শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 

সাজজাদ হোসাইন খান:

॥ চৌত্রিশ॥

অশোকতলার দুপুরটি ছিলো ঝিমধরা দুপুর। হরেক কিসিমের গাছগাছালিতে ছাওয়া পাড়াটি। ছায়া ছায়া পথঘাট। বাড়ি-ঘর। গাছের পাতার ফাঁক-ফোকর গলিয়ে ঝরতো রোদের কণা। ডালে ডালে নানান ধরনের পাখি। লাল নীল হলুদ বেগুনী পাখির ডাকাডাকি। হঠাৎ উড়াল। আমাদের বাসার এক কোণায় ছিলো একটি বড়ই গাছ। সেই বড়ই গাছতলায় অনেকগুলো দুপুরই কাটতো আমার। ফেরিওয়ালাদের আনাগোনা থাকতো আঙুলে গোনা। মাঝেমধ্যে আসতো সিনেমা ফেরিওয়ালা। ঢোল বাঁশী বাজাতো চার-পাঁচজন মিলে। পাড়ার ছোটরা এই সিনেমা ফেরিওয়ালাদের পেছন পেছন হইহল্লা করে ছুটতাম। ওরা উপরের দিকে ছুঁড়ে মারতো লাল নীল কাগজ। আমরা কাগজ ধরার জন্য লাফালাফি শুরু করতাম। সেসব কাগজে লেখা থাকতো ‘‘আসিতেছে আসিতেছে ‘পৃথিবী আমারে চায়’ লিবার্টি হলে।” কে কত কাগজ জোগাড় করতে পারলাম তা নিয়ে চলতো হৈচৈ, কথার ঝড়। অশোকতলার দুপুর পাতাঝরা নূপুরে যেন হাঁটতো, নাচতো। 

সকাল আটটা থেকে বারোটা পর্যন্ত স্কুল। স্কুলের মাঠ আর ক্লাসের টুল টেবিল এক অন্যরকম পরিবেশের মাঝখান দিয়ে কেটে যেতো সময়। ভুপাল স্যার ছিলেন আমাদের অংকের শিক্ষক। ধারাপাত পড়াতেন, অংক শিখাতেন। তিনি ছিলেন সবচে কম বয়সী শিক্ষক, রামচন্দ্র পাঠশালার। আর যারা ছিলেন অনেক বয়সের। পঞ্চাশ ষাটতো হবেই। তবে তারাও পড়াতেন অনেক মজা করে। সেই  মজাই ধরে রাখতো ক্লাসে। তারা আমাদের খুব আদর করতেন, ¯েœহ করতেন, খোঁজখবর নিতেন বাড়িঘরের। আমরাও মান্য করতাম স্যারদের। ভুপাল স্যার একদিন ক্লাসে পড়ানোর ফাঁকে বললেন তার সাথে নাকি চন্দ্রনাথের দেখা হয়েছিল কদিন আগে। আমরা তো আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। জানতে চাইলাম কোথায় কি ভাবে! ভুপাল স্যার জানালেন বলবো ক্লাসের পর। অংকটা শেষ করো তারপর। অংক আর মাথায় ঢুকছে না। কেবল চন্দ্রনাথ ঘুরপাক খাচ্ছে মগজে। অংক আর শেষ হতে চায় না। সময় যেন দাঁড়িয়ে আছে। এরিমধ্যে ঘণ্টা বাজালো দফতরি। টিফিনের অক্ত, হৈ হৈ রৈ রৈ করে সবই বেরিয়ে এলো। ভিতরে থাকলাম আমরা কজন। বিশেষ করে রহমান, উদয়ন আর আমি। মিনাও দাঁড়ালো ভুপাল স্যারের পাশ ঘেঁষে। স্যার বললেন তার সাথে চন্দ্রনাথের দেখা মিলেছে আগরতলায়। স্যার নাকি আগরতলায় গিয়েছিলেন গত সপ্তায়। তিন-চারদিন ছিলেন সেখানে। চন্দ্রনাথরা বেশি ভালো নেই আগরতলায়। একটি পুরানো দালানে থাকে পাঁচ সাতটি পরিবার। গাদাগাদি করে। চন্দ্রনাথ জানিয়েছে বেশ কষ্ট হয় ওদের সেখানে থাকতে। চেহারা স্বাস্থ্য নাকি মলিন। চন্দ্রনাথের দুঃখের কাহিনী শুনে মনের ভিতর কষ্টরা দৌড়ঝাঁপ করছে। রহমান-উদয়নেরও একই হালাত। তিনজনেই চোখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। 

পাঠশালার পাঠ প্রায় শেষের দিকে। স্যারদের ঘাম ঝরানো অবস্থা। আমরাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছি বইয়ের পাতায়। সময় যেনো দৌড়াচ্ছে খুব দ্রুত। কারণ বছর শেষের পরীক্ষার খবর ঝুলছে চোখের দরজায়। কোন্ পড়াটা বাদ পড়লো সে নিয়ে স্যারদের ব্যস্ততা, খোঁজাখুঁজি। বাসায় আব্বা আম্মার বিশেষ নজর। সকাল সন্ধ্যা কেবল পড়া আর লেখা। ধারাপাত মুখস্থের মহড়া। বছরের শেষ পরীক্ষা ভয়ের একটা কাঁপন ধরিয়ে দেয় বুঝি। ভয়েরা পথের মোড়ে মোড়ে অপেক্ষা করছে মনে হলো। আম্মা বললেন ভয় আবার কিসের। তোমার সবগুলো পরীক্ষার  ফলই তো ভালো। মনোযোগ দিয়ে পড়ো। সব ভয় পালিয়ে যাবে।  আমিও সাহসের হাত ধরে দাঁড়াতে চাইলাম। ভয় ঝেড়ে ঝুড়ে। তাইতো! আমার সবগুলো পরীক্ষার ফলাফলই ঝলমলে চাঁদের মতো। পরীক্ষা নিয়ে কিসের আবার ভয়। আমি মনে মনে হাসতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু হাসিটা গলার মাঝ বরাবর এসেই ধপাস করে বসে পড়লো। আব্বা বাসায় ফিরলেন অনেকটা দেরি করে। আসর পার হয়ে মাগরীব প্রায় ছঁই ছুঁই। চেহারায় রাজ্যের চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। শরীর খারাপ! আম্মা আর আমি একসাথেই প্রশ্ন করলাম। আব্বা মাথা এপাশ ওপাশ করলেন। তেমন কিছুই না জানালেন আব্বা। তাহলে! অফিসে কিছু ঘটেছে? আম্মা জানতে চাইলেন। 

অবশেষে খবরটি লাফিয়ে পড়লো বাতাসে। সে খবরের এক চোখে বেদনা অন্য চোখে আনন্দ। আব্বাকে নাকি বদলি করা হয়েছে ঢাকায়। ডাকবিভাগের এক বড় অফিসে। আগামী সপ্তায়ই সে অফিসে গিয়ে হাজিরা দিতে হবে। এমন খবর শুনে আঁৎকে উঠলাম, আমি আর আম্মা। বার্ষিক পরীক্ষার সপ্তা তিনেক দেরি। আব্বার কপালেও চিন্তার ভাঁজ। সমস্যার ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়লো মাথায় মগজে। আব্বাও ভাবনার দীঘিতে সাঁতার কাটছেন। 

তাহলে কি পরীক্ষা না দিয়েই কুমিল্লা ছাড়তে হবে? পেছনে পড়ে থাকবে অশোকতলার পাখি ডাকা দুপুর, রামচন্দ্র পাঠশালা? কান্নারা জমা হতে থাকলো চোখের পাতা বরাবর। এরি মধ্যে আব্বা পাঠ করে ফেলেছেন আমার মনের ধারাপাত। আম্মাও আমার মাথায় হাত রাখলেন। আব্বা চোখে চোখ রেখে বললেন, ভাবনার কি আছে। বদলির সাথে তোমার পরীক্ষাতো আর বদলি হয়ে যাচ্ছে না। তুমি পরীক্ষা দেবে ঠিকঠাকভাবে। আমরা তো এখনি কুমিল্লা ছেড়ে ছুড়ে যাচ্ছি না। তোমার পরীক্ষা শেষ হোক। তারপর সে ব্যাপারে চিন্তা করা যাবে। আব্বার এমন আশার বাণী আমার আর আম্মার চেহারায় যেনো উঁকি দিলো নতুন ভোর। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ