রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

প্রতিনিয়ত আসছে চলমান ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিলের খবর

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: করোনা ভাইরাসের প্রভাবে মহা-সংকটে তৈরি পোশাক খাত। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে নানামুখী সঙ্কটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। প্রতিনিয়ত ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে চলমান ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিলের খবর আসছে। আসছে না নতুন অর্ডার। বন্ধ হচ্ছে রফতানি। এভাবে চলতে থাকলে পোশাক খাত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে, যা সামাল দেয়া কঠিন হবে বলে অভিমত খাত সংশ্লিষ্টদের। বাতিলের পাশাপাশি ২০ কারখানার ১৩ লাখ ডলারের ক্রয়াদেশ স্থগিতাদেশ দিয়েছে ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা এখন চীন ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি হলে দেশের প্রধান রফতানি আয়ের তৈরি পোশাক খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। নতুন করে অর্ডার আসছে না। আগের ক্রয়াদেশ স্থগিত রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিদেশি ক্রেতারা। এতে পণ্য শিপমেন্ট বন্ধ হলে সঙ্কটে পড়বেন পোশাক মালিকরা। এভাবে চলতে থাকলে সামনে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিতে সমস্যা হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। বিষয়টি ক্রেতাদেশগুলোকে শুধু ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা না করে মানবিকতার দিকে এগিয়ে আসারও আহবান জানান তারা। 
করোনা ভাইরাসের কারণে কয়েক দিন ধরে তৈরি পোশাকের অনেক চলমান ক্রয়াদেশের ওপর স্থগিতাদেশ আসছিল। তাই এ শিল্পের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছিলেন, স্থগিতাদেশের পরের ধাপে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেবে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ড। শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্য হলো। ২০টি পোশাক কারখানার ১ কোটি ৭২ লাখ ডলার বা ১৪৬ কোটি টাকা সমমূল্যের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ কার্যালয় গত মঙ্গলবার চার ঘণ্টার ব্যবধানে এই কারখানাগুলোর কাছ থেকে ক্রয়াদেশ বাতিলের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পেরেছে। অবশ্য কেবল বাতিল নয়, পাশাপাশি কারখানাগুলোর ১৩ লাখ ৩৮ হাজার ডলারের ক্রয়াদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান।
পোশাক খাতের পরিস্থিতি বিষয়ে জানতে চাইলে এ খাতের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, বর্তমানে তৈরি পোশাক খাত গভীর সঙ্কটের মধ্যে পার করছে। একের পর এক পোশাক কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সামনে এ খাত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে। তিনি বলেন, অর্ডার কমে যাওয়ায় মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া ইতোমধ্যে তাদের কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। কিন্তু আমরা কর্মী ছাঁটাই করবো না। কারণ শ্রমিক আমাদের বেশি গুরুত্ব। শ্রমিকের কথা চিন্তা করে আমরা ক্রেতাদের বলছি আপনারা অর্ডার বাতিল করবেন না। এখন এ মুহূর্তে যদি ক্রয়াদেশ বাতিল করতে শুরু করে; শিপমেন্ট করতে না দেয় তাহলে শ্রমিকের বেতন-বোনাস নিয়ে সামনে সাংঘাতিক বিপদের মধ্যে পড়বে।
করোনার ধাক্কা সামলানোর মতো সক্ষমতা পোশাক খাতে আছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এক্সপোর্ট ইমপোর্টের ব্যবসা। এটি যদি বন্ধ থাকে তাহলে যে ক্ষতি হবে তা সামলানোর মতো সক্ষমতা আমাদের কারো নেই। যদি রফতানি বন্ধ থাকে তাহলে আমাদের ব্যবসাই তো বন্ধ হয়ে যাবে। তাহলে আমরা কী করব। আমরা অর্থ সঙ্কটে পড়ব, যা সামাল দেয়া সম্ভবও নয়। কারণ আমাদের অন্য কোনো ব্যবসা নেই।
কয়েক দিনে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের ক্রয়াদেশ স্থগিত করা হয়েছে জানিয়ে বিজিএমইএ’র সভাপতি বলেন, এ পর্যন্ত বড় বড় ২০টি কারখানা ক্রয়াদেশ স্থগিত করার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে লিড বায়ার রয়েছে অন্তত সাতজন। প্রত্যেক বায়ার বলছেন, আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে অপেক্ষা করা মানেই এটি বাতিল। কারণ ক্রেতারা কোনো সময় বলেন না আমরা পণ্য কিনব না। তারা বলেন, একটু অপেক্ষা করেন। পরে তৈরি করেন। এখন চাহিদা কম বিক্রি কম। পরে নেবো। কিন্তু সরাসরি কখনই বলেন না আমরা নেবো না। পরে যদি নেয়ও এখনকার দাম দেবে না। ডিসকাউন্ট চাইবে।
এমন পরিস্থিতিতে আপনাদের করণীয় কি? জানতে চাইলে রুবানা হক বলেন, আমরা এ অবস্থা সরকারকে জানিয়েছি। আমাদের নীতিসহায়তা দরকার ও অন্যান্য সুবিধা দেয়ার কথা বলেছি। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
পণ্য তৈরিতে কাঁচামালের সমস্যা আছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের নিট কাপড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ নিজেরাই তৈরি করি। এটিতে সমস্যা হচ্ছে না। তবে নন-কটন বেশি দামের পণ্যের কাঁচামাল কিছু সঙ্কট রয়েছে। এছাড়া পোশাক খাতের যেসব পণ্য আমদানি হয় তার ৪৯ শতাংশ আসে চীন থেকে। যন্ত্রপাতি কাঁচামালের সঙ্কটে গত দেড় মাস বিশাল ধাক্কা খেয়েছি। এটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। কিন্তু এ সময় ক্রেতারা সমস্যা করছে। এতে উভয় সঙ্কটে পড়ছে বলে জানান এ পোশাক মালিকদের নেতা।
বিজিএমইএর তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে পোশাক কারখানা রয়েছে চার হাজার ৫৬০টি। যেখানে কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। দেশের মোট রফতানির পোশাকের অবদান ৮৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে হোমটেক্স, টেরিটাওয়েলসহ এ খাতের অন্যান্য রফতানির উপখাত হিসাব করলে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ৮৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এক দশক ধরে দেশের জিডিপি ৬ শতাংশের ওপর থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে এ পোশাক খাত। তৈরি পোশাকের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয় কমেছে। অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি শেষে পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ২ হাজার ১৮৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ কম। একই সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধিও কমেছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে কথা বলা যাবে না। ইউরোপ, আমেরিকায় এটি দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে আমাদের রফতানি বাণিজ্য ভয়াবহ রূপ নেবে। তিনি বলেন, আগের তুলনায় আমাদের ব্যবসা কমে গেছে। এর মধ্যে যদি ক্রয়াদেশ স্থগিত হয় তাহলে বড় সঙ্কটের মধ্যে পড়বে। আগামীতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। তাই ক্রয়াদেশ প্রত্যাহার না করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি চলমান দুরবস্থা থেকে উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে এ খাতের জন্য নগদ প্রণোদনা দেয়ার দাবি জানান এ তৈরি পোশাক উদ্যোক্তা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডায় ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। দেশগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্যান্য দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। গ্যাপ, নাইকি, ইন্ডিটেক্স, কলাম্বিয়া স্পোর্টসওয়্যার, রিফোরমেশনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন দেশে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসকোয়্যার নিট কম্পোজিটের ২২ লাখ ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করেছে দুটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। বিটপী গ্রুপের ৪ লাখ ৬৬ হাজার ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। বাতিল ও স্থগিতাদেশের মধ্যে পড়েছে অ্যাপেক্স হোল্ডিংসের ৪০ লাখ পিস পোশাক। আমান গ্রাফিকস অ্যান্ড ডিজাইনের ১ লাখ ১৩ হাজার ডলার মূল্যের ৩৯ হাজার পিস পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। আমান নিটিংয়ের ১ লাখ ৯৭ হাজার ডলারের ৪৪ হাজার ৭২৬ পিসের ক্রয়াদেশ স্থগিত হয়েছে। স্কাইলাইন গার্মেন্টসের ৮ লাখ ৫০ হাজার ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। রুমানা ফ্যাশনের ৯০ হাজার পিস পোশাকের ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে দুই ক্রেতা।
জানতে চাইলে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, প্রতিনিয়ত ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডের কাছ থেকে চলমান ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিলের খবর আসছে। নতুন ক্রয়াদেশের বিষয়ে ক্রেতারা বলছেন, বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ। কারখানাগুলোকে নতুন ক্রয়াদেশ এখন দেবে না। ক্রয়াদেশের আগের পরিকল্পনা নিয়ে তারা নতুন করে ভাবছে। রুবানা হক বলেন,  ক্রেতাদের বিবেক কোথায়? মানবাধিকারের কথা বলে তাঁরা আমাদের সব সময়ই চাপ দেন। তখন তাঁরা আর কিছু চিন্তা করেন না। করোনা ভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সময় তাঁরা শুধু ব্যবসার কথা ভাবছেন। শ্রমিকদের কথা একদণ্ড চিন্তা করছেন না। এটা তো হতে পারে না। এভাবে যদি ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিল হতে থাকে, তাহলে পোশাকশিল্পের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বলতে পারছি না। সামনে ঈদ। ফলে সামনে ভয়াবহ বিপর্যয় আসছে।
পোশাকশিল্পের কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, পোশাকের চলমান ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিল করার তালিকায় রয়েছে বড় ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে সিঅ্যান্ডএ, জারা, পুল অ্যান্ড বেয়ার, বেবি শপ, ব্ল্যাকবেরি, প্রাইমার্ক উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পোশাক কেনে এমন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এইচঅ্যান্ডএম। সুইডেনভিত্তিক এই খুচরা বিক্রেতা ব্র্যান্ডের বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইথিওপিয়ার আঞ্চলিক প্রধান জিয়াউর রহমান বলেন, আমরা চলমান ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করিনি। তবে সামনের দিনগুলোতে যেসব ক্রয়াদেশ দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে আমরা পরিবর্তন আনছি। পরিমাণ কমাচ্ছি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ব্র্যান্ডগুলোর আউটলেটে বিক্রি নেই। তিনি বলেন, সপ্তাহ দুয়েক ধরে ইউরোপে করোনা ভাইরাস আঘাত হেনেছে। চীনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, মাস দুয়েকের মধ্যে অবস্থার উন্নতি নাও হতে পারে। সেটি হলে পোশাক রফতানিতে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। এই বিপর্যয় কাাঁতে হলে সরকার, ব্র্যান্ড, বিজিএমইএ ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ