সোমবার ১৯ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

টাকার শেষ গন্তব্য জানার পর দুদকের ৫৬ মামলার চার্জশিট!

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : রাষ্ট্রায়াত্ব বেসিক ব্যাংকের তিন শাখা থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা কি শেষ পর্যন্ত ধামাচাপাই পড়ে যাবে? ব্যাংকিং খাতের নতুন নতুন আজব ঘটনার ভীড়ে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারীর ঘটনা আজ ভুলতে বসেছে সবাই? এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারীর ঘটনাগুলো অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় একমাত্র সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। তারা বলছে, লোপাটকৃত টাকার শেষ গন্তব্য জানার পরই দুদক সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো তদন্ত শেষ করবে এবং আদালতে চার্জশিট দেবে।
দুদকের কাজ কী? এ বিষয়ে ২০১৮ সালের ৩০ মে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট বিভাগ দুদকের ১০ তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করে ক্ষোভ, উষ্মা ও হতাশা প্রকাশ করেন। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিম সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ওই সময় প্রকৃত হোতাসহ দোষীদের আসামী করে তদন্ত শেষ করার নির্দেশনা দেন। কিন্তু এরপরও কেটে গেছে দুই বছর। সেই সময় বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলোচিত আবদুল হাই বাচ্চুকে পাঁচ দফা এবং বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বে থাকা পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, প্রকৃত রহস্য উন্মোচন ও হোতাদের পাকড়াও করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাঠে নামে সেই ২০১০ সালে। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তদন্তে পার হয়েছে ১০ বছর। অগ্রগতি বলতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতে ৫৬ মামলা দায়ের। তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের গ্যাড়াকলেও কেটে যায় পাঁচ বছর।
মাঝে কেলেঙ্কারির পেছনের কারিগরদের এড়িয়ে দুই মামলার চার্জশিট জমা হলেও অসম্পূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন হওয়ায় তা গ্রহণ করেননি আদালত। ফলে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ওই কাঁটা দুদকের গলায় আজ অবধি বিঁধেই রয়েছে।
যদিও ঋণের প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা পুনরুদ্ধারকে বরাবরই সাফল্য বলে দাবি করে রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। অথচ দুদকের প্রধান কাজ প্রকৃত অপরাধীদের সনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা। সেই অবস্থান থেকে এখনও বহু দূরে প্রতিষ্ঠানটি। কেবল আত্মসাৎ করা অর্থ পুনরুদ্ধার করাই প্রতিষ্ঠানটির কাজ হতে পারে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলা তদন্তের একপর্যায়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তথ্য মিলে বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির কিছু টাকা মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে। সে বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলআর) পাঠানো হলেও এখনও যথাযথ জবাব মেলেনি বলে জানা গেছে।
দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, বেসিক ব্যাংকের মামলার চার্জশিট অনুমোদন চেয়ে কর্মকর্তারা প্রতিবেদন দিয়েছিল। কিন্তু টাকার শেষ গন্তব্য বের করা না যাওয়ায় অনুমোদন দেয়া হয়নি। বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির কিছু টাকা মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে গেছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। তা খতিয়ে দেখতে কয়েকটি দেশে এমএলআর পাঠানো হয়েছে। ওই সব দেশ থেকে তথ্য পাওয়া গেলে মামলাগুলোর চার্জশিটের অনুমোদন দেওয়া হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটি ব্যাপকভাবে আলোচিত ঘটনা। তারপরও তদন্ত শেষ করতে দুদকের এত সময় কেন প্রয়োজন হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। এটা হতে পারে তাদের সামর্থ্যের ঘাটতি, আরেকটি হতে পারে সদিচ্ছার ঘাটতি। দুদকের যে আইনি কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য সেটা যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করে, তাহলে এ ধরনের কেলেঙ্কারি দ্রুতই নিষ্পত্তি সম্ভব।
বেসিক ব্যাংক ইস্যুতে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের সামনে দুদক চেয়ারম্যানকে বিব্রত হতেও দেখা গেছে। ২০১৯ সালের ১৩ মে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিয়ে বেরিয়ে আসার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে অনেকটা বিরক্তের সুরে তিনি বলেছিলেন, এই কথাটা গত কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি। বেসিক ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক... আর ব্যাংক নেই বাংলাদেশে? টাকা কোথায় গেল, তা যদি আমি কোর্টে না বলতে পারি তাহলে তো কোনো কেইসই না। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, ওই টাকা কোথায় গেল তা প্রমাণ করা।
২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ ওঠার পরপরই অনুসন্ধানে নামে দুদক। ঋণপত্র যাচাই না করে জামানত ছাড়া, জাল দলিলে ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণদানসহ নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে।
প্রায় পাঁচ বছর অনুসন্ধান শেষে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় ২০১৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর তিনদিনে টানা ৫৬টি মামলা হয়। রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও গুলশান থানায় এসব মামলায় আসামি করা হয় ১২০ জনকে। এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা ৮২ জন, ব্যাংকার ২৭ ও ভূমি জরিপকারী ১১ জন। অনিয়মের মাধ্যমে দুই হাজার ৬৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীর গুলশান শাখা থেকে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা, শান্তিনগর শাখা থেকে ৩৮৭ কোটি টাকা, প্রধান শাখা থেকে প্রায় ২৪৮ কোটি টাকা এবং দিলকুশা শাখা থেকে ১৩০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। অভিযোগের বাকি অংশের অনুসন্ধান এখনও চলমান। এছাড়া বেসিক ব্যাংকসংক্রান্ত বিষয়ে আরও পৃথক চারটি মামলা করে দুদক।
ব্যাংকার ও ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই একাধিক মামলায় আসামী হয়েছেন। এর মধ্যে ব্যাংকের প্রাক্তন এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) কাজী ফখরুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে ৪৮টি মামলায়। ডিএমডি ফজলুস সোবহান ৪৭টি, কনক কুমার পুরকায়স্থ ২৩টি, মো. সেলিম আটটি, বরখাস্ত হওয়া ডিএমডি এ মোনায়েম খান ৩৫টি মামলার আসামি। তবে কোনো মামলায় ব্যাংকের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুসহ পরিচালনাপর্ষদের কাউকে আসামী করা হয়নি। এ বিষয়ে দুদকের বরাবরই বক্তব্য ছিল, ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দালিলিকভাবে আব্দুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
মামলা দায়েরের বেশকিছুদিন পর ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের নিয়োগ করা নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে অনিয়মিত ঋণ মঞ্জুর, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে পরিচালনাপর্ষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা ছিল। এমনকি দুদকের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে গণমাধ্যমের সামনে নিজের ভুল স্বীকার করে বেসিক ব্যাংকের একসময়ের প্রতাপশালী চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু বলেছিলেন, ‘আমি যা করেছি সরল মনে করেছি। অনেকক্ষেত্রে ভুল করেছি। তবে সকল দায় আমার নয়। কারণ, বোর্ডের অনুমোদনের বাইরে আমি কিছু করিনি।’
জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য বাচ্চুকে ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয় সরকার। ২০১২ সালে তার নিয়োগ নবায়নও হয়। কিন্তু ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে ২০১৪ সালে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণের পর চাপের মুখে থাকা বাচ্চু পদত্যাগ করেন।
বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি মামলাগুলোর তদন্তের দায়িত্বে আছেন দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের দল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ