শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

যারা দিন আনে দিন খায় তারা এখন কী করবেন?

আসিফ আরসালান : এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেছে বলে মনে হচ্ছে না। গত শনিবার পর্যন্ত রোগতত্ত্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) হিসাব মতে এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪৮ এবং এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৫। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। আর এ পর্যন্ত অর্থাৎ ২৮ মার্চ, অর্থাৎ ২০ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮। তবে এই পরিসংখ্যানে আত্মতৃপ্ত হওয়ার অবকাশ কম। কারণ এতদিন এই ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হয়েছেন কি-না সেটি পরীক্ষার জন্য ছিল একটি মাত্র কেন্দ্র। সেটি হলো মহাখালীর রোগতত্ত্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান (কেন্দ্র)। পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিট বা রি এজেন্ট ছিলনা। গত বৃহস্পতিবার গণচীন থেকে ১০ হাজার কিট এসেছে। এখন মহাখালী ছাড়াও তিনটি কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা করা হবে। এর একটি চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম পরীক্ষা কেন্দ্র ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে বলে বলা হয়েছে। তাহলে যেখানে গত ২০ দিন ধরে যেখানে একটি কেন্দ্রে পরীক্ষা চলতো, এখন সেখানে চলবে ৪টি কেন্দ্রে। এই ৪টি কেন্দ্রে একযোগে পরীক্ষা শুরু করলে তখন আক্রান্তের সংখ্যা সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা পাওয়া যাবে। বলা হচ্ছে, সরকার বিভাগীয় শহরগুলোতেও এই পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদি আরো ৬টি বিভাগীয় শহর ধরা হয় তাহলে মোট ১০টি কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরু হবে। হয়ত তখন আক্রান্তের সঠিক সংখ্যা পাওয়া যাবে।
এর মধ্যে হয়েছে আরেকটি নতুন ডেভেলপমেন্ট। গত ২৫ ও ২৬ মার্চ লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকা ছেড়ে তাদের দেশের বাড়িতে গেছেন। অন্য কথায় যে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকায় ছিলেন তারা বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে যাদের ভেতর ভাইরাসটি সুপ্ত রয়েছে তাদের সংস্পর্শে যারা আসবেন তাদেরও অনেকের ভেতর এই ভাইরাস অনুপ্রবেশ করবে। সেই ভাইরাস রোগ হিসাবে প্রকাশিত হবে ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে। সুতরাং আগামী ৭ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিলের মধ্যে জানা যাবে কতজন আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এখানেও কথা আছে। সর্বশেষ হিসাব মতে দেখা যাচ্ছে যে ২৬ ও ২৭ মার্চ যে নতুন ৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, তাদের সকলে বিদেশ ফেরৎ নন। সুতরাং বাংলাদেশে আগামী ২০/২৫ দিনে করোনার প্রকোপ বাড়বে না কমবে, সেটা এই মুহুর্তে সঠিকভাবে কেউ বলতে পারছেন না। এমনকি বিশেষজ্ঞরাও। ৫/৬ দিন আগে একাধিক ভাইরোলজিস্ট বলেছিলেন যে আগামী ২০/২৫ দিনে করোনার প্রকোপ ভয়াবহরূপে বৃদ্ধি পাবে, তারাই এখন থমকে দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ তাঁরা দেখছেন যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভূটান ও আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে তার সাথে পশ্চিমা দেশ সমূহ বিশেষ করে আমেরিকা ও ইউরোপের চিত্রের মিল নেই।
॥দুই॥
প্রথমে বাংলাদেশ। আমরা যদি রৈখিক চিত্রে বাংলাদেশের অবস্থা প্রকাশ করি তাহলে নিম্নোক্ত চিত্র প্রকাশ পায়: ৮ মার্চ প্রথম ৩ জন রোগী শনাক্ত হন। এই পরিস্থিতি চলে ৭ দিন। তারপর থেকেই পরিস্থিতির উত্তরোত্তর অবনতি ঘটতে থাকে। ১৫ মার্চ ৫ জন, ১৬ মার্চ ৮ জন এভাবে বাড়তে বাড়তে ২৭ মার্চ ৪৮ জনে উন্নীত হয়। অর্থাৎ ২০ দিনে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৪৫ জন। তবে এই সময় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৫ জনে। ২৬ মার্চ মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫। ২৮ মার্চ যখন এই কলাম লিখছি সেদিন কোনো মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলা এবং করোনায় মৃত্যু ঠেকানোর জন্য যেসব যন্ত্রপাতি ও উপকরণ প্রয়োজন সেগুলো এতই অপ্রতুল যে বিষয়টি চিন্তা করলে আতঙ্কিত হতে হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল সমূহে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট বা আইসিইউ এর শয্যা সংখ্যা যথাক্রমে ৫০৮ এবং ৭০১। রাজধানীতে করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউ বেডের সংখ্যা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে-১০। দেশে করোনা রোগীদের জন্য ভেন্টিলেটরের সংখ্যা মাত্র ৩৬। বলা হচ্ছে যে আইসিইউ বেড এবং ভেন্টিলেটরের সংখ্যা শীঘ্রই বৃদ্ধি করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন যে করোনা রোগ প্রথম দেখা দেয় চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে ৮ ডিসেম্বর। ৩১ ডিসেম্বর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে বিষয়টি অবহিত করে চীন। এর মধ্যে এই রোগ চীন ছাড়িয়ে ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকা ছড়িয়ে পড়ে। তখন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এই রোগকে এপিডেমিক বা মহামারির পরিবর্তে প্যানডেমিক বা বৈশি^ক মহামারি বলে ঘোষণা দেয়। এটি ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনা। তারপর বাংলাদেশ পৌনে দুই মাস সময় পায়। এই দীর্ঘ সময় ধরে সরকার বা প্রশাসন কি করছিল? ১৫ মার্চ যখন আক্রান্তের সংখ্যা ৩ থেকে ৫ এ উন্নীত হয় তখনই সরকারের টনক নড়ে। জনগণ, বিশেষজ্ঞ মহল, সুধী সমাজ প্রমুখ সকলেই স্কুল কলেজ অফিস আদালত সহ জনসমাগম মূলক কর্মসূচি এবং কার্যকলাপ বন্ধ করার তাগিদ দেন। ১৬ মার্চ স্কুল কলেজ বন্ধ করা হয়।
এভাবেই সময় গড়িয়ে চলে। আক্রান্তের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারও নার্সদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সুরক্ষা (পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুয়িপমেন্ট), টেস্টিং কিটস বা রি এজেন্ট, আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর ইত্যাদির জরুরি ভিত্তিতে আমাদানীর কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয় নাই। ইতোমধ্যে চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়া করোনা মোকাবিলায় বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে। তাদের সাফল্য আমাদের কাছে শিক্ষনীয় নজীর হতে পারতো। কিন্তু আমরা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করিনি। অবশেষে ২৫ মার্চ সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বটে, কিন্তু এখনও সমগ্র বাংলাদেশকে লক ডাউনের আওতায় আনা হয়নি। অথচ এই সরকারের কাছে যে ভারত রোল মডেল সেই ভারত ২৫ মার্চের আগেই জনতার কারফিউ জারি করে এবং তার একদিন পর সারা ভারতে লক ডাউন জারী করে।
প্রিয় পাঠক, ভাবুন ১৩ লক্ষ বর্গমাইলের ১৩০ কোটি অধিবাসী অধ্যুষিত ভারত সমগ্র দেশকে লকডাউনের আওতায় আনে, অথচ বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অনেক ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও আজ (২৮ মার্চ) পর্যন্ত অফিসিয়ালি লকডাউন ঘোষণা করা হয় নাই। এ ছাড়া ডাক্তার এবং সেবক ও সেবিকাদের জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী (পিপিই) সংগ্রহ না করার ভয়াবহ পরিণতি ঘটেছে ২৭ মার্চ। ঐ দিন যে ৪ ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন দুই জন চিকিৎসক।
॥তিন॥
বলছিলাম এই উপমহাদেশের কথা। যখন লেখাটি শেষ পর্যায়ে এসেছে অর্থাৎ ২৮ মার্চের পরিসংখ্যান দিচ্ছি। আমেরিকায় করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৪ হাজার ২৫৬ জন। মৃত্যু ১৭০৪ জন। ইতালিতে আক্রান্ত ৮৬ হাজার ৪৯৮ জন, মৃত্যু ৯ হাজার ১৩৪ জন। স্পেনে আক্রান্ত ৬৫হাজার ৭১৯ জন, মৃত্যু ৫ হাজার ১৩৮ জন। এভাবে দেখা যায় যে পশ্চিমা দেশ, যেগুলো অর্থনৈতিক ভাবে অত্যন্ত উন্নত সেই সব দেশে আক্রান্ত এবং মৃত্যু উভয়েই অনেক বেশি। এর পাশাপাশি দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ দেখুন। আগেই বলেছি, ভারত ১৩ লক্ষ বর্গমাইলেরও বেশি আয়তনের বিশাল দেশ। জনসংখ্যা বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম। বৃহত্তম চীন। তার জনসংখ্যা ১৩৬ কোটি। আর ভারতের জনসংখ্যা ১৩০ কোটি। সেই ভারতে আক্রান্ত ৯০২, মৃত্যু ২০। পাকিস্তানের আয়তন ৩ কোটি ১৩ লক্ষ বর্গমাইল। জনসংখ্যা ২১ কোটি। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৩৭৩ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১১ জন। আফগানিস্তানঃ আক্রান্তের সংখ্যা ১১০, মৃত্যুর সংখ্যা ৪ জন। মিয়ানমারঃ আক্রান্ত ৮ জন, মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য। ভূটান এবং নেপালের আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ৩ ও ৪। মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য।
এসব থেকে কী বোঝা যাচ্ছে? আমি ডাক্তার নই। মলিকিউলার বায়োলজিস্ট নই এবং ভাইরোলজিস্টও নই। কিন্তু সাদা চোখে দেখা যাচ্ছে যে, আমেরিকা এবং ইউরোপ ঠাণ্ডার দেশ (শীত প্রধান দেশ) মাস খানেক আগে যখন ঐ সব দেশে করোনা হানা দেয় তখন সেখানে তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের নীচে, অর্থাৎ মাইনাস ডিগ্রি। এখনও ঐ সব দেশে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নীচে। অর্থাৎ ঠাণ্ডা। বাংলাদেশে ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রা হলেই আমরা বলি দেশে শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ যবুথবু হয়ে থাকে। দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশের নাম আমরা উপরে উল্লেখ করেছি সে সব দেশের তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রির ওপর। বাংলাদেশের তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি থেকে ৩৭ ডিগ্রিতে উঠানামা করছে। ১৬ কোটি ৬০ লক্ষ লোকের বাস বাংলাদেশে। আয়তন মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইল। সেই দেশে করোনার প্রকোপ বিশে^র ধনাঢ্য দেশের ধারে পাশেও নেই (আমরা আল্লাহর কাছে মোনাজাত করছি যেন আমাদের পরিস্থিতির অবনতি না হয়)।
ওয়াশিংটন আমেরিকার রাজধানী। কিন্তু রূপক অর্থে বলা হয় যে নিউইয়র্ক পৃথিবী নামক এই গ্রহটির রাজধানী। সেই নিউইয়র্কে ২৫ হাজার ৫৭৩ ব্যক্তি আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬৬ জন। মৃতের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশী রয়েছেন। পক্ষান্তরে সমগ্র বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা ২৮ মার্চ বিকাল ৫টা পর্যন্ত ৫ জন।
বাংলাদেশ সরকার সমগ্র দেশটিকে শাটডাউন বা অবরোধ আরোপ করেছেন। একথা ঠিক যে এটির প্রয়োজন ছিল। ঢাকার শাটডাউন তো কারফিউয়ের মত মনে হচ্ছে। এই পরিস্থিতির কেউই বিরোধিতা করছেন না। আমরাও না। কিন্তু ঢাকার বস্তিগুলোতে বাস করে কয়েক লক্ষ মানুষ। এরা দিন আনে দিন খায়। সরকার ৫০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য। যদি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তারা কি খাবে। সেই বিবেচনায় এটি ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় সেই তিন কোটি মানুষের কি হবে? পশ্চিমবঙ্গের মূখ্য মন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সাড়ে ৭ কোটি মানুষের কাছে ৬ মাস বিনামূল্যে খাদ্য-শস্য সরবরাহ করবেন। আমাদের সরকার কী সেটা পারেনা? দেশে অন্তত ৪০টি পরিবার আছে যারা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। তারা কী এই দুর্দিনে এগিয়ে আসতে পারেন না?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ