শুক্রবার ১৪ মে ২০২১
Online Edition

আপনি এখনও সংগ্রামে আছেন !

মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম : আপনি এখনও সংগ্রামে আছেন ! এই বলে সম্প্রতি বিষ্ময় প্রকাশ করলেন আমার এক প্রবাসী অগ্রজ সহকর্মী। ১৯৮১ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংগ্রামে সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগদান করার সময় আমি তাঁকে রিপোর্টার হিসেবে পেয়েছিলাম। এর আগে তিনি সংগ্রামের সংবাদদাতা ছিলেন, এরপর রিপোর্টার, চীফ রিপোর্টার, বিশেষ প্রতিনিধি ও বার্তা সম্পাদক হয়েছিলেন। এরপর সংগ্রাম ছেড়ে তিনি বাংলার বাণী ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় চাকরি করেছেন। কিছুকাল তিনি ঢাকা ডাইজেস্টের সম্পাদকও ছিলেন। দেশে-বিদেশে সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণও আছে তার। এখন দেশ ছেড়ে বিশ্ব রাজধানী সুদূর নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন এই গুণী সাংবাদিক। তবে তার স্থান বদল হলেও তিনি সাংবাদিকতা পেশায়ই আছেন এবং তার বেশ কতকগুলো জনপ্রিয় অনুবাদ গ্রন্থ আছে।

অনেক দিন হলো তার সঙ্গে দেখা নেই, কথা নেই। বছর দুয়েক আগে হঠাৎ একদিন তাকে ফেসবুকে পাওয়া গেল। কুশল বিনিময়কালে আমার একটানা এতো বছর সংগ্রামে থাকায় এভাবেই বিষ্ময় প্রকাশ করলেন তিনি। যার জীবনে এতো পরিবর্তন তার কাছে তো আমার অনেকটা স্থির পেশাজীবনের বিষয়টি বিষ্ময়ের মতো লাগবেই। যার সম্পর্কে এতো কথা বলছি, তিনি হলেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। খ্যাতিমান সাংবাদিক ও সুলেখক। এখনও তার লেখা পড়ে মুগ্ধ হই।

দৈনিক সংগ্রামে আমার মতো অনেকেই দীর্ঘকাল ধরে আছেন। সামনের লোকেরা না সরা এবং পদ বিলুপ্তির কারণে পদোন্নতির তেমন সুযোগ হয়নি। এখন থেকে প্রায় দেড় দশক আগে অনেক পত্রিকায় চাকরি করে সংগ্রামে এসে সহকর্মী হয়েছেন এক সংবাদকর্মী। তার ভাষায় এক পত্রিকায় একটানা অনেকদিন কাজ করার কারণে আমার নাকি কোনো অভিজ্ঞতাই হয়নি। কথাট শুনে অবাক হলাম। তাহলে দীর্ঘ সিকি শতক ধরে আমি যা করলাম তা সব বৃথা! তার এই যুক্তি আমার কাছে গ্রাহ্য হয়নি। কেননা, সংগ্রামে এতদিন যা কাজকর্ম করেছি সবই সমাদৃত হয়েছে। এখানকার কাজের লাইন-লেংথ আমি অন্তত তার চেয়ে ভালো বুঝি। তাছাড়া, এখানে কাজ করতে এসে আমাকে মিথ্যা সংবাদ ছাপতে হয়নি, হলুদ সাংবাদিকতাও করতে হয়নি। 

যাই হোক, দৈনিক সংগ্রাম গত ১৭ই জানুয়ারি তার ৪৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অতিক্রম করেছে। আর এরই মধ্যে দৈনিক সংগ্রামে আমার পেশাগত জীবনের চল্লিশ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই চল্লিশ বছরে স্মৃতিতে জমা হয়েছে অনেক কাহিনী, অনেক ঘটনা। কিন্তু সেগুলো বাঙময় করে তোলার সময়, সুযোগ ও সামর্থ আমার না থাকায় আমি এখানে সামান্য কয়েকটি বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করবো। একজন মানুষের জীবনে চল্লিশ বছর সময় একেবারে কম নয়। এই সময়ের মধ্যে আমার সমবয়সী সহপাঠীরা, যারা সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন তারা অবসরে গেছেন, সহকর্মীদের মধ্যে অনেকে পত্রিকা ছেড়েছেন, বিদেশ-বিভূয়ে চলে গেছেন এবং অনেকে ইহলোকের পাঠ চুকিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। 

“দোস্ত ঠিক আছো তো ? বেতন-কড়ি কি সময় মতো পাচ্ছ ? তুমি সংগ্রামে আছো, তাই তোমাকে নিয়ে আমরা চিন্তায় থাকি।” এটা সংগ্রামে হামলা পরবর্তী ফোনকলে আমার এক বন্ধুর উদ্বিগ্ন উক্তি। দৈনিক সংগ্রামে চাকরি করার সুবাদে বন্ধুদের কাছ থেকে আমি হরহামেশাই এরকম টেলিফোন পাই। বিরোধীদলীয় পত্রিকা হওয়ার কারণে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সংগ্রাম অফিসে মাঝেমধ্যেই হামলা হয়। কখনো বস্তির ছেলেদের দিয়ে এখানে হামলা করানো হয়, আর পুলিশ পিছন থেকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। আর সেই কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁঝের মধ্যে আমরা যারা অফিসে কাজ করতে থাকি তখন তাদের প্রাণ হয় ওষ্ঠাগত। 

একদিন এমনও ঘটলো রাত দশটার দিকে রমনা থানা থেকে একদল পুলিশ একটি পিকআপ নিয়ে এলো সংগ্রাম অফিসের গেটে। এরপর তারা পত্রিকার অফিসে ঢুকে বার্তা সম্পাদক, প্রডাকশন ম্যানেজার, টেলিফোন অপারেটরসহ ছয় জনকে তুলে নিয়ে গেল। এদের নিয়ে যাওয়ার আগে তারা বলেছিল ওসি সাহেব আপনাদের সাথে একটু আলাপ করতে চান। আলাপ-আলোচনার পর আপনারা শীঘ্রই চলে আসতে পারবেন। থানায় নিয়ে তাদের কয়েকজনকে প্রহার করা হয়। এতে বার্তা সম্পাদক সাদাত হোসেনের কয়েকটি আঙ্গুল ভেঙ্গে যায়। অনেক দেনদরবারের পর শেষ রাতে তারা ছাড়া পান। আমি কাজ শেষে অফিস ছাড়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে এই ঘটনা ঘটে। পত্রিকায় এই ঘটনা ছাপা হওয়ার পর আমি এরকম অনেক টেলিফোন পেয়েছিলাম।

সংগ্রাম অফিসে সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় ন্যাক্কারজনক হামলা হয় ২০২০ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি। এবার হামলাকারীরা এলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামে। সঙ্গে এলো পুলিশ এবং তারা ভেতরে না ঢুকে গেটের বাইরে অপেক্ষায় রইল। হামলাকারীরা মরহুম আব্দুল কাদের মোল্লাকে কেন ‘শহীদ’ লেখা হলো এর প্রতিবাদে সংগ্রাম অফিস ঘেরাও করার ঘোষণা দিয়ে এসেছিল। তারা মাগরিব নামাজের সময় অফিসের সামনে উত্তেজনাকর বক্তৃতাবাজি করলো। এরপর তারা অফিসে ঢুকে বিনা বাধায় কম্পিউটার, টেলিভিশন, কাঁচ, আসবাবপত্র ভাংচুর করলো এবং সবশেষে সম্পাদক সাহেবের রুমে ঢুকে সবকিছু ভাংচুর ও তচনচ করে সম্পাদক সাহেবকে তুলে নিয়ে অপেক্ষমান পুলিশের হাতে সোপর্দ করলো। 

এই ঘটনায় দৈনিক সংগ্রাম মামলা দিতে গেলে পুলিশ নেয়নি। উল্টো পুলিশ সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদকের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা নিয়েছে। সম্পাদক সাহেব এই মামলায় বছর খানেক জেল খাটলেন আর বার্তা সম্পাদক সাদাত হোসেন ও প্রধান প্রতিবেদক রুহুল আমিন গাজী এখনও কারাগারে।

বলা বাহুল্য, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দৈনিক সংগ্রামের ওপর দুর্যোগ নেমে আসে। সেক্ষেত্রে সংগ্রামের সাংবাদিক কর্মচারীরা যেমন হামলা ভাংচুরের আতংকে থাকে তেমনি পত্রিকার আয় কমে যায় এবং সাংবাদিক কর্মচারীরা অভাব অনটনের মধ্যে পড়ে যায়। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ শাসনামল। এই সময় সংগ্রামে বেতন বকেয়া পড়ে প্রায় ১১ মাস। তখন সংগ্রামে বেতন হতো দেড়-দুই মাস পরপর। ফলে নিদারুণ অনটনের মধ্যে দিন কাটতে থাকে। এদিক সেদিক অতিরিক্ত কাজ করেও পরিস্থিতি শামাল দেয়া যাচ্ছিল না। এমন সময় অনুজ সহকর্মী শেখ এম এ মোমেন একটি বই অনুবাদের কাজ নিয়ে এলেন। এই কাজটি করেই সেযাত্রা আর্থিক টানাপোড়েন থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম।

সংগ্রামে আমার কর্মজীবনের ওপর ইতি টানতে গেলে বলতে হবে এখানকার গোটা কর্মজীবনই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কেটেছে। এখানে একসময় বেতন বোর্ড রোয়েদাদ পুরোপুরি কার্যকর ছিল। আবার কখনোবা আংশিক কার্যকর ছিল।  বর্তমানে আমার মতো অনেকেই এক অমর্যাদাকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। চাকরি চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় বেতনের পরিমাণ এমনভাবেই ধার্য করা হয়েছে যে আমরা অধিকতর উঁচু পদে কাজ করেও অধিকতর নিচু পদের একজন নিয়মিত চাকুরের তুলনায় কম বেতন পাচ্ছি। যা অনেকের কাছেই মর্মপীড়ার কারণ। 

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আওয়ামী লীগের এবারের দীর্ঘ শাসনামলে সংগ্রামের আর্থিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। আমরা অনেকেই নিয়মিত চাকরি হারিয়ে চুক্তিভিত্তিক কাজের মধ্যে পড়েছি। বেতন পুরো থেকে অর্ধেকে এবং অর্ধেক থেকে সিকিতে এসে ঠেকেছে। সংগ্রামে শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে যে মাইনেই কর্মজীবন শুরু করেছিলাম, এখন শেষের দিকে এসে আবার যেন সেই একা চলার মতো টাকা পাচ্ছি। তাহলে এতদিনে যে সংসার গড়ে উঠেছে, পরিবারের জনসংখ্যা এক থেকে ছয় জন হয়েছে তাদের চলার উপায় কি ? না, এখন এনিয়ে আমার চিন্তা নেই। দুই ইঞ্জিনিয়ার পুত্র চাঁদা দিচ্ছে। তাদের উপার্জনেই সংসার তরি এগিয়ে চলেছে। আর আমি হাল ধরে বসে আছি। তবে সংগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাই কিন্তু আমার মতো নিরাপদ অবস্থানে নেই। অনেকেই কষ্টে আছে।

এখন গিন্নি বলে, আয়-ইনকামের জন্য আর ছুটিছুটি করতে হবে না। সংগ্রাম যদি বেতন নাও দেয় তবুও অফিসে যাতায়াত করতে থাকো। তোমার শুধু এই ভূবনটুকু বেঁচে থাক, আর সব গোটাও। পৈতৃক জমি যার ব্যবহার নেই বেচে এনে ঢাকায় ফ্লাট কেনো। আমরা বাকী জীবনটা সুখে-শান্তিতে কাটিয়ে যাই।       

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ