সোমবার ১৯ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

গ্রামের অতিদরিদ্রদের জন্য ইজিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর ৬নং ওয়ার্ডে দহখুলা পশ্চিম পাড়ায় চলছে ইজিপিপির কাজ

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা : গ্রামের অতিদরিদ্রদের জন্য ইজিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।  কোথাও কোথাও কাগজে-কলমে শ্রমিক নিয়োগ দেখানো হলেও সেই সব শ্রমিক মাঠে নেই। এছাড়াও অস্তিত্বহীন প্রকল্প, এক প্রকল্পের নামে একাধিক প্রকল্প, প্রকল্প থাকলেও কাজ নেই টাকা উত্তোলন, ভুয়া মাষ্টার রোল, ভুয়া শ্রমিক নিয়োগ,ও ব্যাংক হিসাবে দেখিয়ে নামে বেনামে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও তদারকি না থাকায় প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এ লুটপাটের মহোৎসব চলছে। কাগজে কলমে প্রকল্পের কাজ ৪০ দিনের হলেও ১০/১২ দিন কাজ করিয়েই প্রকল্প শেষে করানোর অভিযোগ রয়েছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ৮/১০ দিন কাজ করানোর পর প্রকল্প বন্ধ রাখা হয়। এতে ভেস্তে যেতে বসেছে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির(ইজিপিপি) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ২০২০-২১ অর্থ বছরে ১ম পর্যায়ে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় ৩০ নভেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অনেক জেলাতে এখনো কাজ শুরু হচ্ছে। ১ম পর্যায়ে সরকারের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন বাবদ আটশত একুশ কোটি আটত্রিশ লক্ষ উনপঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। আগামি বছরের সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থাকায় জনপ্রতিনিধিরা আইনের তোয়াক্কা না করে বরাদ্দের বেশিরভাগ টাকা নয়ছয় করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সরকারের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন।
২০২০-২১ অর্থ বছরে ১ম পর্যায়ে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির(ইজিপিপি) আওতায় ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে  পুকুর, খাল খনন,পুন:খনন,বাঁধ নির্মাণ,পুন:নির্মাণ,রাস্তা,বাঁধ নির্মাণ পুন:নির্মাণ, গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন (রাস্তা, ব্রীজ), সেচ কাজের জন্য ও জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য খাল, নালা খনন, পুন: খননের উদ্যোগ গ্রহণ করে বর্তমান সরকার। এর জন্য সরকার আটশত একুশ কোটি আটত্রিশ লক্ষ উনপঞ্চাশ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। শুধু খুলনা বিভাগের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়  ৯৫ কোটি ৬৪ লক্ষ ৪৩ হাজার ৮২৪টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রয়েছে সাতক্ষীরা জেলাতে ১৯ কোটি ৩৬ লক্ষ ২৯ হাজার ৮৫৮ টাকা। এছাড়া বাগেরহাট জেলাতে ১২ কোটি ৮৫ লক্ষ ৬২ হাজার ৫৮৭ টাকা, চুয়াডাংগা জেলাতে ৫ কোটি ৫৭ লক্ষ ৫২ হাজার ৯৩২ টাকা, যশোর জেলাতে ১৯ কোটি ২৮ লক্ষ ৪৭ হাজার ১৪১ টাকা, ঝিনাইদহা জেলাতে ৮ কোটি ৩৭ লক্ষ ৩ হাজার ৩৪০৮ টাকা, খুলনা জেলাতে ১৩ কোটি ২৮ লক্ষ ৬৩ হাজার ৫০২ টাকা,কুষ্টিয়া জেলাতে ২ কোটি ১৭ লক্ষ ৬৫ হাজার ৭৩০ টাকা, মাগুরা জেলাতে ৮ কোটি ৪৪ লক্ষ ৯০ হাজার ৪৩৪ টাকা,মেহেরপুর  জেলাতে ২ কোটি ৯৭ লক্ষ ২৫ হাজার ১৩৪ টাকা, নড়াইল  জেলাতে ৩ কোটি ৩১ লক্ষ ৩ হাজার ১৬৬ টাকা।
অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) এর উদ্দেশ্য হলো-কর্মহীন মৌসুমে,স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কর্মক্ষম দুস্থ পরিবারগুলোর সুরক্ষা দেয়া। সেই লক্ষ্যে দরিদ্র  জনগোষ্ঠির অন্তর্ভূক্ত ব্যক্তি যার কাজের সামর্থ্য আছে এবং ভুমিহীন (বাড়ি ছাড়া ০.৫ একরের কম পরিমান জমি আছে)। যে ব্যাক্তির মাসিক আয় ৪,০০০/- (চার হাজার) টাকার কম অথবা যার মাছ চাষের জন্য পুকুর বা কোন প্রাণীসম্পদ নেই। অদক্ষ শ্রমিক যারা কাজ করতে আগ্রহী কিন্তু কোন কাজ পায় না । অদক্ষ শ্রমিক বলতে যারা দিন মজুর, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, গ্যাস মিস্ত্রি এবং কারখানা শ্রমিক অথবা যার অন্য কোন কাজের সুযোগ নেই। মহিলা এবং পুরুষ নির্বিশেষে একটি পরিবার থেকে মাত্র ০১ জন এ কাজের জন্য নির্বাচিত হবেন। অথচ  শ্রমিক নির্ধারণে এর বেশিরভাগই নিয়ম কানুন মানা হচ্ছে না। ফলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে বসেছে।  
প্রত্যেক শ্রমিক বছরে ২টি পর্যায়ে ৪০ দিন করে এই কাজ করার সুযোগ পাওয়ার কথা। প্রতি কর্মদিবসে ২০০/- টাকা (প্রতি পর্যায়ে ৪০ দিন/বছরে ০২ টি পর্যায়) । ২৫/- টাকা সঞ্চয় হিসেবে জমা রাখা হয়ে থাকে।  একজন বেকার ও অদক্ষ শ্রমিক মাসে আট হাজার মজুরি পাওয়ার কথা। অথচ যেসব শ্রমিক ইজিপিপি প্রকল্পের কাজ করছে তার বেশিরভাগই কাবিখা-কাবিটা প্রকল্পের শ্রমিক। নতুন করে শ্রমিক না নেয়ায় প্রকল্পের উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে বসেছে।
সরকারি ছুটির দিন ব্যতিত দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে প্রকল্প শুরুর দিন থেকে বরাদ্ধকৃত শ্রমিকরা সপ্তাহের বৃহস্পতি ও শুক্রবার বাদে ৪০দিন কাজ করবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, উন্নয়ন দুরের কথা, কাজের আগেই তদারকি কর্মকর্তার কমিশন বাণিজ্যে তারা দিশেহারা, অতিষ্ট।
সাতক্ষীরায় ইজিপিপি প্রকল্পের নামে চলছে পুরোদমে লুটপাট ও বাণিজ্য। স্থানীয় প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও যথাযথ তদারকি না থাকায় প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এ লুটপাটের মহোৎসবে মেতে উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনইচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, রাস্তা মাটির কাজের জন্য বরাদ্ধ আসলেও তা না করে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ভূয়া প্রকল্প তৈরি করে টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করে। অথচ এ সব সড়কে বর্ষার সময় পানির কারনে চলাচল করা যাচ্ছেনা। এছাড়া কোথাও কোথাও কাগজে-কলমে শ্রমিক নিয়োগ দেখানো হয়। বাস্তবে মাঠে কোন শ্রমিক নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রক্ষ্মরাজপুর ৫নং ওয়ার্ডে দহখুলা পশ্চিম পাড়া হামিদের পুকুরের ধার হতে ইমন মিস্ত্রির পাশ দিয়ে মন্টুর জমি পর্যন্ত কাঁচা রাস্তা করতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ লক্ষ ৩২ হাজার টাকা। ৪০ কর্মদিবসে ২৯ জন শ্রমিক দৈনিক মজুরি ২শ টাকার ভিত্তিতে রাস্তাটি তেরি করার কথা। অথচ শ্রমিকের দেখা মিলল ২২ জন। অর্থাৎ ৭জন শ্রমিকের হদিস নেই। কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে আশরাফুল,মাজেদ, আবু আলম,মনিরুল,সাবিলা,হালিমা,আজিজা,নমিতা,সুভারানি,কমলা জানান, ধান কাটা শ্রমিকের দাম ৩শ থেকে ৪শ টাকা অথচ তাদের দেয়া হচ্ছে মাত্র ২শ টাকা। এখানে  যারা কাজ করছে তারা কেউ কেউ অন্যের পরিবর্তে কাজ করছে।
তালা উপজেলার মাগুরা ইউনিয়নে সংরক্ষিত ৭,৮,ও ৯ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বর রাশিদা বেগম। স্থানীয়রা জানান, ইজিপিপি,কৃষি,গর্ববর্তি কার্ড,দুধের কাডসহ যে কোন প্রকল্প এলে মহিলা এ মেম্বর তার দুপুত্র,পুত্রবউসহ নিকট আত্নীয়র নামে কার্ড করে টাকা তুলে নেয়। একই  ইউনিয়নের চাদকাটি গ্রামের ফারুক হোসেন । বিগত ৫ বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ করে আসছে। বর্তমানে সে একটি ইট ভাটায় কর্মরত। অথচ সে বর্তমান প্রকল্প ইজিপিপির একজন শ্রমিক। ইউনিয়নটিতে  ইজিপিপিতে কর্মরত বেশির শ্রমিক পূর্বের বিভিন্ন প্রকল্পের শ্রমিক। কয়েকটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান চৌকিদারের নামে কয়েকটি ভূয়া কার্ড তৈরি করে টাকা উত্তলন করছে। যেসব শ্রমিমের নাম ইজিপিপিতে আছে তারা অনেকেউ ধান কাটা কিম্বা ইটভায় শ্রম দিচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মাস শেষে তাদেরকে এক থেকে দেড় হাজার টাকা দিয়ে চেকের পাতায় শই করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।  ব্যাংক গুলোর সাথে যোগসাজে  বিভিন্ন প্রকল্পের শ্রমিকদের পরিবর্তে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বররা ব্যাংক থেকে মজুরির টাকা তুলছেন।
উল্লেখ্য, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে সাতক্ষীরার ৭ টি উপজেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য ইজিপিপি প্রকল্প খাতে বরাদ্ধ দেয়া হয়  ১৯ কোটি ৩৬ লক্ষ ২৯ হাজার ৮৫৮ টাকা। এর মধ্যে আশাশুনিতে ২ কোটি ৯২ লক্ষ ৮০ হাজার ১১৪ টাকা, দেবহাটায়  ১ কোটি ২১ লক্ষ ৯৬ হাজার ৩২৮ টাকা, কলারোয়ায় ২ কোটি ১৯ লক্ষ ৩৫ হাজার ৭৫ টাকা, কালিগঞ্জে ২ কোটি ৯৭ লক্ষ ৮৬ হাজার ৫১৪ টাকা, সাতক্ষীরা সদরে ৩ কোটি ৩৮ লক্ষ ২৪ হাজার ২২০ টাকা,
শ্যামনগরে ৩ কোটি ৬০ লক্ষ ২০ হাজার ৭৪৩ টাকা এবং তালায় ৩কোটি ৫ লক্ষ ৮৬ হাজার ৮৬৪ টাকা।
গ্রামের অতিদরিদ্রদের জন্য ইজিপিপি  প্রকল্পের  প্রকল্প পরিচালক অতিরিক্ত সচিব মোঃ সিদ্দিকুর রহমান  জানান, ইজিপিপি প্রকল্পের ১ম পর্যায়ে সরকারের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন বাবদ আটশত একুশ কোটি আটত্রিশ লক্ষ উনপঞ্চাশ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সারাদেশে কাজ চলছে। কোথাও অনিয়ম হলে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। যে কোন অভিযোগ pdsnsp15@gmail.com ই-মেইলে পাঠানো যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ