ঢাকা, বৃহম্পতিবার 22 April 2021, ৯ বৈশাখ ১৪২৮, ৯ রমযান ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

মেটাবলিজম

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: 

মেটাবলিজম হল আপনার দেহের ক্যালোরি পোড়ানোর প্রক্রিয়া। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে খাবারের মধ্যে থাকা উপাদান শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। মেটাবলিজম বা বিপাক একটি মেডিকেল পরিভাষা, যা সম্মিলিতভাবে আপনার শরীরের সমস্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে বুঝায়। আপনার মেটাবলিজম যত দ্রুত বা গতিশীল হবে, আপনার শরীর তত বেশি ক্যালরি হজম বা বার্ন করে শক্তি অর্জন করার উপযোগি হবে। অর্থাৎ, আমাদের শরীরের যন্ত্রগুলিকে চালু রাখতে প্রতিদিন যে প্রক্রিয়ার সাহায্যে শক্তি তৈরি এবং ব্যয় হয় তাই হল মেটাবলিজম। আর শরীরকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন, তাই হল আমাদের মেটাবলিজম এর হার। তবে মেটাবলিজমের মাত্রা কতোটা হবে তা বয়স, শরীরের ওজন ও জিনের উপরে নির্ভর করে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেটাবলিজমের মাধ্যমে ক্যালোরি বার্ন হয়। মেটাবলিজম বেশি হলে বেশি ক্যালোরি বার্ন হয়, খাদ্য দ্রুত হজম হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং শরীরে মেদ বা চর্বি জমতে পারে না। আরো সহজ করে বললে, মেটাবলিজম ভাল হলে শরীরে মেদ বা চর্বি কমে কিন্তু শক্তি বৃদ্ধি পায়। আর মেটাবলিজম কম হলে কম শক্তি উৎপাদিত হয় এবং শরীরে মেদ জমা হতে থাকে। যাদের মেটাবলিজম শক্তি কম তারা যতই কম খাওয়াদাওয়া করুক না কেন, তাদের ওজন বাড়তে থাকবে।

যাদের শরীরে পেশির পরিমাণ বেশি আর মেদ কম, মেদবহুল মোটা গড়নের ব্যক্তিদের তুলনায় তাদের মেটাবলিজম অনেক বেশি। কারণ, ফ্যাটের চেয়ে পেশিগুলিকে সচল রাখতে অনেক বেশি শক্তি ব্যয় হয়। আমরা আমাদের খাবারের মাধ্যমে যে পরিমাণ শক্তি পেলাম, যদি আমাদের শরীরযন্ত্রকে চালু রাখতে তার চেয়ে কম শক্তি খরচ হয়, তাহলে এই বাড়তি শক্তি মেদ বা চর্বি হয়ে শরীরের ভেতরে বাইরে নানা জায়গায় জমতে থাকে। আর যদি যতটা শক্তি পেলাম সারাদিনে তার চেয়ে বেশি শক্তি খরচ হয় তাহলে শরীরের ভিতরে জমে থাকা মেদ ঝরে যেতে থাকে। কারণ, শরীর ধীরে ধীরে জমে থাকা বাড়তি মেদ বা ফ্যাট থেকে এই শক্তি জোগাড় করে নেয়।

বিশ্রামে থাকলে কম শক্তি ব্যয় হয়। আর ব্যায়াম বা পরিশ্রমের কাজ করলে  বেশি শক্তি ব্যয় হয়। এ কারণে বলা হয়, শরীরচর্চা করলে মেটাবলিজম প্রক্রিয়া অনেক উন্নত হয়, শরীরের বাড়তি ওজনও ঝরে যায় ও শরীর সুস্থ থাকে।

মেটাবলিজমের কারণে প্রাণিদেহ টিকে থাকে ও বেড়ে ওঠে। দেহের গঠন ঠিক থাকে, পুনরুৎপাদনে সক্ষম হয় এবং পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। বয়স ও লিঙ্গভেদে মেটাবলিজমের হার ভিন্ন হয়। এমনকি ওজনও মেটাবলিজমের হার ঠিক করে দেয়।  স্বাস্থ্যকর মেটাবলিজম যথাযথ পুষ্টির ওপর নির্ভর করে।

মেটাবলিজমের প্রধান তিনটা উদ্দেশ্য হলো:

১. খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা। 

২. প্রোটিন, লিপিড, নিউক্লিক এসিড ও কিছু শর্করা ধরনের খাদ্যকে দেহ গঠনের ব্লকে পরিবর্তিত করা; এবং

৩. দেহ থেকে নাইট্রোজেন ধরনের উপাদানকে বর্জ্য হিসাবে অপসারিত করা।

 

মেটাবলিক রেট বা বিপাকিয় হার

মেটাবলিজম হল আপনার কেমিকেল ইঞ্জিন যা আপনাকে জীবন্ত রাখে। মেটাবলিজমের গতি একেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। যাদের মেটাবলিজমের গতি কম  তাদের শেষ ভাগের জ্বালানি (ক্যালরি) চর্বি হিসেবে শরীরে জমা হতে থাকে। অন্যদিকে, যাদের মেটাবলিজম গতি বেশি, তারা বেশি পরিমাণ ক্যালরি বার্ন করতে পারে এবং তাদের শরীরে চর্বি জমার সম্ভাবনা কম থাকে। এই কারণেই কিছু মানুষকে দেখা যায়, যারা প্রচুর খাদ্য গ্রহন করতে পারে, অথচ তাদের শরীরে কোন চর্বি জমা হয় না। অন্যদিকে কম খাওয়ার পরও অনেককে মোটা হতে দেখা যায়।

মেটাবলিজমের গতিই সাধারণভাবে মেটাবলিক রেট হিসেবে পরিচিত। এটি হল একটি নির্দিষ্ট সময়ে আপনি কতটা ক্যালরি বার্ন করতে পারেন তার পরিমাণ। এটি ক্যালরি খরচ নামেও পরিচিত। তবে মেটাবলিজমের মাত্রা কতোটা হবে তা বয়স, শরীরের ওজন ও জিনের উপরে নির্ভর করে।

মেটাবলিক রেটকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:

ব্যাসাল মেটাবলিক রেট মৌলিক বিপাকিয় হার: আপনি যখন ঘুমিয়ে থাকেন বা গভীর বিশ্রামে থাকেন এটি হল তখনকার মেটাবলিক রেট। এটা ঠিক করে আপনার শরীরের ম্যাক্সিমাম ক্যালরি খরচের জন্য কত মিনিমাম শক্তির দরকার হবে। এই রেট অনুযায়ী বেঁচে থাকার জন্য আপনি প্রতিদিন দেহের ৪০ থেকে ৭০ পার্সেন্ট শক্তি খরচ করেন। এটি হল মিনিমাম বা সর্বনিম্ন মেটাবলিক রেট, যা আপনার শরীর উষ্ণ রাখা, লাঙ্স ব্রিথিং, হার্ট পাম্পিং এবং ব্রেইন সচল রাখার জন্য একান্তভাবে প্রয়োজন। মেটাবলিজমের এই হার আপনার জীবন যাপনের ধরনের ওপরও নির্ভর করে; আপনি কতটা সক্রিয় তার ওপর। কেউ যদি বলে আপনার মেটাবলিজম কম - এর অর্থ হচ্ছে আপনার বিএমআর কম।

বিশ্রামের বিপাকীয় হার বা জবংঃরহম সবঃধনড়ষরপ ৎধঃব (জগজ): এটিও বিশ্রামে থাকাকালীন সর্বনিম্ন বিপাকীয় হার, যা আপনার  বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন হার। এতে মোট ক্যালরির ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ  খরচ ধরা হয়।

খাদ্যে তাপীয় প্রভাব বা ঞযবৎসরপ বভভবপঃ ড়ভ ভড়ড়ফ  (ঞঊঋ): শরীরে খাদ্য পরিপাক এবং প্রক্রিয়াকরণের সময় ক্যালোরি বার্নের পরিমাণ বের করাই হল খাদ্যে থার্মিক বা তাপীয় প্রভাব।

থার্মিক ইফেক্ট অব এক্সারসাইজ (ঞঊঊ) : শরীর চর্চার সময় ক্যালরি পোড়ানোর পরিমাণ নির্ণয়।

শরীর চর্চা বহির্ভুত শারীরিক কার্যকলাপ বা ঘড়হ-বীবৎপরংব ধপঃরারঃু ঃযবৎসড়মবহবংরং (ঘঊঅঞ) : শরীরচর্চা ব্যতিত অন্যান্য শারীরিক কার্যকলাপের দ্বারা কতটুকু ক্যালরি বার্ন হয় তা নিরূপন এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে চঞ্চলতা, অস্থিরতা, অঙ্গভঙ্গির পরিবর্তন, দাঁড়ানো এবং হাঁটা-চলাও রয়েছে।

সারাংশ: মেটাবলিক রেট বা বিপাকীয় হার শরীরের ক্যালোরি খরচের হিসাব নামে পরিচিত। এটা হল একটি নির্দিষ্ট সময়ে শরীরের ক্যালোরি পোড়ানোর সংখ্যা বা পরিমাণ।

 

যেসব বিষয় মেটাবলিজম নির্ধারণ করে

 

বেশ কিছু বিষয় আপনার মেটাবলিক রেটকে প্রভাবিত করে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করছি:

বয়স: বয়স খুব গুরুত্বপূর্ণ। বয়স যত বাড়তে থাকে মেটাবলিজমের হার তত কমতে থাকে। ৪০ বছর বয়সের পরে প্রতি ১০ বছরে মেটাবলিজম ৫ পার্সেন্ট করে কমতে থাকে। এই কারণে বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের শরীরে চর্বি জমতে থাকে এবং পেশীর ভর কমে যায়।

লিঙ্গ: পুরুষের মাসলের ভর নারীর মাসলের ভরের চেয়ে বেশি এবং পুরুষের দ্রুত ক্যালরি খরচ হয়। সন্তান ধারণের পরে নারীদের মেটাবলিজমের হার বেশ কমে যায় এবং বেবি ফ্যাট থেকে যায়।

মাংস-পেশির ভর: আপনার শরীরে মাংস-পেশির ভর বা আধিক্য যত বেশি হবে, তত বেশি আপনি ক্যালরি বার্ন করতে পারবেন। তাই শরীরে চর্বির পরিবর্তে মাংস-পেশি বাড়ানোর বিষয়ে বেশি যত্নবান হোন।

শরীরের আকার: যারা যত বেশি দীর্ঘদেহি তারা তত বেশি ক্যালরি বার্ন করতে পারেন।

পরিবেশের তাপমাত্রা: ঠাণ্ডা পরিবেশ ক্যালরি বার্ন করার সহায়ক। আপনার  শরীরে যত বেশি ঠাণ্ডা লাগবে ততই শরীর ক্যালরি বার্ন করে ঠাণ্ডার হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। তাই উষ্ণ তাপমাত্রার চেয়ে অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা তাপমাত্রা শরীর-স্বাস্থ্যের এবং ক্যালরি বার্নের পক্ষে ভাল।

কায়িক পরিশ্রম: কায়িক পরিশ্রমে ক্যালরি বার্ন হয়। যত বেশি কায়িক পরিশ্রম করবেন তত বেশি আপনার ক্যালরি বার্ন হবে এবং মেটাবলিক রেট ও গতি বাড়বে।

হরমোনের ঘাটতি: হরমোনের ঘাটতি বিশেষ করে Cushing syndrome and hypothyroidism মেটাবলিক রেট স্লো করে এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়।

 

মেটাবলিজমের সাথে দেহের পুষ্টি উপাদানের মধ্যকার সম্পর্ক

পুষ্টি ছাড়া আমাদের দেহের পুষ্টি উপাদান অর্থাৎ ডিএনএ ও আরএনএ এই নিউক্লিক এসিডগুলি ভাঙবে না। মেটাবলিজম এগুলি ভাঙতে সহায়তা করে ও এগুলি ভেঙে শক্তি উৎপাদন করে। শরীরের কী পরিমাণ পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে মেটাবলিজম।

১. মেটাবলিজম ও শর্করা : শরীরের শক্তি উৎপাদন করে শর্করা। আমরা প্রতিদিন যে স্টার্চ, সুগার ও সেলুলোজ খাই তা থেকে আমরা শক্তি পেয়ে থাকি। মেটাবলিজম এই পুষ্টি উপাদানগুলিকে ভেঙে ফেলে ও প্রতিদিনের শক্তি সরবরাহ করে।

ভাত, রুটি, পাউরুটি, আলু, সেরেয়াল ইত্যাদি খাবারের মাধ্যমে মানুষ শর্করা পায়। গ্লুকোজ হল শরীরের শক্তির প্রধান উৎস, মেটাবোলাইজোশ স্টার্চ ও সুগার থেকে এই গ্লুকোজ তৈরি হয়। খাবার হজমের পরে এই প্রক্রিয়া ঘটে।

২. মেটাবলিজম ও আমিষ: আমাদের দেহের পেশী ও টিস্যু গঠনের জন্য আমিষ বা প্রোটিন দরকারি। প্রোটিন শরীরের কোষের খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রোটিন হিমোগ্লোবিন তৈরি করে। রক্তপ্রবাহে অক্সিজেন, ডিএনএ ও নাইট্রোজেন পরিবহনের জন্য প্রোটিনের ভূমিকা প্রধান। প্রোটিনে অ্যামিনো এসিড থাকে। খাবার থেকে আমরা যেসব অ্যামিনো এসিড পেয়ে থাকিতা হচ্ছে:

● ভ্যালাইন

● ট্রাইপটোফান

● মেথিওনিন

● লুসিয়েন

● আইসোলিউসিন

● ফেনাইল্যাল্যানিন

● থেরোনিন

● লাইসিন

৩. মেটাবলিজম ও ফ্যাট: প্রোটিন ও শর্করার দুই গুণ শক্তি উৎপাদন করে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বা ওমেগা-৩ শরীরের জন্য খুবই দরকারি। কোষের গঠন তৈরি ছাড়াও দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে রক্ষা করে ফ্যাট। ফ্যাট বা চর্বি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করে। ফ্যাটে দ্রবণীয় বিভিন্ন ভিটামিন শরীরে শোষিত হয় ফ্যাটের মাধ্যমে। শরীরের মেটাবলিক ফাংশন যথাযথ রাখার জন্য স্বাস্থ্যকর ফ্যাট খুব দরকার। আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট হল স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, যেমন, আরাকিডনিক ও লিনোলেইক ফ্যাট।

৪. মেটাবলিজম এবং ভিটামিন ও মিনারেল: শরীরের বিভিন্ন ফাংশন নিয়ন্ত্রণের জন্য মিনারেল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন খাবার থেকে যে মিনারেল পাওয়া যায় তা সরাসরি শক্তির জন্য ব্যবহৃত না হলেও মেটাবলিক প্রক্রিয়ায় মিনারেলের গুরুত্ব অনেক। কিছু মিনারেলের অভাবে শরীরের নিয়মিত ফাংশনে বিঘœ ঘটে। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় মিনারেলগুলি হল:

● আয়োডিন

● ক্যালসিয়াম

● ফসফরাস

● আয়রন

● সোডিয়াম

● ক্লোরাইড আয়ন

● পটাসিয়াম

● কোবাল্ট

● কপার

● ম্যাঙ্গানিজ

● ম্যাগনেসিয়াম

● জিঙ্ক

● ফ্লুরিন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ