শুক্রবার ১৪ মে ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 

সাজজাদ হোসাইন খান:

॥ একত্রিশ ॥

মনের চোখ টলটল করছে। এই বুঝি কান্নারা দৌড়ে বেড়িয়ে আসবে। নাশতা ফাশতায় তেমন নজর বসলো না। অন্তর আকাশে বারবার গুত্তা খাচ্ছে চন্দ্রনাথ। আগড়তলার না দেখা পথঘাট। আমার এই আউল ঝাউল চেহারা আম্মার দৃষ্টি এড়ালো না। তাই জিজ্ঞেস করলেন কি শরীর খারাপ? না কারো সাথে ঝগরাঝাটি করেছ। আমি মাথা নিচু করে চা’তে চুমুক দিচ্ছি। আম্মার প্রশ্নগুলো কানের আশপাশ দিয়ে উড়ে গেলো। আমার কাহিল কাহিল ভাব দেখে আম্মা কিছুটা বেচইন হলেন। বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে ছিলেন আব্বা। আর পাশে রাখা পিতলের হুকায় গোলাপি রঙের নলটিতে ঠোঁট লাগিয়ে। আব্বার  শরীরটি ভালো যাচ্ছিল না। ফুটবলের ঝুট-ঝামেলায়। মনের স্বাস্থ্যও ম্যাজ ম্যাজ অবস্থায়। আম্মার  কথাবার্তায় আব্বা কিছুটা নড়েচড়ে বসলেন। তারপর জোরে জোরে দু’চারখানা টান বসালেন হুকার নলে। আমার দিকে চোখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে? আমি কিছু সময় চুপ থেকে বললাম আব্বা আগরতলা কোথায়? আমি আগরতলা যাব। কেন? আগরতলা তো অনেক দূরে। ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী। সেটি তো বর্তমানে হিন্দুস্থানের এলাকা। তুমি সেখানে গিয়ে কি করবে! চন্দ্রনাথরা নাকি আগরতলা চলে গেছে। আমাদের ক্লাসে পড়তো, সে আমার বন্ধু, আব্বাকে জানালাম। আমার কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন। আর আম্মাকে ডেকে বললেন দেখো তোমার ছেলের পাগলামি!  সে নাকি আগরতলা যাবে তার কোন বন্ধুকে খুঁজতে, আমার চোখে চোখ রেখে আব্বা বললেন তুমি কি ভাবছ অশোকতলা আর আগরতলা দুই ভাই, পাশাপাশি বসবাস। তা কিন্তু নয়। আগরতলা অনেক দূরে। ক’দিন আগেও কুমিল্লা আগরতলা একদেশই ছিল, এখন আলাদা। আমি চট করে বললাম আলাদা কেন? এখনো তো কুমিল্লার পাশে আমরা ত্রিপুরা লেখি! হ্যাঁ লেখাতো ঠিকই আছে। কারণ ত্রিপুরার একভাগ পড়েছে হিন্দুস্থানে, অন্যভাগ পূর্ব বাংলায় ,অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে। এক সময় ত্রিপুরা রাজ্যের সদর দপ্তর ছিলো এই কুমিল্লায়। অনেক আগে ত্রিপুরা অঞ্চলটি ছিলো একটি বিশাল রাজ্য। মোগল বাদশা লড়াই করে ত্রিপুরা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। তখন থেকে ত্রিপুরা হয় মোগলদের করদ রাজ্য।  ঠিকঠাক হয় ত্রিপুরার রাজা রাই রাজ্য দেখভাল করবেন। তবে মোগল বাদশাদের মান্যগণ্য করতে হবে। সাথে বছর বছর কর পাঠাতে হবে। সোনাদানা আর টাকাপয়সা খাঁজনা হিসাবে দিতে হবে। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর সময় এ অঞ্চলের কয়েকটি এলাকা একত্র করে তার নাম দিয়েছিলেন রওসনাবাদ পরগনা। সে অঞ্চলগুলো হলো হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনী। এই অঞ্চলের জমিদারি দিয়েছিলেন ত্রিপুরা রাজাদের। তখন থেকে ত্রিপুরার রাজারা হলেন রওসনাবাদ পরগনার জমিদার। যদিও তাদের রাজা উপাধি তারা বহাল রেখেছিলেন। সে উপাধিটি ছিল নামের শেষে মানিক্যবাহদুর। এখন পর্যন্ত ত্রিপুরায় মানিক্যবাহাদুররাই সিংহাসনে আছেন রাজা জমিদার যে নামেই ডাকা হোক। 

আমি আব্বার কথাগুলোর পিছন পিছন হাঁটছিলাম। আর অবাক অবাক দৃষ্টিতে আব্বার ঠোঁটের উঠানামার দিকে তাকিয়েছিলাম। 

(চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ