বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ইতিহাস বিকৃতি, জাতীয়তাবাদ এবং ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদের বিনাশ

শেখ দরবার আলম:

॥ এক ॥

অনেক ব্যাপক এবং গভীর সমস্যার মধ্যে আছে আমাদের এই সমাজহীন মুসলমান সমাজ। এই ২০১৯-এ স্কুলের সেভেন ক্লাসে পড়া আমার সন্তানপ্রতীম শাহতুর রহমানের ইতিহাস বই দেখে এবং তার কথাবার্তা শুনে বুঝলাম আমাদের এসব সন্তানরা বড় হয়ে একদিন ঠিকই এই ভারতীয় উপমহাদেশের আর একটি মুসলিমপ্রধান দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে দস্তুর মত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে পারবেন। কিন্তু অজ্ঞতার বিরুদ্ধে, জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে, এক জাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে সাম্য ও সহাবস্থানের পক্ষে লড়াইটা ঠিক মত করতে পারবেন কিনা সেটা বলা খুবই মুশকিল। বিষয়টা সবাই মেহেরবানী করে চিন্তা করে দেখলে তা সমাজের জন্য, দেশের জন্য এবং গণমানুষের জন্য কল্যাণকর হবে। 

গত ১৬ই মার্চ ২০১৯ তারিখ শনিবার দৈনিক কাগজ ‘প্রথম আলো’র পঞ্চম পৃষ্ঠায় ‘লেখা লেখককে অতিক্রম করে যায়” শিরোনামে প্রতিবেদনে দেখছি, গত ১৫ই মার্চ ২০১৯ তারিখ শুক্রবার ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উচ্চতর মানবিক ও সামাজিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের তৃতীয় সম্মেলনের প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে ৩০ লাখ মানুষের আত্মবলিদানে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো, তাতে ক্ষমতায় এলো জাতীয়তাবাদীরা। কিন্তু একাত্তরের চেতনা ছিল সমাজবাদের।”

ধর্মভিত্তিক হোক, বর্ণ বা গায়ের রঙভিত্তিক হোক, ভাষাভিত্তিক হোক, কিংবা অঞ্চল বা আঞ্চলিকতা ভিত্তিক হোক, যে কোনো জাতীয়তাবাদ এবং এক জাতিতত্ত্ব হলো সাম্য ও সহাবস্থানের বিপরীত মেরুর, মানবাধিকারের এবং ন্যায়পরায়ণতার ও ঔচিত্যবোধের বিপরীত মেরুর বিষয়। এটা এক কঠিন বাস্তবতা। চিন্তা করলে এটা উপলব্ধি করা যায়।

অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জাতীয়তাবাদ আবার পুরোপুরিই আন্তর্জাতিকবাদেরও সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। সাম্যবাদের নামাবলী পরা কেউ কেউ সেটা কেবল ভুলে যান না, জ্ঞানপাপীর মত ভুলিয়ে দিতেও চান। সে রকম একটা ঘটনার কথা দেখছি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা প্রাইভেট লিমিটেডের ‘বইয়ের দেশ’-এর এপ্রিল-জুন ২০১৯ এর ১৫শ’ বর্ষ : ২য় সংখ্যায় ৪৫ পৃষ্ঠায় “বিজ্ঞান ও মৌলবাদের সংঘাত” শিরোনামে পথিক প্রহর লেখায়। তিনি লিখেছেন:

“অনেক বাঙালির মনে গান্ধীর পাশাপাশি সুভাষ চন্দ্র বসু এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। গান্ধী অনেক কারণে নিন্দার্হ, সুভাষ পূজনীয়। সম্প্রতি এ ধারণার পরাকাষ্ঠা দেখে চমকে উঠেছি। খবরে দেখলাম, বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আর্জি পেশ করবেন, সুভাষের জন্মদিন ২৩ জানুয়ারি যেন ‘দেশপ্রেম দিবস’ ঘোষিত হয়। যিনি একদা হাত মিলিয়েছিলেন অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে, তাঁর জন্মদিন দেশপ্রেমের সঙ্গে যুক্ত হতেই পারে, কিন্তু সিপিআই (এম) কবে থেকে আন্তর্জাতিকবাদ বিসর্জন দিয়ে জাতীয়তাবাদ বরণ করে নিল, সে খবর তো পেলাম না।’

ইতিহাস-বিকৃতি থেকেই জাতীয়তাবাদের জন্ম। ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েই জাতীয়তাবাদের জন্ম দিতে হয় এবং জাতীয়তাবাদকে তুঙ্গে তুলতে হয়। কার্যত রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)-এর শাখা সংগঠন হিসাবে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েই তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়িয়ে আসছে বিশেষ করে ১৯৯২-এর ৬ই ডিসেম্বর ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংস করার সময় থেকে।

১৬ই মার্চ ২০১৯ তারিখ শনিবার ঢাকার দৈনিক কাগজ ‘প্রথম আলো’র ১০ পৃষ্ঠায় উপরিভাগে দেখছি, ‘নীতিভ্রষ্ট হওয়ায় কংগ্রেস পার্টিকে মহাত্মা গান্ধী ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন,’- নরেন্দ্র মোদির এই বক্তব্য প্রসঙ্গে (কলকাতার) আনন্দবাজার পত্রিকার ‘সম্পাদকীয় মন্তব্য’ ছাপা হয়েছে। সম্পাদকীয় মন্তব্যে বলা হয়েছে, ‘বিজেপির দাক্ষিণ্যে আরও অসংখ্যবারের মতই ইতিহাস পরিণত হইতেছে মিথ্যার বেসাতিতে।”

কিন্তু কোনো জাতীয়তাবাদই তো মিথ্যার আশ্রয় ছাড়া বাঁচে না।

এখন এই মিথ্যার বেসাতির একটা চরম পর্যায়ের উদাহরণের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা প্রাইভেট লিমিটেডের ‘দেশ’ পত্রিকার ১৭ই ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখের সংখ্যায় ১৭ পৃষ্ঠায় ‘ধর্ম ও রাজনীতি : সমস্যা মনোবৃত্তির’ এই শিরোনামে মনুষ্যবোধে উত্তীর্ণ সাংবাদিক লেখক সুমিত মিত্রর একটা খুব প্রয়োজনীয় লেখা ছাপা হয়েছে। ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদকে হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ব আরোপকামী দৃষ্টিভঙ্গিতে কিভাবে রামমন্দির বলে অভিহিত করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে দেখে অধিকার-বঞ্চিত করার ও উৎখাত করার এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা মুছে ফেলার পরিবেশ সৃষ্টি করা হলো সেটা ‘দেশ’ পত্রিকার পাঠকরা যাতে উপলব্ধি করতে পারেন সেই লক্ষ্যেই মনুষ্যত্ববোধে উত্তীর্ণ শ্রদ্ধেয় লেখক সুমিত মিত্র উদার দৃষ্টিতে ধীরেন্দ্র ঝা এবং কৃষ্ণা ঝা, এই দু’জন মহৎ মানুষের লেখা ‘অযোধ্যা : দ্য ডার্ক নাইট’ শিরোনামের গ্রন্থ থেকে কিছু তারিখ-তথ্য পেশ করেছেন। ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদকে রাতারাতি রামমন্দির বলে অভিহিত করার পরিকল্পনা কিভাবে সাতচল্লিশের মধ্য আগস্টের বছর আড়াই পর কার্যকর করা হয় সে বিবরণ ধীরেন্দ্র ঝা এবং কৃষ্ণা ঝার লেখা অযোধ্যা: দ্য ডার্ক নাইট’ গ্রন্থ থেকে লেখক সুমিত মিত্র এভাবে পরিবেশন করেছেন :

“অযোধ্যা ২২ ডিসেম্বর ১৯৪৯। কনকনে শীতের রাতে রাম চবুতরা থেকে বেরিয়ে দু’জন বৈরাগী সাধু চলেছেন নিকটস্থ বাবরী মসজিদের দিকে। বাইরে কাকপক্ষী নেই। ‘মসজিদের গেটে একজন পাহারাদার থাকলেও তিনি নিদ্রামগ্ন।’

‘বাইরের দেওয়াল টপকে দুই সাধু অভিরাম ও বৃন্দাবন, মসজিদে হাজির।’

‘শব্দ শুনে মুয়াজ্জিন অবশ্য ছুটে এসেছিলেন, কিন্তু বৈরাগী সাধুরা অনেকেই মল্লবীর।’

‘গুটিকয়েক রদ্দার ঘা খেয়ে মুয়াজ্জিন বেপাত্তা।’

‘এবার অভিরামের ঝুলি থেকে বেরোল তাঁর ‘সম্পত্তি’। রামলালার (শিব রাম) মূর্তি। সঙ্গে আরও অনেক পূজার সামগ্রী। ভোর চারটে হতেই প্ল্যানমাফিক অভিরাম ও বৃন্দাবন শুরু করে দিল কাঁসা ও ঘণ্টার ধ্বনি।’

‘সবই পরিকল্পনা অনুযায়ী। মসজিদে বাজল ঘণ্টা ও শাঁখ, সঙ্গে সঙ্গে বাইরে হাজির শত শত মানুষ। সকলে হিন্দু! তাদের আগেই জানানো হয়েছিল, বাবরি মসজিদে ঘটতে চলেছে মিরাকল, ওখানে ওমুক সময়ে আবির্ভূত হবেন রামলালা!

অলৌকিক ঘটনা অবশ্য সব ধর্মেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু রামচন্দ্রের এই আবির্ভাবটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। কারণ, এরপর থেকেই শুরু হলো হিন্দু মহাসভার দাবি, বাবরি মসজিদের জায়গায় তৈরি হোক ‘রাম জন্মভূমি’।”

এরপর এক জায়গায় সাংবাদিক- লেখক সুমিত মিত্র লিখেছেন: “ধীরেন্দ্র ও কৃষ্ণা ঝা’র বইয়ে যথেষ্ট ইঙ্গিত আছে ২২ ডিসেম্বর ১৯৪৯ তারিখে অযোধ্যা ষড়যন্ত্রের মূলে ছিল (বিনায়ক দামোদর) সাভারকরের হাতে ছাপ। তবে স্থানীয় স্তরে অভিরাম দাসদের পরিচালিত করেছিলেন সে যুগের এক বর্ণময় হিন্দুত্ববাদী। তিনি দিগি¦জয় নাথ, হিন্দু মহাসভার সংযুক্ত প্রদেশ (পরবর্তীকালে, উত্তর প্রদেশ) প্রধান। তাছাড়া দিগি¦জয় নাথ ছিলেন গোরক্ষনাথ মঠের মোহান্ত।, উত্তর প্রদেশের বর্তমান বিতর্কিত মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের এক যুগ পূর্বে। 

‘দিগি¦জয়ই অভিরামকে পাঠিয়েছিলেন বাবরি মসজিদে।...

সাভারকর বুঝেছিলেন, ক্ষত্রিয়কুল থেকে দেবলোকে আসনপ্রাপ্ত রামচন্দ্র যেভাবে ভারতকে আন্দোলিত করতে পারবেন, তা অন্য কারও সাধ্যাতীত। 

‘সাভারকর প্রচুর সমর্থন পেয়েছিলেন প্রভাবশালী কয়েকজন কংগ্রেসির কাছ থেকে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী প-িত গোবিন্দ বল্লভ পন্থ একনাগাড়ে প্রধানমন্ত্রী প-িত জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে লড়েছেন, যাতে বাবরী মসজিদ থেকে রামের মূর্তিগুলো সরানো না হয়। বোঝা যায়, নেহরু তার নিজের দলের মধ্যে হিন্দুত্বের এই অনুপ্রবেশ দেখে মরমে মরে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তা নিরস্ত্র করা তার সাধ্যাতীত ছিল।’

‘এখন জীবনযাত্রা পালটেছে, বহু মানুষেরই রয়েছে গাড়ি, অনেক বাড়িতেই ইন্টারনেট, কিন্তু ধর্মকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার মনোবৃত্তি এখনও অনেকের নেই। না হলে কেমন করে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদীর মত একজন মানুষ, যার রাজনীতির মূলমন্ত্রই হল একটি বিশেষ ধর্মের প্রতি ঘৃণা?’

॥ তিন ॥

শ্রদ্ধেয় সুমিত মিত্র যেটাকে ‘হিন্দুত্ব’ বলেছেন, সেটা আসলে মুসলমানদেরকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসেবে শনাক্ত করে গড়ে  ওঠা  হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং মুসলমান সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তাকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত করে গড়ে ওঠা হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিত্ত্ব। আসলে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, ইহুদী, শিখ, জৈন, পার্সী প্রভৃতি কোনো ধর্মের মধ্যেই কিন্তু জাতীয়তাবাদ নেই। যেমন: জাতীয়তাবাদ নেই আরবী, উর্দূ, হিন্দি, বাংলা, সংস্কৃত প্রভৃতি কোনো ভাষার মধ্যে কিংবা সাদা বা কালো কোনো বর্ণের বা গায়ের রঙের মধ্যে অথবা কোনো বর্ণের বা গায়ের রঙের মধ্যে অথবা কোনো জায়গার মধ্যে। কিন্তু এগুলোর কোনো একটিকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদ দাঁড় করিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করলে তখনই হয় সমস্যা।

জাতীয়তাবাদ ধর্মভিত্তিক হোক, বর্ণ বা গায়ের রঙভিত্তিক হোক, ভাষাভিত্তিক হোক, কিংবা কোনো অঞ্চল বা আঞ্চলিকতা ভিত্তিক হোক, সব জাতীয়তাবাদই হয় মানসিকতার, মানবাধিকারের, মনুষ্যত্ববোধের, সততার, বিবেকের, ঔচিত্যবোধের, সভ্যতার, স্বাধিকারের সৌভাতৃত্ববোধের, সৌজন্যবোধের 

সামাজিক সাম্যের, অর্থনৈতিক সাম্যের এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিপন্থী কেবল নয়, শান্তি ও গণতন্ত্রেরও পরিপন্থী।

॥ চার ॥

জাতীয়তাবাদ ধর্মভিত্তিক হোক, বর্ণ বা গায়ের রঙভিত্তিক হোক, ভাষাভিত্তিক হোক, কিংবা অঞ্চল বা আঞ্চলিকতাভিত্তিক, সব ধরনের জাতীয়তাবাদেই যেহেতু কোনো জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু শনাক্ত করতে হয়; কোনো জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত না করলে জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানো যায় না, তুঙ্গে ওঠানো তো অনেক দূরের কথা, সে কারণে ডাহা মিথ্যার অশ্রয় নিয়ে বা মিথ্যার বেসাতি করে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত জনগোষ্ঠীর ইতিহাস মিথ্যার ও অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়ে বিকৃত করে দেখানোর একটা অপরিহার্য খারাপ কাজও করতে হয় জাতীয়তাবাদীদের।

ক্রুসেডের চেতনাসম্পন্ন সা¤্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ইংরেজী ভাষী শে^তাঙ্গ খ্রীস্টান জাতীয়তাবাদী বণিকরা ক্রুসেডের চিন্তা-চেতনা নিয়ে এ দেশে এসে বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার বেধাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের সমাজপতিদের এবং জাতীয়বাদী মহলকে ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে দীক্ষিত করে তাদের সহযোগী সমাজ হিসাবে গ্রহণ করে শাসন ক্ষমতায় আরোহনের প্রয়োজনে ১৭৫৭-এর ২৩শে জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসন মঞ্চস্থ করেছিলেন এবং এরপর একশ’ নব্বই বছর যাবত ভাগ করো এবং শাসন করো নীতিতে শাসন করেছিলেন। ক্রুসেডের চেতনাসম্পন্ন খ্রীস্টান জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতেই ভাগ করো ও শাসন করো নীতিতে সহযোগী মনুসংহিতার সমাজের জাতীয়তাবাদী মহলকে সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে একচেটিয়াভাবে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে এগিয়ে দিয়েছেন।

অন্যদিকে ক্রুসেডের চেতানসম্পন্ন খ্রীস্টান জাতীয়তাবাদী মহলের এবং মনুসংহিতার সমাজের জাতীয়তাবদাী মহলের এ উভয় জাতীয়তাবাদী মহলের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত সমাজহীন মুসলমান সমাজকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত করে পিছিয়ে দিতে হতদরিদ্র, অশিক্ষিত, অসচেতন, অসংগঠিত এবং পুরোপুরি সমাজীহন মুসলমান সমাজে পরিণত করে দিয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য করেছেন। এই ইতিহাসটা ১৭৫৭-র ২৩শে জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের সময় থেকে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টের বিভাজনের সময় পর্যন্ত একশ’ নব্বই বছরের ইতিহাস ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্টে সৃষ্ট মুসলিম প্রধান দেশ পাকিস্তানেও ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পড়ানো হয়নি। ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট থেকে ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত খোদ পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এম.এ. ক্লাসে মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত অছ্যুৎ করে রাখার অংশ হিসাবে নজরুল সাহিত্যকেও অবশ্য পাঠ্য করা হয়নি। অবশ্য পাঠ্য করা হয়েছে কেবল হিন্দু সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক হিন্দু জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত। শ্রীকৃষ্ণ, কীর্তন এবং বৈষ্ণব পদাবলীও অবশ্য পাঠ্য করা হয়েছে। অছ্যুৎ করে রাখা হয়েছে কেবল মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত। এটা কেন হয়েছে এবং কীভাবে হয়েছে সেটা এক গবেষণার বিষয়। এই ঘটনা থেকেও এটা স্পষ্ট যে, ১৭৫৭-র ২৩শে জুন থেকে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত একশ’ নব্বই বছর যাবত মানবেতর জীবন যাপন করার ফলে হতদরিদ্র, অশিক্ষিত, অসচেতন ও অসংগঠিত একটা সমাজহীন মুসলমান সমাজের মুসলমান হিসাবে একটা মুসলিম প্রধান দেশকে আমরা উপযুক্ত মর্যাদায় ধারণ করতে পারিনি। এটাই কঠিন সত্য কথা!

॥ পাঁচ ॥ 

ক্রুসেডের চেতনাসম্পন্ন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ইংরেজী ভাষী শ্বেতাঙ্গ খ্রীস্টান জাতীয়তাবাদী বণিকরা মুসলিম শাসনামলের ইতিহাস বিকৃত করে দেখতে শিখিয়ে বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজে একটা জাতীয়তাবাদী মহল সৃষ্টি করে দিয়ে তাদেরকে সহযোগী সমাজ হিসাবে গ্রহণ করে তাদের মাধ্যমে ১৭৫৭-র ২৩ শে জুন পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসন মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করেছিলেন। কার্যত এই সহযোগী সমাজকেই সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে একশ’ নব্বই বছর যাবত একচেটিয়াভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে সমস্ত ক্ষেত্রে এগিয়ে দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে সমাজহীন মুসলমান সমাজকে তাদের ঔপনিবেশিক শাসনামলের ও জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষ শত্রু হিসাবে শনাক্ত করে সম্মানজনক জীবিকার্জনের ও সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত করে সমস্ত ক্ষেত্রে পিছিয়ে দিয়ে হতদরিদ্র, অশিক্ষিত, অসচেতন, অসংগঠিত, লক্ষ্যভ্রষ্ট ও লক্ষ্যহীন  অদূরদর্শী ও অপরিনামদর্শী একটা সমাজহীন সমাজের মানবেতর জীবে পরিণত করে দিয়েছিলেন। ১৭৫৭-র ২৩শে জুনের প্রায় অব্যবহিত পর থেকে প্রথম একশ’ বছর শাসন ক্ষমতাহীন, চাকরী-বাকরীহীন, বিষয়-সম্পত্তিহীন, অপরিণামদর্শী মুসলমানরা এককভাবে ব্যর্থ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছেন। ১৮৫৭-৫৮-র সিপাহী বিদ্রোহ নামে অভিহিত সর্বভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধে মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাঙলার মহারাষ্ট্রের ও পাঞ্জাবের এবং রাজস্থানের হিন্দুরাও গুর্খারা এটাকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে অংশগ্রহণ করেননি। শিখরাও এটাকে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টভঙ্গিতে দেখে অংশগ্রহণ করেননি। রাজস্থানের হিন্দুরা বরং ওই সময়ে মুসলমানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন এবং মসজিদ ভেঙেছেন! ক্রুসেডের চেতানসম্পন্ন সা¤্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ইংরেজী ভাষী খ্রীষ্টান বণিকদের সমাজের জাতীয়তাবাদী মহল ইতোমধ্যেই এইসব অমুসলিমদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মহল সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। 

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ধমক থেকে, বিশেষ করে ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিক থেকে ক্রুসেডের চেতনাসম্পন্ন খ্রীস্টান সমাজের জাতীয়তাবাদী মহল পাঠ্যপুস্তক ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে এবং পাঠ্যপুস্তককে কেবল হিন্দু ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু ধর্মীয় এবং হিন্দু জাতিসত্তা ঘেঁষা করে হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত্ব সৃষ্টির ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। এভাবেই জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস গ্রন্থ প্রণয়ন করতে, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করতে এবং সাহিত্য সৃষ্টি করতে, টক ও কাব্য রচনা করতে এবং সাংবাদিকতা করতে শিখিয়েছেন।

হিন্দুরা এইভাবে তৈরি হয়ে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতেই ১৮৮৫ খ্রীস্টাব্দে সৃষ্ট ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

অন্যদিকে মুসলমানরা ১৭৫৭-র ২৩ শে জুন থেকে ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত সোয়াশ’ বছর কেবল নয়, ১৮৯০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত ১৩৩ বছর যাবৎ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছেন। মূলত ঊনবিংশ শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে মুসলমান সমাজ ইংরেজদের প্রবর্তিত শিক্ষা গ্রহণ করে শাসন ক্ষমতায় শরীক হওয়ার কথা চিন্তা করেছেন। আর এটা প্রতিরোধ করতেই হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতি তত্ত্ব আরোপকামী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইংরেজ ও মুসলিম উৎখাতকামী আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠন মহারাষ্ট্রের গুপ্ত সমিতি (১৮৯৪), মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাঙলায় “অনুশীলন সমিতি” (১৯০২), “যুগান্তর দল” (১৯০২), বরিশালে “স্বদেশ বান্ধব সমিতি”, ফরিদপুরে “ব্রতী সমিতি” ময়মনসিংহে “সুহৃদ সমিতি”, “সাধনা সমাজ”, মহারাষ্ট্রে, “অভিনব ভারত” (১৯০৪) প্রভৃতি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এদের একটা অংশ ১৯১০-এর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ২৬ থেকে ২৯ তারিখে এলাহাবাদে স্যার উইলিয়াম ওয়েডার বার্নের সভাতিত্বে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ২৫তম অধিবেশনে সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় এবং ভূপেন্দ্রনাথ বসুর প্রস্তাবক্রমে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসেরই একটা অংশ নিয়ে গঠিত নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভায় ঢুকেছেন, একটা অংশ বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের প্রথম ভাগে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে ঢুকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দখল করেছেন, একটা অংশ অনুশীলন সমিতির সভ্য এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য ও কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তার কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের নেতৃত্বে ১৯২৫ খ্রীস্টাব্দের বিজয়া দশমীর দিন নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ (আর.এস.এস.) প্রতিষ্ঠা করেছেন।

একটা অংশ বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে ঢুকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দখল করেছেন, একটা অংশ ১৯৩৯-এর ৩রা মে গঠিত নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকে ঢুকে ফরওয়ার্ড ব্লক দখল করেছেন, একটা অংশ ১৯৪০ খ্রীস্টাব্দে রেভুলিউশনারী  সোশ্যালিস্ট পার্টি (আর.এস.পি.) গঠন করেছেন, একটা অংশ ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্টের পর অনুশীলন সমিতির সভ্য মনি সিংহের নেতৃত্বে পূর্বপাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্ট গঠন করেছেন, একাংশ অনুশীলন সমিতির সভ্য মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে পূর্বপাকিস্তান সোশ্যালিস্ট পার্টি গঠন করেছেন। এভাবে কালক্রমে তামাম ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত্ব কায়েম করতে পথ প্রশস্ত করার কাজটা নিশ্চিত করা হয়েছে।

॥ ছয় ॥

১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্টে মুসলিম প্রধান অবিভক্ত পাঞ্জাব, মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাঙলা এবং মুসলিম প্রধান অবিভক্ত আসাম ভাগ করে ব্রিটিশ ভারতের বিশ শতাংশ জায়গা নিয়ে, ভারতীয় উপমহাদেশের দশ শতাংশ জায়গা নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে গঠিত মুসলিম প্রধান দেশে ভারতের জতীয় কংগ্রেসে, পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির, পাকিস্তান সোশ্যালিস্ট পার্টির, পূর্বপাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির, পূর্বপাকিস্তান সোশ্যালিস্ট পার্টির “গুপ্ত সমিতি” (১৮৯৪)-র, “অনুশীলন সমিতি” (১৯০২)-র, “যুগান্তর দল” (১৯০২)-এর “স্বদেশ বান্ধব সমিতি”-র “ব্রতী সমিতি”-র “সুহৃদ সমিতি”-র, “সধনা সমাজ”-এর “অভিনব ভারত”- (১৯০৪)-এর সভ্যদের প্রভাবে যে সব ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের এবং অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়েছিল সেইসব জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্টে সৃষ্ট এই মুসলিম প্রধান দেশের অন্যান্য ভাষাভাষী প্রধান মুসলিম প্রধান প্রদেশের মুসলমানদেরকে, মুসলিম উম্মার ঐক্য ও সংহতিকে এবং মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তাকে, মুসলিম প্রধান দেশের এই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তবাদ ষ্পষ্টতই হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক এক জাতিতত্ত্বের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে আসছে।

॥ সাত ॥

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম প্রধান দেশের মুসলমান ঘরের যেসব সন্তান মুসিলম প্রধান দেশের পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে কথা বলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে এবং জাতীয় স্বার্থে ভারতের সব রাজনৈতিক দল একই রকম বক্তব্য পেশ করেন। কিন্তু ভারতীয় উপমাহাদেশের আমাদের এই মুসলিম প্রধান দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দল জাতীয় স্বার্থে একমত হতে পারেন না!

এর কারণ কী?

এর জবাব অতি সংক্ষেপে খুব সহজভাবে দিতে হলে বলা দরকার যে, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের অর্থাৎ আর্য বংশোদ্ভূত বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের একটা সংঘটিত জাতীয়তাবাদী সমাজ আছে। আর স্বাধীন ভারত হলো এই জাতীয়তাবাদী সমাজ প্রধান রাষ্ট্র। এই সমাজ প্রধান স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের নীচে আছে ভারতের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং শাসন বিভাগ।

এই বাপারটা একটু তুল্য করে বোঝাতে হলে খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা দরকার যে, অন্তত এই ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজহীন মুসলমান সমাজের কোনো সমাজ নেই। তাই এই সমাজহীন মুসলমান সমাজের অবস্থান ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম প্রধান দেশের আইন বিভাগের, বিচার বিভাগের এবং শাসন বিভাগের নীচে।

এই কঠিন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এই সত্যটা উপলব্ধি করার প্রয়োজন আছে যে, কোনো রাষ্ট্র যদি জাতীয়তাবাদী সমাজ প্রধান রাষ্ট্র হয় তা হলে সেই দেশের আইন বিভাগের, বিচার বিভাগের এবং শাসন বিভাগের অবস্থান বাধ্যতামূলকভাবেই হয় জাতীয়তাবাদী সমাজের নীচে। সেই বাস্তবতার কারণে স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের আইন বিভাগের, বিচার বিভাগের এবং শাসন বিভাগের অবস্থান আর্য বংশোদ্ভূত বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত্ব আরোপকামী জাতীয়তাবাদী মহলের অধীনে।

অন্যদিকে ইতোপূর্বেই আমি দেখিয়েছি যে, ডানপন্থী এবং বামপন্থী নির্বিশেষে ভারতের নরম জাতীয়তাবাদী ও নরম একজাতিতত্ত্ব আরোপকামী- নির্বিশেষে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো গড়ে উঠেছে এবং কাজ করে আসছে আর্য বংশোদ্ভূত বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের জাতীয়তাবাদী মহলের অধীনে এবং তত্ত্বাবধানে। ফলে গোঁড়া ব্রাহ্মণরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ (আর.এস.এস.) এবং এর শাখা সংগঠন বিশ^হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, দুর্গা বাহিনী, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, ধর্ম রক্ষা সমিতি, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, বিদ্যা ভারতী, রাম সেনা, ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ, হিন্দু সেনা, ধর্ম সেনা, আরোগ্য ভারতী, হিন্দু যুব বাহিনী, স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ, হনুমান সেনা, হিন্দু একতা মঞ্চ, রাজপুত কর্নী সেনা, ইউনাইটেড হিন্দু ফ্রন্ট, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ (আর.এস.এস.)-এর রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টি এবং আর এক চরমপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন শিব সেনার ও নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভার তত্ত্বাবধান করেন।

আর এক দিকে আর্য বংশোদ্ভূত বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের জাতীয়তাবাদী মহলের তরফেই প্রগতিশীল ব্রাহ্মণরা তত্ত্বাবধান করেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী), ফরোয়ার্ড ব্লক, ফরোয়ার্ড ব্লক (মার্কসবাদী), রেভুলিউশনারী সোশ্যালিস্ট পার্টি (আর.এস.পি) প্রভৃতি রাজনৈতিক সংগঠন।

যেহেতু এক সময় বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের জাতীয়তাবাদী মহলের ছাত্রছায়ায় ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোসকতায় মহারাষ্ট্রে “গুপ্ত সমিতি”  (১৮৯৪), অবিভক্ত মুসলিম প্রধান বাঙলার “অনুশীলন সমিতি” (১৯০২) ও “যুগান্তর দল” (১৯০২), বলিশালে “স্বদেশ বান্ধব সমিতি”, ফরিদপুরে “ব্রতী সমিতি”, ময়মনসিংহে “সুহৃদ সমিতি” ও “সাধনা সমাজ”, মহারাষ্ট্রে অভিনব ভারত” (১৯০৪) আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনগুলো গড়ে উঠেছিল সে কারণে এদেরই একটা অংশ নিয়ে “অনুশীল সমিথি” (১৯০২)-র সভ্য মনি সিংহের নেতৃত্বে গঠিত “পূর্বপাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি এবং অনুশীলন সমিতির সভ্য মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে গঠিত পূর্বপাকিস্তান সোশ্যালিস্ট পার্টিও কার্যত প্রগতিশীল ব্রাহ্মণদেরই তত্ত্বাবধানে ছিল।

মোগল স¤্রাট বাবরের সময় প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদকে কীভাবে রামমন্দির বলে দেগে দেয়া হলো এবং তার বিচারের রায়ে মসজিদ এলাকাটাই কীভাবে মুসলমানদের হাত থেকে চলে গেল, সমাজতন্ত্রের আন্দোলন কীভাবে জাতীয়তাবাদের আন্দোলনে পর্যবসিত হতে পারলো এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম প্রধান দেশে ১৭৫৭-র ২৩শে জুন থেকে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্ট, এই একশ’ নব্বই বছরের ইতিহাস কেন চর্চা হয় না। 

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসিলম প্রধান দেশেও মুসলিম সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্ত্বা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য-সঙ্গীত কেন স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির পাঠ্য তালিকায় উপযুক্ত মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত হয় না, এসব নিয়ে কেবল আলোচনা এবং আন্দোলন নয়, ব্যাপকভাবে গবেষণাও হওয়ার দরকার এ দেশের গণমানুষের স্বার্থেই। আর অতীত দিনের রাজনীতিকে এখনকার রাজনীতির শ্লোগানের ফ্রেমে ফেলে মাফতে যায়াটাও ঠিক হবে না।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ