সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

রহমত মাগফিরাত নাজাতের মাস মাহে রমযান

মিয়া হোসেন : পবিত্র রমযান মাসে মুসলমানদের জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিশেষ সুযোগ দিয়েছেন। এ মাসে যাতে করে মোমিন বান্দাগণ পাপ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে পারেন এ জন্য শয়তানদেরকে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং জান্নাতের দরজা খোলা রাখা হয়। রমযান মাসে একটি নফল ইবাদাত করলে একটি ফরজের সমমান সওয়াব পাওয়া যায়, আর একটি ফরজ আদায় করলে সত্তরটি ফরজের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। রমযানের এ সুযোগ সকলেরই গ্রহণ করা প্রয়োজন। রযমানের প্রথম দশদিন আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত রয়েছে। আজ রহমতের চতুর্থ দিন।
রমযান মাসে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেধে রাখা সম্পর্কে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন- রমযান মাসের প্রথম রাত্রি উপস্থিত হলেই শয়তান ও দুষ্টতম জ্বিনগুলোকে শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলা হয় এবং জাহান্নামের দুয়ারগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর এর একটি দরজাও খোলা হয় না এবং বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, অতঃপর এর একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষণাকারী ডেকে ডেকে বলতে থাকে “হে! কল্যাণের প্রত্যাশী, অগ্রসর হও এবং হে! খারাপের পোষণকারী! বিরত হও, পশ্চাদপসরণ কর। আর আল্লাহর জন্য দোযখ থেকে মুক্তি পাওয়া বহুলোক রয়েছে। এইভাবে (রমযানের) প্রত্যেক রাতেই করা হয়। (তিরমিযী)।
আবু হোরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সা.) এশরাদ করেছেন, (গুনাহ হতে বাঁচার জন্য) রোজা ঢাল স্বরূপ। সুতরাং রোজাদার অশ্লীল কথা বলবে না বা জাহেলি আচরণ করবে না। কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে উদ্যত হলে অথবা গালমন্দ করলে সে তাকে দুই বার বলবে, আমি রোজাদার। তিনি আরো বলেন, যার হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ! রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ মহান আল্লাহর নিকট কস্তুরীর সুগন্ধ হতেও অতি উৎকৃষ্ট। আল্লাহ বলেন, রোজাদার খাদ্য, পানীয় ও কামভাব পরিত্যাগ করে আমার উদ্দেশেই রোজা রাখে। সুতরাং আমি তাকে বিশেষভাবে রোজার পুরস্কার দান করবো। আর নেক কাজের পুরস্কার দশ গুণ পর্যন্ত দেয়া হবে। (ছহীহ বুখারী, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৩)
আবু হোরাইরা (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, রোজাদার যদি ভুল করে কিছু খায় বা পান করে, তা হলে সে (ইফতার না করে) রোজা পূর্ণ করবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাকে পানাহার করিয়েছেন। (বুখারী, ১/৩৩৫)
রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় কেউ কেউ ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেলেন অথবা পান করে ফেলেন অথবা ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হলে মনে করেন রোজা ভঙ্গ হয়ে গেছে। কিন্তু না, ইসলাম মুসলমানদের জন্য সহজভাবে ধর্মীয় বিধি বিধান পালনের সুযোগ করে দিয়েছে। মানুষের যাতে কষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিধি বিধান নির্ধারণ করেছেন। হাদীস শরীফে যে সকল কারণে রোজা ভঙ্গ না হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সে কারণগুলো হলো, রোজাদার ভুলক্রমে কিছু খেলে, পান করলে ও স্ত্রী সহবাস করলে। নিদ্রাবস্থায় যদি স্বপ্নদোষ হয়ে যায়। অথবা কামভাবে স্ত্রীর দিকে দৃষ্টি দেয়ার কারণে বীর্যপাত ঘটলে রোজা ভঙ্গ হবে না। মাথায় তৈল দিলে অথবা পিচকারী লাগলে রোজা নষ্ট হবে না। চোখে সুরমা লাগালে রোজা নষ্ট হয় না। নিজের স্ত্রীকে চুম্বন করায় যদি বীর্যপাত না হয় যদি কারো এ আত্মবিশ্বাস থাকে যে স্ত্রীকে চুম্বন করলে বীর্যপাত হবে না। তাহলে এ অবস্থায় রোজাদার ব্যক্তি স্ত্রীকে মহব্বতের চুম্বন দিতে কোন ক্ষতি নাই। যদি নিজের ওপর আস্থা না থাকে তাহলে স্ত্রীকে রোজা অবস্থায় চুম্বন দেয়া মাকরূহ। আর যদিও কারও স্বাভাবিক অবস্থায় বমি হয় তাতে রোজা নষ্ট হবে না।
সূরা বাকারায় উল্লেখ করা হয়েছে,-হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা কোনো ভুল করে বসি।’ -সূরা বাকারা : ২৮৬
অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা ভুলে যা কর, তাতে কোনো অপরাধ নেই। অবশ্য ইচ্ছাপূর্বক তোমাদের হৃদয় যা করছে তার ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু।’ -সূরা আহযাব : ৫
না জানার কারণে রোজা না ভাঙ্গার বিষয়টি ব্যাপক, হতে পারে সে শরিয়তের হুকুম সম্পর্কে অজ্ঞ। যেমন, সে ধারণা করে যে এ জিনিসটা রোজা ভাঙ্গবে না, ফলে তা করে বসে। অথবা কাজ করা অবস্থায় বা সময়ে সেটি তার অজানা ছিল। যেমন, সে ধারণা করে যে, ফজর বা সুবহে সাদিক এখনও উদিত হয়নি, ফলে সে পানাহার চালিয়ে যায় অথচ ফজর উদিত হয়ে গেছে। কিংবা সূর্য অস্তমিত হয়ে গেছে মনে করে খেয়ে ফেলল অথচ সূর্য তখনও অস্ত যায়নি। এসব কারণে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারণ সহিহ বোখারিতে হজরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.)-এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেন, আমরা নবী করিম (সা.)-এর যুগে ইফতার করেছিলাম এক মেঘলা দিনে তারপর সূর্য দেখা গিয়েছিল।
এখানে তিনি উল্লেখ করেননি যে, নবী (সা.) তাদেরকে রোজাটি কাজা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন; কারণ তাদের সময় অজানা ছিল।
যদি রোজা পালনকারী নিজ রোজার কথা ভুলে রোজা ভঙ্গকারী কোনো কাজ করে ফেলে তাহলে তার রোজা শুদ্ধ হবে, তাকে আর সেটা কাজা করতে হবে না। যেমনটি সূরা বাকারার আয়াতে গত হয়েছে। তাছাড়া হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে রোজা পালনকারী ভুলে পানাহার করল, সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে; কেননা আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন।
নবী (সা.) কর্তৃক রোজা পরিপূর্ণ করার নির্দেশ প্রদান সে রোজা সহিহ হওয়ার স্পষ্ট দলিল। আর ভুলে যাওয়া ব্যক্তির খাওয়ানো ও পান করানোর সম্পর্ক আল্লাহর দিকে করা প্রমাণ করে যে এর ওপর কোনো পাকড়াও বা জবাবদিহিতা নেই। কিন্তু যখনই স্মরণ হবে কিংবা কেউ স্মরণ করিয়ে দেবে তখনই: সেটা থেকে বিরত থাকবে এবং মুখে কিছু থাক লে তাও নিক্ষেপ করবে; কারণ এখন তার ওযর দূরীভূত হয়েছে।
রোজা ভঙ্গকারী নিজের পছন্দ ও ইচ্ছা অনুযায়ী যদি রোজা ভঙ্গকারী কিছু করে তবেই কেবল তার রোজা নষ্ট হবে। অন্যথায় যদি রোজা পালনকারীকে জোর-জবরদস্তি করে রোজা ভঙ্গ করানো হয় তবে তার রোজা বিশুদ্ধ হবে, তার আর সেটা কাজা করা লাগবে না। কারণ, আল্লাহতায়লা কুফুরির হুকুমকে সে ব্যক্তি থেকে উঠিয়ে নিয়েছেন যাকে কুফুরি করতে জোর করে বাধ্য করা হয়েছে, যখন তার অন্তর ঈমানের ওপর অটল থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, কেউ তার ঈমান আনার পর আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করলে এবং কুফরির জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার ওপর আপতিত হবে আল্লাহর গজব এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরির জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচলিত। -সূরা আন নাহল : ১০৬
সুতরাং যদি আল্লাহতায়ালা জোর-জবরদস্তি ও বাধ্য করার কারণে কুফরির হুকুমও তুলে দিয়েছেন তাহলে কুফরির চেয়ে ছোট অপরাধ তো উঠে যাবেই। অনুরূপভাবে রাসূল সা. বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং বাধ্য হয়ে করা বিষয় ক্ষমা করেছেন।
রোজা অবস্থায় যে সকল কাজ করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়, তবে এ ক্ষেত্রে শুধু কাযা রোজা আদায় করলেই হয় বলে হাদীসে উল্লেখ আছে, সে সব কাজগুলো হলো, কেহ মুখ ভরে বমি করলে। কোন বস্তু গিলে ফেললে। বীর্য বের করলে। নাকে, কানে ও মাথায় তরল ওষুধ লাগলে আর ঐ ওষুধ যদি পেট বা মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় তাহলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। ইহা ইমাম আবু হানিফার মত। সাহেবাইনের মতে- এতে রোজা ভঙ্গ হবে না। ইমাম আবু হনিফার মতের ওপর ফতোয়া। স্ত্রী লোক যদি তার গুপ্তাঙ্গে ওষুধ লাগায় তবে সর্বসম্মতিক্রমে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। কুলি করার সময় অনিচ্ছায় পানি পেটে গেলে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে মনে করে সূর্যাস্তের আগে ইফতার করলে। ভুলক্রমে কোন খাওয়া আরম্ভ করে রোজা ভঙ্গ হয়ে গেছে মনে করে আবার আহার করলে। দাঁত থেকে ছোলা পরিমাণ বস্তু বের করে খেয়ে ফেললে। জোরপূর্বক রোজাদারকে কিছু পানাহার করালে। এসব কারনে রোজাদারের রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর এ জন্য কাফফারা আদায় করার প্রয়োজন নেই। শুধু কাযা রোজা আদায় করলেই চলবে। তবে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা অবস্থায় পানাহার বা স্ত্রী সহবাস করে তাহলে শুধু কাযা আদায় করলে হবে না বরং কাফফারা আদায় করতে হবে।
রোজা দু’প্রকার ফরজ ও নফল। আবার ফরজ রোজা দুই প্রকার একটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্ক যুক্ত, যথা-রমযান মাসের রোজা ও মান্নতের রোযা। এ প্রকার রোজার নিয়ত রাতে করতে হয়। যদি ভুলে কেহ রাতে নিয়ত না করে তাহলে দ্বিপ্রহরের আগে নিয়ত করলেই চলবে। আর অপর প্রকার রোজা হলো, যা দায়িত্বে আসার কারণে পালন করতে হয়। যেমন-রমযান মাসের কাযা রোজা, সাধারণ মান্নতের রোজা ও কাফফারার রোজা। এ প্রকারের রোজার নিয়ত রাতে না করলে শুদ্ধ হবে না। সকল প্রকার রোজার নিয়ত দ্বিপ্রহরের পূর্বে করলে চলবে। রোজার নিয়তে সেহরি খেলেই নিয়ত করা হয়ে যায়। আলাদাভাবে মুখে নিয়ত পড়ার কোন প্রয়োজন নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ