সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

করোনার বর্জ্যে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ ও সংক্রমণের ঝুঁকি

মুহাম্মদ নূরে আলম: করোনা প্রাদুর্ভাবে লকডাউনে সারাবিশ্বে পরিবেশ দূষণ কমেছে। পাহাড়-বন-সাগর প্রকৃতি ফিরে পেয়েছে হারানো রঙ। করোনার প্রথম দিকে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের অন্যতম ঢাকায় বায়ুদূষণ কিছুটা কমে যায়। বুড়িগঙ্গার পানিও ফিরে পায় অক্সিজেন। কিন্তু রাজধানী ঢাকার পরিবেশ এখন যেই সেই অবস্থা। গণপরিবহণ না চললেও মানুষের চলাচল ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় দূষণ আরো বেড়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনার সংক্রমণের ফলে বেড়েছে মাস্ক, গ্লাভস, পারসোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই), স্যানিটাইজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার। কিন্তু, নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় ব্যবহারের পর এসব সুরক্ষা সামগ্রী যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে করোনা বর্জ্যের ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি। অনেকেই করোনার এসব সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পর রাস্তাঘাটেই ফেলে দিচ্ছে। এতে করে এগুলো বৃষ্টির পানিতে  ধুয়ে চলে যাচ্ছে ড্রেনে, ড্রেন থেকে নদীতে। সবশেষে এগুলোর ঠিকানা হচ্ছে নদী ও সাগরের তলদেশে। ফলে সাগরের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশেও ভবিষ্যতে এসবের ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।

এ ছাড়া এসডোর গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে সারা দেশে পলিথিন ব্যাগের বর্জ্য ৫ হাজার ৭৯৬ টন, পলিথিন হ্যান্ডগ্লাবস ৩ হাজার ৩৯ টন, সার্জিক্যাল হ্যান্ডগ্লাভস ২ হাজার ৮৩৮ টন, সার্জিক্যাল মাস্ক এক হাজার ৫৯২ টন ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল থেকে ৯০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে। এ সময়ে শুধু ঢাকায়ই সর্বোচ্চ এক হাজার ৩১৪ টন সার্জিক্যাল হ্যান্ড গ্লাবসের বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে। পলিথিন হ্যান্ডগ্লাভস ৬০২ টন, সার্জিক্যাল মাস্ক ৪৪৭ টন, পলিথিন ব্যাগ ৪৪৩ ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল থেকে ২৭০ টন বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে। এসব বর্জ্য পানিতে মিশে মারাত্মকভাবে সংক্রমণের বিস্তার ঘটাতে পারে।

পরিবেশবিদদের আশংকা, করোনা থেকে আত্মরক্ষার জন্য যে উপকরণগুলো অত্যাবশ্যকীয়, ভবিষ্যতে তা হয়ে উঠবে পরিবেশ দূষণের অন্যতম বিপদের কারণ। পলিথিনের অধিক ব্যবহার, মেডিকেল বর্জ্য (ট্যাবলেট-ক্যাপসুলের খোলস, স্যালাইন, সিরিঞ্জ, ব্যান্ডেজ, সিরাপ), প্লাস্টিক ব্যাগ, ঢাকার আশপাশের ইটভাটা, করোনার কারণে ব্যবহৃত হ্যান্ডগ্লাবস, সার্জিক্যাল হ্যান্ডগ্লাবস, সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতলের বর্জ্য পানিতে মিশে মারাত্মকভাবে সংক্রমণের বিস্তার ঘটাচ্ছে। এতে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা, বালু নদী ছাড়াও ঢাকার ভিতরে ও চারপাশের ডোবা-নালা, মজাপুকুর, ড্রেন সর্বত্রই মারাত্মক দূষণের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই এসব সুরক্ষা সামগ্রী ডিসপোজালের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। ফলে করোনার সুরক্ষা সামগ্রীই পরিণামে হয়ে উঠছে করোনা সংক্রমণের অন্যতম নিয়ামক। বাড়ছে পরিবেশ দূষণ।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক সচিব, প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান গণমাধ্যমকে বলেন, করোনা সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পর সঠিকভাবে ধ্বংস না করলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভিসি বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে কোভিড চিকিৎসার যে হাসপাতালগুলো আছে, আমরা বলেছিলাম সেগুলোর বর্জ্য এবং অন্যান্য হাসপাতালের বর্জ্য এক সঙ্গে রাখা যাবে না। কোভিড হাসপাতালের বর্জ্য আলাদা করে ডিসইনফেক্টেড করে, তারপর এগুলো বর্জ্য যারা নিষ্কাশন করে তাদের দিতে হবে। কিন্তু এখনও সেটা কার্যকর করা হয়নি। 

বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, করোনা ভাইরাস অনেক নতুন উপলব্ধির জন্ম দিয়েছে। প্রকৃতির রোষানল থেকে বাঁচতে অবশ্যই প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে। এই লকডাউনে এটা প্রমাণ হয়েছে যে কি পরিমাণ শিল্প বর্জ্য প্রতিদিন নদীতে মিশে নদীর জীবন কেড়ে নিচ্ছে। যদি নদী না বাঁচে তাহলে বিপন্ন হবে পরিবেশ, বিপন্ন হবে মানব জীবন। কলকারখানার বর্জ্য শোধনাগার অবশ্যই পরিবেশসম্মত আধুনিক করতে হবে।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশে করোনা উপসর্গ ধরা পড়ার পরে শুধুমাত্র একমাসে মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাবসসহ সংশ্লিষ্ট প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ টন। এই বর্জ্যের মধ্যে শুধু ঢাকায় উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৭৬ টন। যার বড় একটি অংশ নদীর পানিতে মিশছে। তাই নদী দূষণ ও সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপ আরও জোরদার করার দাবি বিশেষজ্ঞদের। 

পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. এ কে এম রফিক আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, নদীদূষণ প্রতিরোধে আমাদের কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত আছে। মাঠ পর্যায়ে আমাদের পরিদর্শক টিম সব সময় কাজ করছে। তবে করোনার কারণে আমাদের অভিযান বন্ধ রয়েছে।

পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যমতে, বুড়িগঙ্গায় প্রতিদিন কলকারখানার ৩৫০০ ঘন মিটার এবং অন্যান্য থেকে ২৭০০ ঘনমিটার দূষিত তরল বর্জ্য মেশে। করোনা মহামারীর কারণে সব কিছু বন্ধ থাকায় এক মাসেরও বেশি সময় নদী এসব দূষণ থেকে মুক্ত ছিল। ফলে প্রাণ ফিরছিল নদীতে। পানিতে বসবাস করা প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য প্রতি লিটারে ৬ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন দরকার। আতিমাত্রার দূষণে বুড়িগঙ্গায় এর মাত্রা শূন্যে নেমে ছিল। ফলে বুড়িগঙ্গায় মাছ বা অন্য কোনো জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল না।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ