শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

মায়াবী জোছনারাত’র উপাখ্যান 

তাজ ইসলাম :

কিছু কিছু ছবি আছে/ যার দিকে যুগ যুগ চেয়ে থাকা যায়/ কিছু কিছু কথা আছে/ অসংকোচে মনে গেঁথে যায়/.... এই যে কথিত ছবি এমন প্রাণময় করে তুলির আঁচড়ে যিনি অংকন করেন তিনি শিল্পী। আর কথা যার মনে গেঁথে যায় তিনিও শিল্পী। তিনি তুলির শিল্পী নন কলমের শিল্পী। কলমের খোঁচায় শব্দকে প্রাণ দেন। বিষয়কে চিত্রিত করেন। তারা সমাজে না দেখা বিষয়,উহ্য বিষয়,অবহেলিত বিষয় দেখে তাদের তৃতীয় চোখ খোলা রেখে। কিছু চোখের মতো কিছু মুখও আছে যারা বয়ান করেন বিষয়কে আকর্ষণীয় করে। তারাই সাবলীলভাবে বলতে পারেন “ কিছু কিছু লোক আছে / বিপরীতে হয়ে যায় লাভার আগুন/ আসুন সকলে মিলে / মনটাকে করে নিই প্রশান্ত ফাগুন।” ( প্রশান্ত ফাগুন) এই প্রশান্ত ফাগুনের আহবায়ক কবি রবিউল মাশরাফী। রবিউল মাশরাফী কবি ও সংবাদ পাঠক। জন্ম তার ১৯৬৭ সালের ১৭ জুলাই। বয়সের হিসাবে ৫৪ বছর। লেখালেখিতেও দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন। লিখেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। এক মলাটে বই আকারে এ বছর প্রকাশ হলো তার কবিতার বই “ মায়াবী জোছনারাত”। উপরে আলোচিত কবিতা বা কবিতাংশ তারই কবিতার বইয়ে গ্রন্থিত। এই বইয়ের প্রথম কবিতা “অন্তিমযাত্রা”। কবি শুরু করেছেন “চুলের গোছার মতো অন্ধকার নামে পৃথিবীতে /আঁধারের পাটাতনে অসহায় পড়ে আছি একা/ নোনাধরা পুরাতন ভবনের শেওলার মতন/এই অন্তরে আমার ছোপ ছোপ দাগ পড়ে আছে/” চিত্রকল্পময় পঙক্তি দিয়েই “মায়াবী জোছনারাত” শুরু। পাঠক মোহাবিষ্টের মতো তারপর পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে প্রবেশ করবে বইয়ের পেটে।

কবিতার কিছু পঙক্তি দিয়ে চিহ্নিত হয় কবির বিশ্বাস। উপলব্ধি করা যায় তার দর্শন। মানুষ নানা মত,নানা চিন্তা ও বিচিত্র বিশ্বাসকে ধারণ করে। পাঠক রবিউল মাশরাফীর কবিতা পাঠ করতে করতে ধারণা করতে পারে কবির পরকালীন আকাক্সক্ষার বিষয়। কবি লিখেন

“আমি বেহেশতে একটি বাড়ি কিনবো বলে/আমৃত্যু আত্মার সঙ্গে যুদ্ধ করে যাই/......... তোমার নৈকট্য লাভে যা কিছু করেছি/ তার বিনিময়ে দিও বেহেশতে বাড়ি।(বেহেশতের বাড়ি)”।

কবি হলেন একজন চিন্তক, নিজের দেশ, সমাজ নিয়ে একজন ভাবুক। তার কালকে উপস্থাপন করেন কবিতায়। নিজের দেশের কথা বলতে গিয়ে কবি রবিউল মাশরাফী লিখেন “বৃটিশ হটেছে, পাক শাসকেরা চলে গেছে কবে-/ তবুও ফোটে না এদেশের বুকে সুগন্ধি ফুল। ( বিপন্ন স্বাধীনতা)।”

দিনের দুরন্ত ঘোড়া,পাপের বিষ্ঠা,ক্ষোভের আগুন,জীবন লাটিম,স্মৃতির জমিন,আঁধারের পাটাতন,আঁধার গহবর, শোকবাতি, চাঁদের উনুন এ রকম কিছু শব্দকে শব্দের সাথে সেলাই করে কবি প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রেখেছেন শব্দের নতুনত্বের, চেষ্টা চালিয়েছেন চিত্রকল্পের আবহ তৈরী করতে। তার কিছু কাব্যপঙক্তি পাঠকের হৃদয়কে নাড়া দিবে বলে বিশ্বাস করি।

১. “মানুষ প্রবীণ হলে সাহস হারায়/ মনের গহিনে চায় অবলম্বী হতে/”

২. জীবনের অনিবার্য প্রয়োজন সেরে/ কেউ কেউ মধ্যরাতে ফিরে আসে বাড়ি”

৩. মেয়েরা রমণী হলে ভয় ভেঙে যায়”

৪. দুখেরা যেমন থাকে বরফের মতো

৫.নীল মার্বেলের মতো সুকোমল গোলাকার চোখ

৬ চুলের গোছার মতো অন্ধকার নামে পৃথিবীতে 

এই সব পঙক্তি কবি রবিউল মাশরাফীর কবিতায় অবিরাম প্রচেষ্টার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পাঠকের চিত্তকেও আকৃষ্ট করে অনায়াসে। কবি রবিউল মাশরাফী তার এই গ্রন্থে ছন্দের পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন পুরোপুরি। তিনি যদি কবিতার অন্যান্য উপাদানগুলোর বিষয়ে আরো সজাগ এবং সচেষ্ট হন তাহলে নিজেকে আরও অনেক উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবেন। 

এই বইয়ে কিছু কবিতা একেবারে সাদামাটা কাহিনী নির্ভর হয়ে গেছে। পরবর্তী বইয়ে এ ব্যপারে কবি সজাগ দৃষ্টি রাখলে তারই কল্যাণ। এ পর্বে আমরা গ্রন্থিত কবিতায় “বেফাঁস কথা” কবিতার নাম নিতে পারি। কবিতার বইয়ে ছড়া ও পদ্যকে অন্তর্ভুক্ত না করাই উত্তম।

“বিজয়” শিরোনামের লেখাটিকে পাঠক চোখ বুঝে ছড়া আর “পানকাহন” কে বোদ্ধা পাঠক পদ্য বললে তাদের দাবীকে অস্বীকার করা যাবে না। এই লেখাদ্বয় তাদের সেই স্বভাবই জাহির করে।

কবিরা ছন্দমাত্রা তাল লয় ঠিক রাখতে চেষ্টা করেন নিজের রচিত পঙক্তিতে। তবে বাক্য গঠনের নিয়মকে অগ্রাহ্য করলে দৃষ্টিকটু লাগে। ক্ষেত্রবিশেষে অর্থ বিভ্রাটও হয়। “আচ্ছা বাবা! হৃদয় কি তোর/আল্লাহ ভয়ে কাঁপে?” আল্লার ‘ র’ বাদ দেয়াতে মাত্রা ঠিক থাকলেও বাক্য গঠন যুৎসই মনে হয়নি। ছন্দে সজাগ কবির জন্য প্রয়োজন সবদিক খেয়াল রাখা। প্রয়োজনে বিকল্পের পথে হাঁটা। এবং যখন অন্তমিলকে প্রাধান্য দেয়া হবে তখন অন্তমিলের বৈচিত্রের চেষ্টা করলে ভালো লাগে। (কাঁপে-মনস্তাপে,) আবার (কাঁপে অনুতাপে) মিল কবির অমনোযোগিতা বা দুর্বলতাকে প্রকাশ করে।

“দেখিস বাবা তোর ঘরেও/ আছে প্রাণের ছেলে/ আমরা যদি পড়ি ঘরেও তাহলে মাত্রা বিভ্রাট ধরা পড়ে। আমরা কিন্তু ঘ রে ও পড়ব না। কেননা পড়ার গতি আর লেখার স্টাইল ঘরেও কেই নির্দিষ্ট করে। যদি লেখা থাকতো ঘরে ও তাহলে ভিন্ন কথা ছিল। রবিউল মাশরাফী যথেষ্ট ছন্দ সচেতন তবু আলাপটা তুললাম অন্যদেরও এতে উপকার হবে।”

বৈরী পরিবেশে অধিকাংশজন বন্ধ রাখে প্রতিবাদের ভাষা, চুপ থাকে বিবেক। হক কথা বলতে চাইলেও বলে না অনেকেই। কিন্ত কবি তার কলমে তুলে আনেন নিরেট সত্য  “ভেজালে ভেজালে ভরে গেছে দেশ.... বিভীষিকাময় মৃত্যু দেখেও বিবেক নড়ে না কারো” ( নালিশ) এতটুকু বলেই ক্ষ্যান্ত দেননি। তিনি তীব্রভাবে বলেন “অসৎ নেতাকে দল থেকে দিন ঘাড় ধরে বের করে” (ঐ) এভাবেই কবি তার মনের কথা বলে যান অবলীলায়। বয়সের বিজ্ঞতা কবি বা কথাসাহিত্যিক ছড়িয়ে দেন তার রচনায়। বয়স মানুষের বড় পাঠশালা। কবি রবিউল মাশরাফীর অনেক লেখায় তার ছাপ স্পষ্ট। জীবনের শিক্ষায় তিনি পোড় খেয়ে লিখেছেন অনেক কথা। কথারা কবিতা হয়ে স্থান পেয়েছে গ্রন্থে। আবার বয়সের ভারে কমে আসে মনের তেজ। কমে যায় সাহসের প্রাবল্য। চিন্তাতেও কপালের বলি রেখার মতো স্পষ্ট হয় বার্ধক্যের দুর্বলতা। কবি জীবনের গলিপথে হেঁটে হেঁটে যেখানে এসে থামেন সেখানে এসে স্মৃতির পাথরখন্ড বসে ভেবে দেখেন “জীবন সায়াহ্নে এসে এই শুধু মনে হয় খুব/ যা কিছু করেছি কাল আজ তার সবটুকু ভুল/ (জীবন সায়াহ্নে)।”

মায়াবী জোছনারাত বইয়ের নাম। নামের মতোই কবি হৃদয়ের মায়া ঢেলে কবিতার জোছনা ছড়িয়েছেন কবিতায়। কবিতাগুলো ছন্দময়। আছে ভাবনা আর বিজ্ঞতার ছাপ। কবি আরও লিখবেন তার পাঠকের জন্য।পাঠকের উদ্দেশ্যে কথা হল আপনারা বই কিনুন নিজের জন্য, বন্ধু- আত্মীয়কে উপহার দেয়ার জন্য।

 

মায়াবী জোছনারাত’র ৬৪ পৃষ্ঠার বইটির পাতায় পাতায় আছে সুন্দর অলংকরণের ছোঁয়া। “অন্তিম যাত্রা” থেকে “মছিলে যাবো না” পর্যন্ত সবকটি কবিতার গড়নে আছে ছন্দের সতর্ক অনুশাসন। বইটি প্রকাশ হয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০২১, প্রকাশক মো রবিউল হোসেন। প্রচ্ছদশিল্পী ফারিহা জাহান। বিনিময় রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা। ভালো কাগজের ঝকঝকে ছাপার বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ