বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

৫ বছরেও গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মেলেনি

স্টাফ রিপোর্টার : গত পাঁচ বছরে দেশে নতুন করে কোনো গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুরাতন কূপগুলো থেকে গ্যাস পাওয়ার জন্য ফের অনুসন্ধান চালানো সিদ্ধান্তও নিয়েছে বাপেক্স। অদূর ভবিষ্যতে গ্যাসের প্রাপ্ততা নিয়ে এখন থেকেই আশংকার কথা জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। ফলে গ্যাস নিয়ে নতুন কোন সুখবর নেই। চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানী বাড়ানোর জন্য এখন থেকেই এধরনে আশাংকা জানাচ্ছে সরকার এমনটাই মনে করেছে সাধারণ গ্রাহকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে সামনে পুরোপুরি উচ্চমূল্যের জ্বালানিনির্ভর হয়ে পড়বে দেশ। বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দাম বেড়ে যাবে সার ও অন্যান্য শিল্পজাত পণ্যের। বাড়বে সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ব্যয়। ফলে দেশের শিল্প খাত অচলাবস্থায় পড়ে যাবে। বঙ্গোপসাগরে এখন বাংলাদেশের ২৬টি ব্লক রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি অগভীর ও ১৩টি গভীর সমুদ্রে রয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকারের তথ্য বলছে, বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাসের মজুদ আছে, তা দিয়ে সর্বোচ্চ ১১ বছর চলতে পারে। গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে গেলে পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোনো ধরনের ভবিষ্যৎ ব্যবসা পরিকল্পনাই নেই রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের। ফলে গ্যাস না পেলে তিতাসের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এখনই।
সূত্র জানায়, পেট্রোবাংলার অধীন দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মধ্যেও সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান তিতাস। দেশের বিতরণকৃত মোট গ্যাসের ৫৬ দশমিক ১৭ শতাংশই বিতরণ হয় তিতাসের মাধ্যমে।
তিতাসের গত পাঁচ বছরের গ্যাস কেনার পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে কোম্পানিটির গ্যাসপ্রাপ্তির পরিমাণ বেড়েছে সামান্যই। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তিতাসের গ্যাস কেনার পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৪৯ মিলিয়ন ঘনমিটার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়ে ১৭ হাজার ৪৪ মিলিয়ন ঘনমিটারে দাঁড়ায়। বিতরণ কোম্পানিটির গ্যাস কেনার পরিমাণ কিছুটা বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ১৭ হাজার ২৩৬ মিলিয়ন ঘনমিটার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তিতাসের গ্যাস কেনার পরিমাণ কিছুটা কমে ১৭ হাজার ১৫৪ মিলিয়ন ঘনমিটারে দাঁড়ায়। আর সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কোম্পানিটির গ্যাস কেনার পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৫৭২ মিলিয়ন ঘনমিটার।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী মো. আল-মামুন বলেন, জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন ঘাটতি থাকায় আমরা চাহিদা অনুসারে গ্যাস পাচ্ছি না। প্রতি বছর আমাদের গ্যাস কেনার পরিমাণ বাড়লেও সেটি খুবই যৎসামান্য। ভবিষ্যতে স্থানীয় উৎস থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া না গেলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য আমাদের কোনো ধরনের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নেই। এক্ষেত্রে আমরা পেট্রোবাংলাকে অনুসরণ করি। তাদেরই এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোম্পানিগুলোর কী করণীয়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। অবশ্য দেশের সামুদ্রিক ব্লক থেকে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চলছে। সেখানে নতুন গ্যাস পাওয়া গেলে তখন সংকট কেটে যাবে বলে মনে করছেন তিনি।
তিতাসের এমডি নতুন গ্যাস পাওয়ার আশা করলেও বাস্তবতা হচ্ছে, গত কয়েক বছরে দেশে গ্যাসের বড় কোনো মজুদ পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ২০১৪ সালের জুনে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। এরপর আর কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের তথ্য পাওয়া যায়নি। অথচ এর বিপরীতে দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। গত কয়েক বছর দেশে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ থাকলেও এখন আবার এলএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের জ্বালানি চাহিদা আমদানি করেই মেটাতে হবে। ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হলেও তা বর্ধিত চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। বাপেক্সকে দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। তবে সেটিরও সুফল পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, কূপ খনন করলেই গ্যাস পাওয়া যাবে, তা তো কথা না। গ্যাস পাওয়ার চান্স হলো ১০ থেকে ২০ শতাংশ। একটা কূপ খনন করলে ১৬ মিলিয়ন ডলার লাগে। গ্যাস না পেলে ১৬ মিলিয়ন ডলার শেষ। বলা হয়, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে, কিন্তু সে রকম না। ছোট ছোট পকেট বাংলাদেশের, বড় পকেট নেই। আমরা এখনো দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাস বাংলাদেশ থেকেই পাচ্ছি। আমদানিনির্ভর উৎস থেকে পাচ্ছি এক হাজার এমএমসিএফ। আমাদের আরো গ্যাস লাগবে ভবিষ্যতে।
জাইকা সমীক্ষা বলছে, ২০২০ সালে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট। তখন উৎপাদন থাকবে দৈনিক ২ হাজার ৫৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৫ সালে দৈনিক ৩ হাজার ৮১ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন দাঁড়াবে ১ হাজার ৭৪১ মিলিয়ন ঘনফুটে। ২০৩০ সালে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন আরো কমে ১ হাজার ৬৭১ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়াবে, যেখানে এর বিপরীতে চাহিদা থাকবে ৩ হাজার ৮১০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০৩৫ সালে দেশে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বেড়ে ২ হাজার ১০৪ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়াবে আর এর বিপরীতে চাহিদা থাকবে ৪ হাজার ৯৮১ মিলিয়ন ঘনফুট। আর ২০৪০ সালে দৈনিক ১ হাজার ৯৯৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের বিপরীতে চাহিদা দাঁড়াবে ৫ হাজার ৮৩৭ মিলিয়ন ঘনফুটে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, গ্যাসের বর্ধিত চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানি করতে হবে। এখন এলএনজি আমদানির ক্ষমতা রয়েছে সর্বোচ্চ এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বাইরে আরো ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানির অবকাঠামো নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করছে সরকার।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান বলেন, দেশে হঠাৎ করেই যে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে যাবে এমন নয়। এটি ধীরে ধীরে হবে। পাশাপাশি এ সময়ের মধ্যে নতুন নতুন ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রমও চলবে। এই যেমন আমরা ৮, ৯ ও ১১ নম্বর ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চালাচ্ছি। আমরা খুবই আশাবাদী যে এগুলো থেকে গ্যাস পাব। পাশাপাশি সামুদ্রিক ব্লকগুলোতেও অনুসন্ধান চলছে। সেখানেও গ্যাস পাওয়া যাবে। তাছাড়া বর্তমানে গ্যাসের যে ঘাটতি রয়েছে, সেটি এলএনজির মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ঘাটতি অনেকখানি মিটে গেছে। এক-দুই মাসের মধ্যেই আমাদের এলএনজি সাপ্লাই লাইনের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে। তখন বিতরণ কোম্পানিগুলো আরো বেশি গ্যাস পাবে। ফলে একদিকে যেমন গ্যাসের বিদ্যমান মজুদ কমছে, আরেকদিকে আমরা বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস এনে চাহিদা পূরণ করছি। তাই ভবিষ্যতে তেমন কোনো আশঙ্কা দেখছি না আমি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ