রবিবার ১২ জুলাই ২০২০
Online Edition

বিশ্ববাজারে তেলের দাম তলানিতে ॥ সংরক্ষণ সক্ষমতার অভাবে সুফল মিলবে না দেশে

স্টাফ রিপোর্টার: করোনা ভাইরাসের মহামারিতে গোটা বিশ্ব স্থবির। বন্ধ রয়েছে প্রায় বেশিরভাগ শিল্প-কারখানা, গণপরিবহন। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থাও একেবারেই ভেঙে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পতন ঘটেছে জ্বালানির চাহিদায়। তার জের ধরে গত একমাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও কমে তলানিতে পৌঁছেছে। বিশ^বাজারে তেলের দাম তলানিতে থাকলেও দেশে সংরক্ষণ সক্ষমতার অভাবে মিলবে না সুফল।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে লোকসান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে সরকার বলছে, তেল সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় আন্তজার্তিক বাজার থেকে নতুন করে তেল কেনা বাংলাদেশের পক্ষ সম্ভব না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের পড়তি দামের কোনো সুফলই ঘরে তুলতে পারবে না বাংলাদেশ।

বিপিসি’র তথ্য অনুযায়ী, বছরে গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টন তেল কিনে থাকে সরকারি সংস্থাটি। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন আসে বিপিসি’র মালিকানাধীন দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে। চাহিদার বাকিটা আমদানি করা হয়।

এদিকে, আমদানির ক্ষেত্রে মূলত দুই পদ্ধতিতে সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কিনে থাকে। একটি হলো সরাসরি সরকারের কাছ থেকে (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট, জিটুজি), অন্যটি আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে। জিটুজি পদ্ধতিতে যে দুইটি দেশের কাছ থেকে সরকার তেল কেনে, সেই দেশ দুইটি হলো সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে বছরে দুই বার আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে তেল কেনা হয় সাত দেশের আট কোম্পানির কাছ থেকে। চলতি বছরের তেল কেনার প্রক্রিয়া আগেই শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে সাড়ে ১৬ লাখ টন তেল কেনা হয়েছে ভিটল ও ইউনিপিকের কাছ থেকে। আরও তেল রয়েছে পাইপলাইনে, দেশে পৌঁছানোর অপেক্ষায়।

জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে উৎপাদনমুখী শিল্প কল-কারখানা বন্ধ। গণপরিবহন চলছে না। ফলে গত ৪০ দিনে দেশে যে জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়েছে, তা সবমিলিয়ে সাধারণ সময়ের ২৫ শতাংশের বেশি না। সেদিক থেকে ৭৫ শতাংশ জ্বালানি অব্যবহৃত রয়ে গেছে। আবার চলতি বছরের জন্য তেল আমদানির ক্রয়াদেশও দেওয়া হয়েছে। সে তেল আসার অপেক্ষায়। সময়মতো ক্রয়াদেশের তেল না নিয়ে আসতে পারলে লোকসান গুনতে হবে। এই লোকসান যেন গুনতে না হয়, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।

আনিছুর রহমান আরও বলেন, আগামী জুন পর্যন্ত জিটুজি পদ্ধতিতে যে চুক্তি ছিল, সেখানে প্রিমিয়াম ছিল প্রতি ডলারে ১ দশমিক ৯৬ ডলার। এখন জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন দাম বেঁধে দিয়েছে  ৮ ডলার। দাম চার গুণ বেশি ধরার কারণ পরিবহনের জন্য জাহাজ সংকট। সব জাহাজ এখন তেল ভর্তি করে সাগরে সাগরে ভাসছে। এখন দেখা যাচ্ছে তেলের দামের চেয়ে তেলের পরিবহন খরচ বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশে তেল সংরক্ষণের জায়গা নেই। এ পরিস্থিতিতে এখন আন্তজার্তিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল কেনা কোনোভাবেই সম্ভব না।

জানা যায়, দেশে তেল সংরক্ষণে বিপিসির যে সক্ষমতা, তাতে আমদানি বন্ধ না থাকলে ৬০ দিনের বেশি তেল সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব নয়। সাধারণত একদিকে তেল ব্যবহার হয়, অন্যদিকে আমদানি হয় এভাবেই চলে আসছিল। করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাব পরিস্থিতিকে অন্যদিকে নিয়ে গেছে।

যদিও মজুত বাড়ানোর জন্য পার্বতীপুরে ২১ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি ট্যাংকার তৈরির কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল নেওয়ার আরেকটি প্রকল্পের কাজ চলছে কক্সবাজারে। এ প্রকল্প শেষ হলে এখানে ৯০ হাজার টন তেল মজুত রাখা যাবে। এছাড়া ইআরএল-২ নামে আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সেটি শেষ হলে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল শোধন করার সুযোগ হবে। তাতে মজুতের পরিমাণও বাড়বে। কিন্তু সব প্রকল্পই নির্মাণাধীন। এ পরিস্থিতিতে সরকার কোনোভাবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কেনার চিন্তা করতে পারছে না।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, বিপিসি শুরু থেকেই লোকসান দিয়ে আসছে। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমের দিকে থাকলেও বিপিসি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। যদিও কয়েক বছর ধরে বিপিসির দাবি তারা লাভের মুখ দেখছে। তবে এবার তেলের যে দরপতন দেখা গেছে, তা স্মরণকালের সবচেয়ে কম দামে এসে ঠেকেছে। এখন তেল মজুত করা গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট যেমন কমত, তেমনি বিপিসি লাভবানও হতো।

বদরুল ইমাম মনে করছেন, করোনাভাইরাসের কারণে চলতি বছরের বাকি সময়েও তেলের বাজার এরকম পড়তির দিকেই থাকবে। সেক্ষেত্রে সরকারে উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে জ্বালানি তেলের মজুত বাড়ানোর এমনটিই মত এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞের।

এমন পরামর্শের প্রত্যুত্তরে জ্বালানি সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান মিডিয়াকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ইআরএল প্রকল্পে মাত্র কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সে প্রকল্পের  কাজ শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যাবে। পার্বতীপুরের ট্যাংকার তৈরির প্রকল্পে ভারতীয় টেকনিশিয়ানরা এসে মাত্র কাজ শুরু করেছিলেন। করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটতে শুরু করলে তারা দেশে ফিরে গেছেন। ফলে ওই প্রকল্পেও কাজ কবে শুরু হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

সচিবের বক্তব্যে এটুকু স্পষ্ট, জ্বালানি তেল সংরক্ষের সক্ষমতা সহসাই বাড়ছে না বাংলাদেশের। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তলানিতে ঠেকলেও এ সুযোগ কাজে লাগতে পারবে না বাংলাদেশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ