শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

একটি ইঁদুরের গল্প

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন : তখন গভীর রাত। তাহমিনা চিৎকার কেঁদে ওঠলো-মাগো, মা, মা, গো মা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো “মা আমাকে কিসে জানি কামড়াই দিছে”। তাড়াতাড়ি আসোনা। বলতে বলতে কাঁদছে আর কাঁদছে। পাশে শোয়া দাদু তাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলেও সে মাকেই ডাকছে। মা অচেতন ঘুমের ঘরে চিৎকার করে বলে ওঠলো, আহারে! কি কয় আমার তামুর কি হলো? আল্লাহ কি কয়রে তামু’ বলে জোরে জোরে চিৎকার করতে করতে বাবার রুম থেকে বেরিয়ে তাহমিনার খাটের কাছে এসে লাইট জ্বালিয়ে দেখলো সে ও তার দাদু বসে পা টিপে ধরে আছে। ওমা, ঠিকইতো তাহমিনার পায়ের আঙ্গুলে কামড়ের দাগ। হালকা রক্তও বের হচ্ছে, ইস মা তো ভয়ে এন্তজার। কি সাপে কামড়ালো না কি পোকা মাকড়!

এমনিতে টিনের ঘর, ঘরের চারপাশে গাছ-গাছালী। কি যে করা এখন গভীর রাত হলেও তাহমিনার, তার মায়ের এবং শেষ তার দাদীর চেঁচামেচিতে ততক্ষণে বাড়ির সবাই জড়ো হয়ে গেছে। কেউ বলছে ডাক্তার ডাকো, কেউ বলছে রিফুজি লতার রসা দাও, কেউ বললো মরিচের গুঁড়া দাও, কেউ বললো হাসপাতালে নিয়ে চলো। এভাবে একেক জনের একেক মন্তব্য চলছে।

তাহমিনার বাবা ভালো করে দেখে আপাতত শান্তনা দিতে বললো ধুত কিচ্ছু হয়নি, সাধারণ কোনো পোকা না হয় ইঁদুরই হবে। সাপের কামড়ে দাঁত চারটা থাকে, এখানে কোনো দাঁতের চিহ্ন নেই। আর বিষ ব্যথাও কম, এটা কোনো ব্যপার না। এ কথা শুনে তাহমিনার মা রেগে মেগে বললেন- তোমার কাছে কোনো ব্যপারই না, কিন্তু মাইয়্যাটা আমার শেষ হয়ে গেছে। কে জানে কি থেকে কি হয়? কে কাকে থামায়? তাহমিনার দাদী বললো সারা ঘর ভালো করে দেখ্ কিছু জন্তু টন্তু পাওয়া যায় কিনা, তাহলে বুঝা যাবে কি ঘটেছে। সবাই মিলে সারা ঘর তন্ন তন্ন করে দেখছে আর সোরগোল করছে। ঘরের মাচার উপর -নিচ, কাঠের আলমিরার কোনে, উপরে মাচাং এর পাশে, মোরগের খোয়াড়ে এমন কি ঘরের বাইরেও সব জায়গায় খুঁজে কিছু না পেয়ে এবার এসে মশারী ধরে টান দিতেই বিড়ালের মতো করে লাফ দিয়ে সবার সামনেই বেরিয়ে গেল আস্ত বিরাট এক ইঁদুর। সবাই চিৎকার করে ওঠলো- ধর ধর। বললেই কি আর ধরা যায়, খুঁজেও পায়নি? মানুষ যখন দুশ্চিন্তায় মগ্ন থাকে তখন সহজ বুদ্ধিও হাতছাড়া হয়ে যায়।

সেই দিন থেকে ইঁদুর দেখলে বা ইঁদুরের নাম শুনলেই আঁতকে ওঠে তাহমিনা। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যায়। মশারীর রশি পায়ে আটকে ছিলো একদিন। তাতেই তার কি চিৎকার! তার পা নাকি ইঁদুর কামড়ে ধরেছে। আরেক রাত পড়তে পড়তে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছিলো। রাত তার পেন্সিলের মাথাটা পায়ে লাগার সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে ওঠলো। পরে লাইট জ্বালিয়ে দেখা গেলো তার পায়ের সাথে পেন্সিলের চিকন মাথার গুতো লেগেছে। বিশেষ করে সেই রাতে যেখানে তাকে ইঁদুর কামড়ে দিয়েছিলো, সেই কামড়ের চিহ্ন এখনো বহাল আছে।

এখন সে রাতে একা পড়তেও বসে না। টেবিলের ওপাশ থেকে যদি ইঁদুরটা এসে কামড়ে দেয় আবার! আরে বাপরে, ইয়া বড় ইঁদুর! সে আর কখনো দেখেনি। তাহমিনা এবার থ্রী ক্লাসে । ছাত্রী হিসেবেও ভালো। বাবা মায়ের অনেক দোয়ার ফল এই একমাত্র মেয়ে। বেশ চুপচাপ থাকে, দাদুই একমাত্র সঙ্গী। দাদু হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার গল্প বলে ছড়া কাটে, মজার মজার পিঠা খাওয়ায়। দাদুরও একমাত্র সঙ্গী তাহমিনা। তাই ইঁদুরের বিষয়টি নিয়ে তাহমিনার দাদুর চিন্তা আরো বেশি। তিনি আগের কালের একটু শিক্ষিত। তাই ইঁদুর বিষয়ে গবেষণার শেষ নেই- ইঁদুরের সাইজ হতে পারে বড় জোর তিন বা চার ইঞ্চি, কিন্তু সাড়ে আট বা দশ ইঞ্চিতে হওয়া অসম্ভব। আমাদের দেশে ধানক্ষেতের আলে গর্ত করা সেই ইঁদুরগুলো বেশ বড়ই দেখা যায় কিন্তু ঘরের ইঁদুরতো এতো বড় হয় না?

ইঁদুরের বংশ যে দেশেরই হোক এ দেশে এ ঘরেই আসলো কিভাবে? এই ইঁদুর তাহমিনাকে কামড়িয়েছে তার কতো বড়ো সাহস। এর আগে সে তামুর বই কেটেছে, ঈদের জামা কেটেছে, লেপ তোষক যে কতো কেটেছে তার হিসেব নেই। সে ঐ রাতে রাগে ফুঁসে ওঠে বলেছিলো-ইঁদুর, তোরে আমি খাইছি, তোরে দেখামু মজা। তখন তার বাবা তাকে কোলে নিয়ে শান্তনা দিতে দিতে বলে ছিলেন আজ থেকে আমি আর তুমি ইঁদুরকে এই ঘর থেকে তাড়াবো- ঠিক আছে? তাহমিনা বলেছিলো- হ্যাঁ আব্বু আজ থেকে যখনই সুযোগ পাবো তাদের পিটিয়ে পিটিয়ে শেষ করবো। বাবা বলেছিলেন-না, পিটাতে পারবে না কারণ তারা লুকিয়ে থাকে। বরং কৌশলে ধরতে হবে। এক ধরনের ইঁদুর মারার মেশিন আছে সেটা নিয়ে আসবো, তুমি শোয়ার আগে একটি বিস্কুট বসিয়ে দিলে যখনই ইঁদুর এসে বিস্কুট খেতে ঢুঁ মারবে ওমনি জায়গায় খতম হয়ে যাবে। 

তাহমিনা বললো-না না, আব্বু ও মারা গেলেতো আমি কাউকে দেখাতে পারবো না। খেলতেও পারবো না। তাকে জীবিত রাখতে হবে তাহলে মজা করে কামড়ানোর শিক্ষা দিতে পারবো। তামুর বাবা হেসে ওঠে বললো, হুম তারও একটা উপায় আছে। কাল বাজার থেকে সেই যন্ত্রটাই নিয়ে আসবো, দেখবে মজা।

বাপ বেটি এবার একটু হাসলো, ঘরেও সোরগোল কমলো। এবার তামুর মা তামুকে মলমের কৌটা থেকে একটু মলম নিয়ে ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দিলো। তারপর সে দিনকার মতো তামু তার দাদুর কোলের মাঝখানে শুয়ে পড়লো। দাদু ছড়া কাটলো- 

“কাটুস কুটুস কাটলি ইঁদুর দাদু মনির পা,

আর কাটিস না আর কাটিস না দূর যা দূর যা”।

তাহমিনা সকালে উঠে আবার চিৎকার শুরু করলো আব্বু আব্বু, আমি অনেকগুলো ইঁদুর ধরে ফেলবো। মা বাবা দু'জনেই শান্তনা দিয়ে বললো ঠিক আছে, ঠিক আছে। তামুর দাদু তামুকে বললো যদি তুমি দুতিনটি ইঁদুর মারতে পারো তাহলে তোমার পুরস্কার আছে। সে বললো দাদু দেখিও আমি অনেকগুলো ইঁদুর ধরতে পারবো।

পরদিন তার বাবা ইঁদুর নিধনের ওষুধ আনলো। কিন্তু দিনের পর দিন যাচ্ছে কোনো ইঁদুর মরছে না। প্রতিদিন সকালে সে ইঁদুর ধরার খাঁচা পরীক্ষা করে কিন্তু একটি ইঁদুরও দেখতে পায় না। অনেকটা নিরাশ হয়ে পড়েছে। একদিন সকালে তাহমিনার মতিগতি দেখে তার বাবা আদর করতে করতে বললেন, তুমি ভেবো না আজ অন্য এক ধরনের খাঁচা নিয়ে আসবো। আর সেটাতে ইঁদুর বেটা ধরা খাবেই। তাহমিনা প্রশ্ন করলো সেটা কেমন বাবা? বাবা উত্তরে বললো, সেটা তারের মতো শক্ত চারকোনা বিশিষ্ট একটি খাঁচা। মুখটা খুব সহজে আটকানো যায়। আর ভেতরে বিস্কুট বা শুকটি লাগানোর জন্য একটি ছোট শিক থাকে। সেখানে খাদ্য লাগিয়ে রাতে কোথাও বিছিয়ে রাখলে ইঁদুর বেটা সেটি খাওয়ার জন্য মুখ লাগালেই দরজাটায় টান পড়ে বন্ধ হয়ে যাবে। বেটা আর বের হতে পারবে না। মানুষের মধ্যেও অতি চালাকরা অন্যের ক্ষতি করে মনে করে সে বেঁচে গেছে, কিন্তু এভাবেই একদিন না একদিন ধরা পড়েই। তামু হেসে বললো ঠিক আছে। রাতে আমিসহ খাঁচাটা বসিয়ে দেবো। এই বলে তামুর বাবা চলে গেলো। 

সারাদিন সে কতো কল্পনা করে সময় পার করেছে তার শেষ নেই। কতবার মাকে বলেছে রাত হয়না কেন? বাবা কখন আসবে। এভাবে রাত এলো আর রাতে বাবা ফিরে এলেন। রাতে বাবার ডাক শুনেই তাহমিনা দৌড় দিলো-আব্বু খাঁচা নিয়ে এসেছো? তাহমিনা দেখলো ছোট্ট একটি খাঁচা হয়তো লম্বায় এক ফিট, আর প্রশস্ততায় পাঁচ ইঞ্চি হবে। খাঁচার ভেতরে বেশ বড় জায়গা। কয়েকটা ইঁদুর থাকতে পারবে। তাহমিনা মনে মনে ভাবে একসাথে অনেকগুলো ইঁদুর ধরা যাবে।

তারা দুজনে মিলে ভাবলো-অন্য জায়গায় খাঁচাটা বসিয়ে দেখা যাক সেই ইঁদুরটি ধরা যায় কিনা? ঠিক মতো বাবা মেয়ে দেখে শুনে খাঁচার ভেতরের ছোট শিকটাতে একটি সুগন্ধি বিস্কুট লাগিয়ে দিলো। আর ইঁদুর মাচার যেখানে লাফালাফি বেশি করে সেখানেই খাঁচাটা বসিয়ে দিলো। তাহমিনা আবারো অনেক বিশ্বাস নিয়ে বললো- আব্বু, দেখবা এবার ঠিকই অনেকগুলো ইঁদুর ধরা পড়বে। 

কথার ভিতর দিয়ে দাদু তার রুম থেকে বললো-আচ্ছা, তুমি কেমনে বলো অনেকগুলো ইঁদুর ধরে ফেলবে? তাহমিনা বললো-দাদু আমি স্বপ্নে দেখেছি। দাদু হাসতে হাসতে বললো ও তাই নাকি? আচ্ছা দেখা যাক। তবে ছোটদের স্বপ্ন কিন্তু সত্যি হয়ে যায়। তাহমিনা আরো লাফিয়ে ওঠার মতো করে বললো-সত্যি নাকি দাদু? তাহলেতো মজা হবে মজা। দাদী বললেন,দাদু মনি শুনো কারো কোনো ইচ্ছা যদি পূরণ করতে হয় তাহলে নামায পড়ে দোয়া করতে হয়। আজ রাতে আমার সাথে নামায পড়ে দোয়া করো, দেখবে ইঁদুর তোমার খাঁচায় ধরা পড়বেই। নামাযের পর তাহমিনা দোয়া করলো-আমি সেই ইঁদুরটি চাই যে আমাকে কামড়িয়েছে। দাদু বললেন  তাড়াতাড়ি শোও, আর ছড়া কাটতে কাটতে ঘুমাও তাহলে দেখবা সবার আগে জাগতে পারবে। আর সকালে ঠিকই ইঁদুর দেখতে পাবে। তাহমিনা বললো-ঠিক আছে তুমি বলে দিও আমিও ছড়াটি আমি শুনে শুনে বলবো। দাদু ছড়া বলতে শুরু করলো-

 

“বুড়ো ইঁদুর ছানা ইঁদুর কোথায় আছো ভাই,

সারা ঘরে খুঁজে দেখি কোথাও তুমি নাই।

আমার দাদুর স্বপ্ন হয়ে ধরা দাও খাঁচায়,

খাঁচা আমি রাইখ্যা দিলাম ঘরেরই মাচায়”।

দু’জনে সমসুরে এই বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়লো।

 

তাহমিনা ভোরে আবার স্বপ্ন দেখলো সে অনেকগুলো ইঁদুর ছানা দেখতেছে। আবার চিৎকার করে উঠলো। দাদু ধমক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো কি হলো আবার? সে কাউকে কিছু না বলে আস্তে আস্তে ওঠে চোখ কচলাতে কচলাতে গিয়ে সকালের আবছা আলোয় মাচায় দেখে এলাহী কান্ড। সেখান থেকেই আবার চিৎকার দিতে দিতে সবাইকে জড়ো করে ফেললো। সবাই ঐ দিনকার মতো বিপদ মনে করে দৌড়ে এলো। এসে দেখলো ইঁদুর নিধনের খাঁচার ভিতর সেই বড় ইঁদুরটি  অসহায়ের মতো দুর্বল হয়ে পড়ে আছে। সবাইতো অবাক! আবার সোরগোল আর হাসিও সমান তালে চললো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ