শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

এক রিকশাওয়ালার গল্প

সা’দ সাইফ : -গাড়িটা কি মামার নিজের?

-দিনশেষে মামার কত থাকে?

-এখানে কে কে থাকে মামার?

এমন ইত্যাকার প্রশ্ন করাটা তানভীরের নিত্যরুটিন। মেসের বাজার সদায় করা শেষে রিকশা করে ফেরার পথে  রিকশাওয়ালাকে এই গৎবাঁধা প্রশ্ন তানভীর না করে থাকতে পারে না। এই প্রশ্নগুলো করাকে সে দায়িত্ব মনে করে।

আজ শুক্রবার বলে বাজারে  ভিড়ভাট্টা যেন একটু বেশিই। সে সুযোগে বিক্রেতাদের দ্রব্যমূল্যের একটু বাড়তি দাম চাওয়া যেন রীতিমত উৎসবে পরিণত হয়েছে। কোন উপলক্ষ পাওয়ামাত্র দ্রব্যমূল্যের ছড়ি ওপরে উঠবেই। মিস হবে না।

মুদির বাজার শেষ করার পর মাছ এবং তরকারির বাজারে যেন আগুন। দাম শুনেই কেনাকাটা করার কথা ভুলে যাওয়ার জোগাড়। তারপরও বাজার তো করা লাগবে, নাহলে না খেয়ে মরতে হবে।

বাজার শেষ করার পর রিকশাওয়ালা মামাদের উৎসুক চাহনি থাকে তানভীরের দিকে। “মামা আসেন আসেন, কোথায় যাবেন”, এমন হাঁকডাক রিকশাওয়ালা মামাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এসে একটা প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করে।

রেলস্টেশনের পাশে বাজার হওয়ায় রিকশাওয়ালাদের আনাগোনা চোখে পড়ে বেশ। তাই বাজার করা শেষে রিকশা পেতে বেগ পেতে হয় না কোন বাজারকারীর।

তানভীর পেছন থেকে হাত ইশারা করে এক রিকশাওয়ালাকে ডাকল।

-‘ক্লাব মোড়ে যাবেন?’

-‘চলেন।’

-‘কত দিতে হবে?’

-‘যা ভাড়া তাই দিবেন।’

-‘আচ্ছা।’

চুক্তি শেষে রিকশায় ওঠে পড়ে তানভীর। রিকশাওয়ালা প্যাডেলে পা ঘোরাতে শুরু করে দিলো।

রিকশাওয়ালাকে কী বলে সম্বোধন করবে বুঝে উঠতে পারল না তানভীর। রিকশাওয়ালার বয়সটা কেন জানি তানভীরের মনে হল খুব বেশি হবে না। পরিশ্রমের কারণে চেহারাতে একধরনের পরিণতবোধের ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তানভীরের থেকে বড়জোর পাঁচ বছরের বড় হবে। মামা ডাকটা সমীচীন মনে হলো না তার কাছে।

তাই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জানতে চাইল,

-‘ভাইয়ের গ্রামের বাসা কোথায়?’

-‘কেশবপুর।’ 

-‘বাসায় কে কে আছে?'

-‘মা, বাবা আর ছোট ভাই।’

-‘যশোরে আছেন কত দিন থেকে?’

-‘এই দুই বছরের মতো।’

-‘রিকশা কি ভাড়ায় চালান?’

-‘জ্বি ভাই।’ 

-‘ভাড়া দেওয়ার পর নিজের কাছে কেমন থাকে?’

-‘আলহামদুলিল্লা, যা থাকে তাতে ভালোই চলে।’

-‘ভাই কি পড়ালেখা করেছেন?’

ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার মতো প্রশ্নটা করে বসে।

নিজেই বুঝে উঠতে পারে না প্রশ্নটা করা বোকামি হয়েছে কিনা। যেন মনের অজান্তেই বেরিয়ে গেছে কথাটা।

-গরীবের আর পড়ালেখারে ভাই! যেন নিয়তির ওপর দোষারোপ থেকেই কথাটা বেরিয়ে এল।    

সিক্স পর্যন্ত পড়েছিলাম। এর বেশি আর সুযোগ হয়নি। কথাগুলো বলেই গলার স্বরটা কেমন জানি ঠান্ডা হয়ে এল ছেলেটির।

স্বাভাবিক হয়ে আবার বলতে শুরু করল, সিক্সে পড়ার সময় আব্বা হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

আমাদের একখ- আবাদি জমি বন্ধক রেখে আব্বার চিকিৎসা করাতে লাগলাম।

একটা পর্যায়ে আব্বা প্যারালাইজড হয়ে গেল।

সংসারের দায়িত্ব আমার ওপর চলে এল।

পড়ালেখা করার আর সুযোগ কোথায় বলেন? খুব ইচ্ছে ছিল যে পড়ালেখা চালিয়ে যাব, কিন্তু পারিনি।  

এই রিকশা চালিয়েই বন্ধকী জমি ছাড়িয়েছি, ছোট ভাইটার পড়ালেখা করাচ্ছি। সংসার সামলাচ্ছি।  কথাগুলো যেন নীরবেই শুনছিল তানভীর।

ততক্ষণে চোখের কোণা থেকে কয়েকফোঁটা অশ্রু  তার পা ছুঁয়ে গেল।

ভাই, এই যে ভাই! ক্লাব মোড়ে এসে গেছি।

ছেলেটার জীবনের গল্প শুনতে শুনতে আনমনা হয়ে গেছিল তানভীর। কখন যে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেছে বুঝতেই পারেনি সে।

রিকশা থেকে নেমে ভাড়াটা দিতে দিতে তানভীর রিকশাওয়ালা ছেলেটাকে অনুরোধের সুরে বলল,

-‘ভাই, দুপুরে আমাদের মেসে থেকে যান না!’

-‘নারে ভাই, আপনি বলেছেন এতেই অনেক খুশি হয়েছি। সুযোগ হলে অন্য কোনদিন হবে, ইনশাআল্লাহ।’

এই বলে পুবদিকে রিকশাটা ঘুরিয়ে তার পথে পা বাড়াল। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তানভীর রিকশাটার দিকে। একসময় মিলিয়ে গেল দৃশ্যটা।...

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ