বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ভারতের শহুরে রাস্তায় বিপন্ন পশু-পাখির আনাগোনা

২৯ মার্চ, ইন্টারনেট : করোনাবাইরাসের মোকাবেলায় গোটা ভারতবর্ষ যখন নজিরবিহীন ‘টোটাল লকডাউন’র কবলে, দেশের নানা প্রান্ত থেকে যখন হৃদয়বিদারক নানা খবর আসছে অবিরত –সেই বিষাদের মধ্যেও জনপদে ফিরেছে টাটকা বাতাস। সেখানে এখন বিপন্ন পশুপাখিদের আনাগোনা। ভারতে এখন ব্যস্ত মেট্রো শহরের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে চিতল হরিণ বা নীলগাই, বিরল প্রজাতির সিভেট বা ভাম এসে বাজার পরিদর্শন করে যাচ্ছেÍউড়িষ্যার সমুদ্রসৈকতে নিশ্চিন্তে আর নিভৃতে ডিম পাড়ছে লক্ষ লক্ষ অলিভ রিডলে কচ্ছপ।

করোনাভাইরাসে বিধ্বস্ত ইতালির ভেনিসের সমুদ্রতীরে বিশাল ক্রুজ শিপগুলো এখন আর এসে ভিড়ছে না, খালেও নেই গন্ডোলার ‘ট্র্যাফিক জ্যাম’। ফলে ভেনিসের ক্যানালগুলোতে আবার ডলফিন এসে খেলে বেড়াচ্ছে – এ ছবি ভাইরাল হয়েছিল দিনকয়েক আগেই।

ভারতের নানা ব্যস্ত শহর ও জনপদে, হাইওয়ে বা ট্রেন লাইনেও এখন অবিকল একই ধরনের দৃশ্য। নাগরিক দৃশ্যপট থেকে যে পশুপাখিরা বহুদিন আগে হারিয়ে গিয়েছিল তারা যেন আবার নিজেদের জায়গা ‘রিক্লেইম’ করতে ফিরে এসেছে।  রাস্তায় গাড়িঘোড়া নেই, মানুষের চলাচল নেই, দোকানপাট বন্ধÑ কাজেই এই পশুপাখিরা বহু বহু দিন পর আবার স্বমহিমায়।

ভারতীয় ফরেস্ট সার্ভিসের এক তরুণ কর্মকর্তা সুশান্ত নন্দা গত কয়েকদিন ধরে তার ট্ইুটার হ্যান্ডল থেকে অবিরত পোস্ট করে চলেছেন এমনই অসাধারণ  সব ছবি, যা রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছে গোটা দেশ জুড়ে।

অনুপ্রাণিত হয়ে গৃহবন্দী অনেক ভারতীয়ই পোস্ট করতে শুরু করেছেন, কীভাবে তারা তাদের ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে দুষ্প্রাপ্য হর্নবিল দেখতে পেয়েছেন – কিংবা চন্ডীগড়ের মতো ব্যস্ত শহরের রাস্তায় একটা রেইন ডিয়ারকে ফাঁকা রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং পেরিয়ে ছুটে যেতে দেখা গিয়েছে।

তো গত দিনসাতেক ধরে ভারতে যে ‘জনতা কারফিউ’ ও তারপর একটানা লকডাউন চলছে, তাতে প্রকৃতির অন্যান্য জীবজন্তুরা কীভাবে মানুষের দোরগোড়ায় চলে এসেছে তার কতগুলো দৃষ্টান্ত দেখা যাক :

সুশান্ত নন্দা জানাচ্ছেন, উড়িষ্যার উপকূলে এবছর অলিভ রিডলে কচ্ছপরা ডিম পাড়তে এসেছিল একটু দেরিতে। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে টাইমিংটা নিখুঁত হয়েছে কারণ লকডাউনের জন্য তারা মানুষের নজর এড়িয়ে অনেক শান্তিতে ডিম পাড়তে পারছে। গহীরমাথায় আর ঋষিকুল্যা সৈকত জুড়ে এবার প্রায় আট লক্ষ কচ্ছপ এসেছেÑ যার অর্থ ভারতের সমুদ্রতটে প্রায় ছয় কোটি অলিভ রিডলের ডিম!

পশ্চিমঘাট পর্বত এক বিশেষ ধরনের ভামের বাসভূমি, যাদের নাম মালাবার লার্জ স্পটেড সিভেট।  প্রায় তিরিশ বছর আগে এই অতি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীটিকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল। ধারণা করা হয়, মাত্র আড়াইশোটির মতো পূর্ণবয়স্ক সিভেট এই মুহুর্তে জীবিত আছে। কিন্তু এ সপ্তাহে কেরালার কালিকটের এক বন্ধ বাজারের মধ্যে তাদেরই একটিকে রাস্তার মাঝখানে দেখা গেছে – মোবাইল ফোনের ভিডিওতেও ধারণ করা সম্ভব হয়েছে সেই বিরল দৃশ্য।

হরিদ্বার আর দেরাদুন দুটোই ব্যস্ত শহর, কিন্তু তাদের বেশ কাছেই রাজাজী ন্যাশনাল পার্ক। এই লকাডাউনে সবকিছু যখন সুনসান, হাইওয়েগুলো স্তব্ধ – তখন সেই অভয়ারণ্য থেকে হাঁটতে হাঁটতে একপাল বড় শিংওয়ালা হরিণ চলে এসেছিল হরিদ্বার শহরে। লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে নিশ্চিন্তে তারা ঘুরে বেড়িয়েছে। একইভাবে দেরাদুনেও বাচ্চাদের ক্রিকেট খেলার মাঝে ঢুকে পড়েছে তারা, চন্ডীগড়েও এই ধরনের হরিণকে শহরের রাস্তা পেরোতে দেখা গিযেছে।  

দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত তিরুপতি মন্দির, যা একটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত, সেটাও এখন বন্ধ। কিন্তু সেই তিরুপতি যাওয়ার পাহাড়ি রাস্তায় এখন অবাধে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে স্পটেড ডিয়ার বা চিতল হরিণের পাল।

দিল্লির সীমানাঘেঁষা স্যাটেলাইট শহর নয়ডা-র প্রধান ব্যস্ততম এলাকা জিআইপি মল ও তার সংলগ্ন রাস্তা। বৃহস্পতিবার সেই রাস্তা ছিল একেবারে ফাঁকা, আর সেখানেই ভরদুপুরে দাপিয়ে বেড়াল একটা পূর্ণবয়স্ক, বিশাল চেহারার নীলগাই (অ্যান্টিলোপ)-ধরা পড়ল ভিডিওতেও। আশেপাশের জঙ্গুলে এলাকা বা চাষের ক্ষেতেই এখন তাদের বিচরণ, কিন্তু সেদিন সুযোগ পেয়ে বেচারা বোধহয় দেখতে এসেছিল কেমন আছে তাদের পুরনো জায়গির!

ভারতে ট্রেন চলাচলও এখন বন্ধ, তাই আসাম ও অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে পাসিঘাট ফরেস্ট এলাকায় নিশ্চিন্তে ও দুলকি চালে রেললাইন পেরোতে দেখা গেছে দাঁতাল হাতির বিশাল এক পালকেও। ট্রেনের ব্যাঘাত নেই, অতএব গজেন্দ্রগমনে সেই হাতির পাল লাইন পেরিয়ে জঙ্গলের এক দিক থেকে অন্য দিকে যাচ্ছেন, সেই অসাধারণ ভিডিও-ও পোস্ট করেছেন সুশান্ত নন্দা।

এমন উদাহরণ ভারতের নানা প্রান্তে আরও অজস্র। আর শুধু পশুরাই বা কেন, পাখিরাও নিজেদের পুরনো এলাকায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে এতটুকুও পিছিয়ে নেই।  মুম্বাই, দিল্লি বা ব্যাঙ্গালোরের মতো মেট্রো শহরের বাসিন্দারাও জানাচ্ছেন, গত কয়েদিনে তারা নিজেদের বাড়িতে বসেই এমন সব পাখি দেখেছেন বা পাখপাখালির ডাক শুনেছেন - যে অভিজ্ঞতা তাদের আগে কখনও হয়নি।

দক্ষিণ দিল্লির ব্যস্ত লোকালয় ও ভারতের রাজধানীতে বাঙালিদের নিজস্ব মহল্লা বলে পরিচিত চিত্তরঞ্জন পার্কে নিজের বাড়ির ব্যালকনি থেকে গাছের ডালে বিরল গ্রেট হর্নবিল যুগলের ছবি পর্যন্ত তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা রাজর্ষি বসু!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ