সোমবার ১৯ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

শ্রমিকরা ভালো নেই

খুলনা অফিস : খুলনাঞ্চলের শিল্প-সাম্রাজে ঐতিহ্যের সোপান হচ্ছে পাট। কিন্তু ভালো নেই খুলনার বেসরকারি পাটকলগুলো। একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এক সময়ের লাভজনক খুলনার ব্যক্তি মালিকানা জুট মিল। এতে করে শ্রমিক-কর্মচারী বেকারত্বের কবলে পড়ছে। পাটকল বন্ধক রেখে ব্যাংকের ঋণ নেয়া এবং পরে সেই টাকা দিয়ে অন্য ব্যবসা পরিচালনা করা, মিল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও সঠিক তদারকির অভাব ও অসৎ সিবিএ নেতাদের কারণে এ দুরাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধ থাকা পাটকলগুলোর মধ্যে রয়েছে ফুলবাড়িগেট মিরেরডাঙ্গা এলাকার এ্যাজাক্স জুট মিল, শিরোমনির মহসেন জুট মিল, শিরোমনি বিসিক এলাকার জুট স্পিনার্স, ট্রান্সওসেন ফাইবার্স, সোনালী ও আফিল জুট মিল।
শিরোমনি শিল্পাঞ্চলের মহসেন জুট মিল ষাটের দশকে প্রায় ২০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। মিলটি ১৩ মাস লে-অফ থাকার পর ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই মিলটি বন্ধ ও মিলের ৬৬৭ জন শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই করে মিল কর্তৃপক্ষ। শ্রমিক কর্মচারীদের প্রায় ১০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে।
ফুলবাড়ীগেট মিরেরডাঙ্গা শিল্পাঞ্চলের এ্যাজাক্স জুট মিল ষাটের দশকে ৮০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ্যাজাক্স জুট মিলটি ২০১৪ সালের ২২ মে বন্ধ হয়। মালিক পক্ষের কাছে শ্রমিকদের প্রায় ২০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এ মিলটিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় চার হাজার শ্রমিক ছিল।
এখানের সোনালী জুট মিল ষাটের দশকে ৪৫ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিরোমনি শিল্পাঞ্চলের সোনালী জুট মিলটি কয়েক দফা বন্ধের পর আংশিক চালু থাকলেও ২৮ নভেম্বর মিলটি পুনরায় বন্ধ হয়। মিলটিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক থাকলেও আংশিক চালু অবস্থায় ৭ শতাধিক শ্রমিক কাজ করতো।
আটরা-গিলাতলা শিল্পাঞ্চলের আফিল জুট মিল ষাটের দশকে ৫২ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আফিল জুট মিলের বিদ্যুৎ বিল বাকি থাকায় ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর বিদ্যুৎ বিভাগ মিলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর ৪ মাস জেনারেটর দিয়ে মিলটি চালিয়ে রাখা হলেও ২০১৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মিলটি বন্ধ হয়। বর্তমানে শ্রমিকের মিল মালিকের কাছে প্রায় ৮ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
শিরোমনি বিসিক শিল্প এলাকায় ১৩ একর জমি নিয়ে জুট স্পিনার্স মিলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৬ সালে বন্ধ হয়, মিলটিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে ১ হাজার ২শ’ ম্রমিক কাজ করতো, শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া পওনা রয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা।
এখন আর শ্রমিকের পদভারে মুখরিত হয়না মিরেরডাঙ্গা আটরা শিল্প এলাকা। সব সময় বিরাজ করে শুনসান নিরবতা। বেসরকারি পাট, সুতা, বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশন (রেজি নং ১০) নামে এ সংগঠনটি শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে রাজপথে সোচ্চার থাকলেও মালিক পক্ষের কাছ থেকে তেমন ভালো কোন ফলাফল পাওয়া যায়নি বলে জানান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা। জুট মিলের মালিকরা মিল দেখিয়ে ঋণ নিয়ে অন্য ব্যবসায় লগ্নি করে মিলগুলোতে লালবাতি জ্বালিয়েছে বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।
পাট শিল্প হয়ে উঠেছিল দেশের মর্যাদার প্রতীক আর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান অবলম্বন। স্বাধীনতার পর থেকে ভুল নীতি প্রণয়ন আর অব্যবস্থাপনার কারণে সেই শিল্পই হয়ে উঠল লোকসান কবলিত। আর এখন পাটশিল্প হয়ে উঠেছে জাতীয় দুঃখ আর বেদনার প্রতীকে। পাটশিল্প যেন এদেশের নদ-নদীর জোয়ার-ভাটার সূত্রই মেনে চলছে। বেসরকারি জুট মিলের শ্রমিকরা মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া খুলনাঞ্চলের শ্রমিকের দুঃখ, দুর্দশা অবসান হবে না।
পাটকলগুলো তদারক, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) গঠন করা হয়। ওই সময় বিজেএমসির আওতায় ৮২টি পাটকল রাখা হলেও ১৯৭৭-৯৬ সালের মধ্যে ৪৪টি পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব মতে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থ-বছরে দেশের রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশই ছিল পাটের অবদান। বাংলাদেশ থেকে মূলত ভারত, সিরিয়া, ইরান, মিসর, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, থাইল্যান্ডসহ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাট ও পাটপণ্য রফতানি হয়।
ভৈরব নদের গা ঘেঁষে আটরা ও শিরোমনি এলাকায় স্থাপিত হয় আফিল জুট মিল, মহসেন জুট মিল, সোনালি জুট মিল, এজাক্স জুট মিল, আর শিরোমনি বিসিক শিল্প এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় জুট স্পিনার্স।
মহসেন জুট মিলের শ্রমিক মুক্তিযোদ্ধা ক্বারী আসহাফ উদ্দিন বলেন, জীবন যৌবন শেষ করলাম জুট মিলে চাকুরি করে। অথচ নিজের বকেয়া পাওনা আজও পেলাম না।
সোনালি জুট মিলের শ্রমিক বাবুল হোসেন বলেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছি অর্থ অভাবে ছেলে মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে ।
আফিল মিল এর শ্রমিক আবুল কালাম বলেন, মিল মালিকদের চরম খামখেয়ালি ও মালিকের অনুগত সিবিএ নেতাদের কারণে মিলের আজ এ অবস্থা। সব সমস্যা সৃষ্টির পেছনে সিবিএ নেতাদের তিনি দায়ী ।
এ্যাজাক্স মিলের শ্রমিক আব্দুর রশিদ বলেন, চাকুরি শেষে চুড়ান্ত পাওনা পাওয়ার পর ৭ বছর অতিবাহিত হতে গেলেও আজ নিজের পাওনা বুঝে পাইনি। অনেক শ্রমিক বিনা চিকিৎসায় অর্ধাহারে অনাহারে ইতোমধ্যে মারা গেছেন।
খুলনা বিভাগীয় শ্রম পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার শ্রম বান্ধব সরকার ব্যক্তি মালিকানা মিলের সমস্যা নিরসনে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে মহসেন জুট মিলের মালিক তাদের শ্রমিক কলোনির জায়গা বিক্রি করে শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করবে যেটা জেলা প্রশাসক সার্বক্ষণিক খোজা খবর রাখছেন, এছাড়া মিল মালিকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আমি নিজে বাদী হয়ে মামলা করেছে যেটা চলমান রয়েছে। সোনালি জুট মিলটি কিভাবে পুনরায় চালু করা যায় সেটা আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। এ্যাজাক্স মিলের ব্যাপারে চেষ্টা চলছে। এছাড়া আফিল জুট মিলের মালিককে সল্প সময়ের ভিতরে ডাকা হবে, মিল চালু করতে হবে শ্রমিকের দেনা পাওনা পরিশোধ করতে হবে। শ্রমিক খেয়ে না খেয়ে রাজপথে থাকবে আর মালিকরা মিলের উৎপাদন এর কাজে টাকা ব্যায় না করে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ভোগবিলাসি জীবনযাপন করবে, শ্রম বান্ধব সরকারের ভাবমুর্তিক্ষুন্ন হবে এটা হতে পারে না। ১৯৮১ সালের পর সরকার জুট মিল ব্যক্তি মালিকানায় ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। এ প্রক্রিয়ায় খুলনার আফিল, মহসেন, সোনালি এবং এ্যাজাক্স জুট মিল মালিকদের কাছে ফেরত দেয়া হয়।
বেসরকারি পাট, সুতা, বস্ত্রকল শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুল খান বলেন, শ্রমিক কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধ না করে পাটকলগুলো বন্ধ রাখায় অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন। বেকার হয়ে পড়েছেন এ সব মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরা। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন তারা। শ্রমিকরা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মালিকপক্ষের খামখেয়ালির কারণে এ সব মিলের শ্রমিকরা এখন বেকার। শ্রমিক কর্মচারীদের বেকারত্ব দূরীকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এ শ্রমিকরা বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পরতে পারে। এ কারণে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, করোনার সময়ে সারা বিশ্বে পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি জুট মিল বন্ধ হওয়াতে মালিকানা জুট মিলের মালিকরা এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে পুনরায় মিলগুলি উৎপাদনের দিকে নিয়ে যাবে- এমনটাই আশা করেন শ্রমিক কর্মচারীরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ