন্যায় অব্যাহত থাকে। (ইব্ন মাজাহ) আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস রা. আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। প্রতিটি স্থানের দূরত্ব আসমান ও যমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের চেয়েও বেশি দূরবর্তী হবে।’ (আল মুজামুল আওসাত লিত তাবারানী)

ইতিকাফের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করা। রাসূলুল্লাহ সা. রমাদানের তৃতীয় দশক উপনীত হলে ইতিকাফের মাধ্যমে সারারাত জেগে ইবাদত করতেন। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা.বলেন, ‘উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. রমাদানের তৃতীয় দশক আগমন করলে সারারাত জেগে থাকতেন, নিজের পরিবার পরিজনকে ইবাদত বন্দেগীতে জাগিয়ে রাখতেন, কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং উম্মুল মুমিনীনগণ থেকে দূরে থাকতেন।’ (মুসলিম) আয়িশা রা. আরো বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা. রমাদানের তৃতীয় দশকে এমন পরিশ্রম করতেন, যে রকম কঠোর পরিশ্রম অন্য সময়ে করতেন না।’ (মুসলিম) আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা. প্রতি রমাদানে দশদিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু একবছর তিনি ইতিকাফ করেননি (সফরে ছিলেন), এজন্য পরবর্তী বছর বিশদিন ইতিকাফ করেছেন।’ (অবু দাউদ) আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ সা. তুর্কী তাবুতে রমাদানের প্রথম দশদিন ইতিকাফ করেছেন। এরপর দ্বিতীয় দশদিনও। এরপর তাবু থেকে মাথা বের করে বললেন, আমি এ (কদরের) রাতের অনুসন্ধানে প্রথম দশদিন ইতিকাফ করেছি। এরপর দ্বিতীয় দশদিনও। তার স্বপ্নে একজন ফেরেশতা এসে আমাকে বললেন যে এ রাতটি রমাদানের শেষ দশকে। কাজেই যে আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছে, সে যেন শেষ দশদিনও ইতিকাফ করে। আমাকে এ রাত দেখানো হয়েছিল এবং সেটি ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। (আমি স্বপ্নে) দেখেছি যে, এ রাতের সকালে ফজরের সালাতে আমি পানি ও কাদামাটিতে সিজদা করেছি। তোমরা এ রাতের অনুসন্ধান করবে শেষ দশদিনের বেজোড় রাতগুলোতে। বর্ণনাকারী বলেন, ছাদ থেকে ঐ রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, তখন মসজিদের ছাদ গাছের ডালা দ্বারা নির্মিত ছাপড়ার ন্যায় ছিল। এতে মসজিদের ছাদ থেকে পানি টপকিয়ে পড়েছিল। বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন, (রমাদানের) একুশ তারিখ সকালে রাসূলুল্লাহ সা. এর কপাল মুবারকে আমি স্বচক্ষে কাদামাটি চিহ্ন দেখেছি।’ (মিশকাতুল মাসাবীহ)

ইতিকাফকারীর জন্য শরয়ী প্রয়োজন এবং মানবীয় প্রয়োজন ব্যতীত ভিন্ন উদ্দেশ্যে মসজিদের বাইরে গমন শোভনীয় নয়। এতে ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। শরয়ী প্রয়োজন বলতে জুমুআর সালাত আদায় এবং মলমূত্র ত্যাগ করা ইত্যাদিকে বোঝানো হয়ে থাকে। মহিলাগণ ইতিকাফের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থেকে ঘরের অন্যত্র গেলে ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পর স্বল্প সময় মসজিদের বাইরে থাকলেও ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে। ইচ্ছাকৃকতভাবে বা ভুলবশতঃ বের হলেও এ হুকুম প্রযোজ্য হবে। ইতিকাফকারী যদি রোগীর শুশ্রুষা, জানাযার সালাত এবং ইলমের মজলিসে উপস্থিত হওয়ার শর্ত করে নেয়, তবে তার জন্য এ কাজগুলো করা সিদ্ধ। এছাড়া স্ত্রী সংগম বা এর আনুষংগিক কার্যাবলী যেমন, চুম্বন, স্পর্শ, আলিঙ্গন ইত্যাদি কাজসমূহ করা ইতিকাফ অবস্থায় হারাম। স্ত্রী সংগমে বীর্যপাত হোক বা না হোক ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। সেটি ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুলবশত হোক, দিনে হোক বা রাতে হোক সর্বাবস্থায় ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। আনুষংগিক কার্যাবলির ক্ষেত্রে বীর্যপাত হলে ইতিকাফ ভঙ্গ হবে, অন্যথায় ভঙ্গ হবে না। চিন্তা বা দৃষ্টি দেয়ার কারণে যদি বীর্যপাত হয় বা কারো স্বপ্নদোষ হয় তবে এর দ্বারা ইতিকাফ ভঙ্গ হবে না। (আলমগীরী, ১ম খ-) কেবল বেহুশ বা পাগল হওয়াতে ইতিকাফ ভঙ্গ হবে না। তবে এ অবস্থায় যদি একাধিক দিবস অতিবাহিত হয় তাহলে ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। (শামী ২য় খ-) ইতিকাফ অবস্থায় যদি কোন মহিলার মাসিক হয় তবে তার ইতিকাফ বাতিল হয়ে যাবে। ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে গেলে পরবর্তীতে সেটি যথানিয়মে কাযা করে নিতে হবে।

ইতিকাফ ইবাদতকে শাণিত করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কাজেই ইবাদত বিনষ্ট হয় এমন কোন কাজ ইতিকাফের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আবার একেবারে চুপচাপ বসে থাকাও কাক্সিক্ষত নয়। এ সময় বেশি বেশি কুরআন-হাদীস অধ্যয়ন করা, কুরআন-হাদীসের আলোচনা করা বা আলোচনায় অংশগ্রহণ করা এবং মাসআলা-মাসাইল অধ্যয়ন ও যিকিরের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করা উচিত। ইতিকাফকারী ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না। তবে প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে; কিন্তু সেগুলো মসজিদে প্রবেশ করাতে পারবে না। ইতিকাফ অবস্থায় অনর্থক কথাবার্তা পরিহার করা আবশ্যক। এছাড়া এসময় মুজুরি নিয়ে কোন কাজ করা মাকরূহ। 

রাসূলুল্লাহ সা. জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইতিকাফ করেছেন। নিজের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচ্ছন্ন করার প্রত্যাশা এবং লায়লাতুল কদরের মত মর্যাদাপূর্ণ রাতকে পাওয়ার পেরেশানী নিয়েই আমাদের ইতিকাফ করা উচিত। সামান্য কোন অজুহাত দেখিয়ে এ ধরনের তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত থেকে নিজেকে বিরত রাখা বাঞ্ছনীয় নয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যথাযথভাবে ইতিকাফ পরিপালনের মানসিকতা দান করুন। আমীন!!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ