ঢাকা, বুধবার 5 August 2020, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

সারাদেশে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ’র জন্য হাহাকার

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলায় হিমসিম খাচ্ছে দেশের হাসপাতালগুলো।বিশেষ করে আইসিইউ’র জন্য রীতিমত হাহাকার শুরু হয়েছে। সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই শোনা যায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য স্বজনদের এই হাহাকার।

ঝুঁকিপূর্ণ করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউ সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। আইসিইউ সাপোর্টের অভাবে অনেক রোগী মারা যাচ্ছেন বলে অভিযোগ আসছে। সরকারি-বেসরকারি কোথাও আইসিইউ সেবা মিলছে না। সবক’টি হাসপাতালেই আইসিইউ শয্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এর বাইরে ভেন্টিলেশন ও অক্সিজেন সুবিধাও যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধুমাত্র করোনা রোগীদের জন্য যে পরিমাণ আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন তার দশ ভাগও হাসপাতালগুলো দিতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঢাকার বড় বড় সরকারি পাঁচটি হাসপাতালে মোট ১০৩টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এত স্বল্প সংখ্যক আইসিইউ শয্যা দিয়ে বিপুল পরিমাণ করোনা পজিটিভ, উপসর্গ আছে এমন ও অন্যান্য রোগীদের সাপোর্ট দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি হাসপাতালেই রোগীরা আইসিইউ’র জন্য হাহাকার করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) আইসিইউ শয্যা রয়েছে ৬২টি। এর মধ্যে ৩০টি নবজাতকের জন্য। এছাড়া সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে রয়েছে ১০টি, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড) ১১টি, মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ১০টি ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রয়েছে ১০টি। এসব হাসপাতালের মোট আইসিইউ শয্যা করোনা পজিটিভ ও সাধারণ রোগীদের জন্য ভাগ করা হয়েছে। সেজন্য করোনা পজিটিভ রোগীরা চাইলেই আইসিইউ সেবা পাচ্ছেন না। আর বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকেই সেবা নিতে পারছেন না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, করোনা রোগীদের শতকরা ৮০ শতাংশের মধ্যে মৃদু লক্ষণ দেখা দেয়। তাদের হাসপাতালে যেতে হয় না। বাকি ২০ শতাংশের মধ্যে ১৫ শতাংশের উপসর্গ তীব্র হয় এবং হাসপাতালে যেতে হয়। আর বাকি ৫ শতাংশের অবস্থা থাকে জটিল। তাদের আইসিইউ বেডের পাশাপাশি দরকার হয় ভেন্টিলেটর।

অবশ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সাধারণত বৃদ্ধ ও আগে থেকেই অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তদের আইসিইউ প্রয়োজন হয়। অথচ প্রতিটি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে একটি আইসিইউ শয্যা পেতে অপেক্ষায় থাকতে হয় একাধিক রোগীকে। আইসিইউ না পেয়ে রোগী মারা যাওয়ার চিত্র তো প্রায় প্রতিদিনের।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, দেশে করোনা রোগীর জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেড রয়েছে ৩৯৯টি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ২১৮টি। ঢাকা বিভাগের অন্য জেলায় রয়েছে ৪৭টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৪টি, রাজশাহী বিভাগে ২৮টি, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ১৮টি করে, সিলেট বিভাগে ১৬টি এবং রংপুর বিভাগে রয়েছে ১৩টি আইসিইউ বেড।

রাজধানীতে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে ২৬টি, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ২৭টি, মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ১০টি, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪৮টি, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ১৬টি, রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় ৩টি করে, সাজিদা ফাউন্ডেশনে ৪টি, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০টি, মহানগর জেনারেল হাসপাতাল এবং মিরপুরের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতালে ৫ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের কাজ চলছে। কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেছে ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এছাড়া পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসার জন্য তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি ইমপালস হাসপাতালে রয়েছে ১৪টি আইসিইউ।

কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের অ্যানেস্থেশিয়া বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. চন্দন কুমার বণিক বলেন, ‘এখানে আইসিইউ বেড ফাঁকা থাকে না বললেই চলে। একেকটি বেডের জন্য অপেক্ষায় থাকেন একাধিক রোগী। কেউ সুস্থ হয়ে কেবিনে গেলে কিংবা মারা গেলে অপেক্ষারতদের মধ্য থেকে তুলনামূলক যার অবস্থা বেশি নাজুক তাকেই নিয়ে আসা হয় আইসিইউতে।’

মুগদা জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ডা. আসাদুল মজিদ নোমানের দাবি, এখানে প্রতিটি আইসিইউর জন্য ভীষণ চাপ থাকে। নিদেনপক্ষে একেকটি বেডের জন্য অপেক্ষায় থাকেন পাঁচজন করে। তারা কিছুক্ষণ পরপর বেড খালি হয়েছে কিনা জানতে চান।

ডা. আসাদুল মজিদ নোমানের কথায়, ‘কী সব মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যে আমরা যাচ্ছি জানেন না। একজন রোগীর ডেথ সার্টিফিকেট লেখা শেষ না হতেই আরেকজনকে আনা হয়। তার অবস্থা এতই নাজুক ছিল যে, আইসিইউতে আনার পর তার চিকিৎসা শুরু করতে না করতেই মারা গেছেন।’

আগামীতে আইসিইউ সংকট প্রকট হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য। তার মন্তব্য, ‘দেশে আগে থেকেই আইসিইউর সংকট ছিল। গত কয়েক সপ্তাহে রোগী যেমন বেড়েছে, তেমনই বাড়ছে আইসিইউর চাহিদা।’

বিএসএমএমইউ’র সাবেক উপাচার্যের পরামর্শ, ‘হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেড ও অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। মৃত্যু কমাতে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।’

তবে রাতারাতি আইসিইউ বেড বাড়ানো সম্ভব নয়। এটাই বাস্তবতা উল্লেখ করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও করোনা বিষয়ক মিডিয়া সেলের প্রধান হাবিবুর রহমান। তার মন্তব্য, ‘এখন যা উপকরণ আছে সেসবই ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া বিদেশ থেকে যা যা পারা যায় তা আনার প্রক্রিয়া চলছে।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘যত আইসিইউ বেড আছে সেগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার যাতে হয় তা নিশ্চিতের চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটি হলেও অন্তত ৪০০ মানুষ সেবা পাবে।’

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ— ‘যেহেতু আইসিইউর ঘাটতি রয়েছে, তাই রোগীদের জটিল অবস্থা হওয়ার আগে তাদের দিকে নজর দিতে হবে। হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়াতে হবে।’

জীবাণুর সংক্রমণ যাতে না হয় সেদিকে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘রোগী যত কম হবে, ঝুঁকি ততই কমবে। পাশাপাশি আইসিইউর মতো জটিল ব্যবস্থাপনার আগে যদি সহজ ব্যবস্থাপনা নেওয়া যায় তাহলে জটিলতার দিকে রোগী কম যাবে।’

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার। এর মধ্যে মারা গেছেন প্রায় ৮ হাজার। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তি বেড়েছে মানুষের।

ডিএস/এএইচ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ