রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

করোনারোগী নিয়ে ছুটছে মানুষ হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে 

 

ইবরাহীম খলিল : করোনা এবং করোনার উপসর্গ নিয়ে ছুটছে মানুষ এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। গত কয়েকদিন ধরেই ঢাকার হাসপাতালে রোগী ভর্তি নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করে আসছে ভুক্তভোগীরা। এরমধ্যে যতই দিন যাচ্ছে অভিযোগ বাড়ছেই। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও করোনা ওয়ার্ডে দেখা গেছে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। অনেকেই রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে সিট খালি না পেয়ে ভিড় করছেন ঢাকা মেডিকেলে।  কিন্তু এখানেও সিট খালি নেই। স্বজনরা এমন রোগীদের নিয়ে চিকিৎসকদের পিছনে হন্যে হয়ে ছুটছেন।   

আশংকা প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই গতকাল বলেছেন, প্রতিদিন যেভাবে করোনা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে দেশে কোনো হাসপাতালেই রোগী রাখার জায়গা থাকবে না। তিনি বলেছেন, এটা একটা দুর্যোগময় পরিস্থিতি হচ্ছে। আমাদের বুঝতে হবে হাসপাতালের বেড বাড়িয়ে আমরা কিন্তু রোগী সংকুলন করতে পারব না। যদি রোগী যেখানে উৎপত্তি হচ্ছে সেই উৎপত্তিস্থলগুলো যদি বন্ধ না করি, তাহলে বাড়তেই থাকবে। 

এক মাস আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে হাসপাতালগুলোর ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ শয্যায় রোগী ভর্তি ছিল। বুধবার তা বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যেখানে আইসিইউর ২৫ দশমিক ২৬ শতাংশ শয্যা পূর্ণ ছিল, ৩১ মার্চ তা বেড়ে হয়েছে ৬৫ শতাংশ। এ অবস্থায় হাসপাতালে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুত জোরালো পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকালের আগের দিন বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, এর মধ্যে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনো আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল নাজমুল হক জানালেন, বিশাল চাপ এখন করোনা রোগীদের। কোনো বেড আমাদের ফাঁকা নেই। জেনারেল যারা মেডিসিনের কেইস নিয়ে আসছেন, তাদের নিতে পারছি না আমরা।আমাদের কোভিড সার্জারি ও গাইনির কিছু বেড ফাঁকা আছে। কোভিড মেডিসিনের কোনো বেড খালি নেই। ক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী নিয়ে আছি আমরা।

আগের তুলনায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি ক্রিটিক্যাল রোগী এখন চিকিৎসার জন্য আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, বয়স্করা হয়ত বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিল। কিন্তু অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়ায় তারাও ক্রিটিক্যাল রোগী হিসেবে আসছেন। এভাবে যদি চলতে থাকে, আমরা যদি লাগাম টেনে ধরতে না পারি, এটা কিন্তু দুই-তিন সপ্তাহ পরে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। মানুষের দুর্দশাও বাড়বে। একটা কঠিন সময় আসছে আমাদের জন্য।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে নাজমুল হক বলেন, দৈনিক ৫ হাজার রোগী শনাক্ত হলে তার মধ্যে ১ শতাংশ রোগীর অবস্থা গুরুতর হবে, তাদের জন্য আইসিইউ বা এইচডিইউ সুবিধা লাগবে- এটা আন্তর্জাতিকভাবে ধরে নেওয়া হয়। আজ যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, ১০দিন পর তাদের মধ্য থেকে ক্রিটিক্যাল রোগী আসতে থাকবে। তখন আমরা কোথায় জায়গা দেব? এই অবস্থা আমরাও এক মাস আগেও জানতাম না। পরিস্থিতি যে দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক খলিলুর রহমানও সে কথা বললেন। রোগীর খুবই চাপ, আমরা ঠাঁই দিতে পারছি না এমন একটা অবস্থা। বেডগুলো আজকে মোটামুটি পূর্ণ। দুই-একদিনের মধ্যে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট চালু হবে আমাদের এখানে। এখন সাধারণ বেড আছে ১৫০টা। আরও ৫০টা বেড আমরা শনিবারের মধ্যে চালু করব। নতুন রোগীদের অধিকাংশেরই অক্সিজেনের প্রয়োজন হচ্ছে জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, অক্সিজেনের রোগী ছাড়া আমরা ভর্তি নিচ্ছি না।

রোগীর চাপ বেড়েছে বেসরকারি হাসপাতালেও। এভারকেয়ার হাসপাতালের কর্মকর্তা ডা. আরিফ মাহমুদ জানালেন, কয়েক সপ্তাহ আগে হাসপাতালের কোভিড ইউনিট প্রায় ফাঁকা ছিল। ১৯ মার্চের পর থেকে রোগীর চাপ আবার বেড়ে গেছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সারাদেশে ৯ হাজার ৯১১টি সাধারণ শয্যার ৩ হাজার ৯৭২টি এবং ৫৭৮টি আইসিইউ শয্যার ৩৭৬টিতে রোগী ভর্তি আছে। রাজধানীতে রোগীর চাপ আরও বেশি। ঢাকার কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোর ৩ হাজার ৪৩৯টি সাধারণ শয্যার মধ্যে ২ হাজার ৭৯৩টিতে রোগী ভর্তি আছে। অর্থাৎ ৮১ শতাংশ শয্যা এখন ভর্তি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালোর ৮৯ শতাংশ এবং বেসরকারি হাসপাতালের ৫৯ শতাংশ শয্যায় এখন রোগী আছে। অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সরকারি হাসপাতালের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৩৫ দশমিক ০২ শতাংশ শয্যায় রোগী ভর্তি ছিল। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ