শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 

সাজজাদ হোসাইন খান:

॥ তেত্রিশ ॥

বাসায় ফিরে আম্মাকে জানালাম বাদুরতলা ভ্রমণের কাহিনী। আম্মা বকাঝকা করলেন, যদি কোনো অঘটন ঘটতো! আমি মাথা নিচু করে থাকলাম। আব্বাকে জানাবো কি জানাবো না এমন একটা ভাবনা উলটপালট খাচ্ছিল। ভাবনার গলিপথ কেবলি অন্ধকার। ভয় চোখের চারপাশটায় চক্কর খাচ্ছে বারবার। শেষে দাঁড়িয়েই থাকলাম ভয়ের বিশাল দীঘির কিনারায়। বেশ কদিন একঝাঁক বাদুর আমার মগজের ভিতর ডানা ঝাপটালো। রাতে আব্বাকে বললাম  বাদুরতলায় নাকি বাদুর থাকে। আমি বাদুরতলা যাবো, বাদুর দেখবো। আব্বা জবাবে জানালেন হ্যাঁ! যাবো এক সময়। সে সময় চলে এলো হুট করে। তোমার তো ধারাপাত বই আনতে হবে। বইও কেনা যাবে, সাথে বাদুরও দেখা হবে। সেদিন দেখেছিলাম বাদুরতলার পাশ ঘেঁষেই সারি সারি বইয়ের দোকান। আব্বা আসর নামজ শেষ করে বললেন চলো। আমি আগ থেকেই তৈরি ছিলাম। আমরা যখন পৌঁছালাম তখন সূর্য ডুবুডুবু। অন্ধকার আসি আসি করছে। প্রথম ধারাপাত বই কিনলাম। বইয়ের দোকানগুলোর বেশ কাহিল অবস্থা। একটু জোরে বাতাস বইলেই উড়তে থাকবে সব, তেমনটাই মনে হলো আমার। উডুক বা পডুক তাতে কি, আমি তো বাদুর দেখতে এসেছি। আব্বাকে তাকিদ দিলাম। যদিও বাদুরতলা হাতের কাছেই। আব্বা ইশারা করে দেখালেন ঐতো দেখছনা কতবড় বটগাছ। পাতার ফাঁকে ফাঁকে কত বাদুর। যতই অন্ধকার হবে ততই বাড়বে বাদুর। তখন বটগাছটাই ঢাকা পড়ে যাবে। বাদুর আর বাদুর মাথা নিচু করে ঝুলে আছে। ধীরে ধীরে নামছে সন্ধ্যা। বাদুরতলা কান্দিরপার আর বইয়ের দোকানগুলো আবছা আঁধারের তলায় ঢুকে যাচ্ছে। বটগাছের নিচে এসে দাঁড়ালাম আমি আর আব্বা। কোথা থেকে যেন উড়েউড়ে আসছে বাদুরের ঝাঁক। 

আব্বা বললেন চলো এবার বাড়ি ফেরা যাক। রিকসা ডাকলেন আব্বা। বাদুরতলা থেকে অশোকতলা। ভাড়া ঠিক হলো দুআনা। রিকসা আগে বাড়ছে, পেছনে বাদুরের অদ্ভুত আওয়াজ আর ওড়াউড়ি। অন্ধকার কালো থেকে কালো হচ্ছে ধীরে ধীরে। সড়কের বাতিগুলো জ্বলছে মিটমিট। দুপাশে দোকান, বাড়ি-ঘর। সেগুলোতেও জ্বলছে আলো। কানের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে ফুরফুরে বাতাস। কয়েকটি বাদুর উড়ে গেলো আমাদের রিকসার উপর দিয়ে হঠাৎ। রিকসাওয়ালা মাথা নিচু করে ফেললো। এ সময়টাতে নাকি বাদুরের ঝামেলা টামেলা বাড়তেই থাকে। রিকসাওয়ালা জানালো। কোনো কোনো সময় নাকি কামড়ে দেয় মানুষজনকে। তাই সাবধানে চলাফেরা করতে হয়। এসব শুনে আমার ভয় ভয় লাগছিল। রিকসায় যতসময় ছিলাম আব্বাকে জড়িয়ে বসে থাকলাম। রিকসা চলছে আলো আঁধারি পথ কেটে কেটে। আব্বা বললেন বাদুর আছে হরেক পদের। ছোট বাদুর বড় বাদুর। অন্ধকার জায়গা, স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় বাদুররা বসবাস করে। কোনো বাদুর স্তন্যপায়ী অর্থাৎ মায়ের দুধ খায়, ফলটল খায়। আবার কিছু বাদুর খায় পোকামাকড়। কদিন আগে আমাদের ঘরে যে চামচিকাটি ঢুকেছিল সেগুলোও কিন্তু বাদুরেরই জাতিগোষ্ঠি। মাগরিবের সময়টাতেই চামচিকারা ওড়াউড়ি করে। সারাদিন চুপ করে লুকিয়ে থাকে ভাঙ্গা কোনো বাড়ির খসেপড়া ইটের ফাঁক ফোকরে। 

সূর্যের চোখ ঘুমে ঢুলো ঢুলো করে তখন বাদুর তার চোখের পাতা একটু একটু করে মেলতে থাকে। আরে আসল কথাটাই তো বলা হয়নি, বাদুর কিন্তু দিনের আলোতে ঝাপসা দেখে। বলতে পারো দেখেই না। আব্বা আরো কি যেন বলতে চাইছিলেন এরি মধ্যে রিকসা আশোকতলায় পৌঁছে গেছে। রিকসার টুংটাং শব্দে আম্মা ঘরের কপাট খুললেন। 

 (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ