সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ছেড়াদ্বীপ নিষিদ্ধে পর্যটনে বিরূপ প্রভাবের শঙ্কা

শাহনেওয়াজ জিল্লু, কক্সবাজার : পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে এসে বেশিরভাগ ভ্রমণবিলাসী পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করে থাকেন। ছেড়াদ্বীপ হলো সেই সেন্টমার্টিন দ্বীপের একটি ক্ষুদ্র অংশ। প্রকৃতির সমস্ত নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য যেনো এই দ্বীপটিকে ঘিরেই। যেদিকে চোখ যায় মন জুড়িয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার অজুহাতে পরিবেশ অধিদপ্তর পর্যটকদের জন্য ছেড়াদ্বীপ অংশটিতে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন- এমন সিদ্ধান্তে কক্সবাজারের পর্যটনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কক্সবাজার ভ্রমণপিপাসুদের যে স্পটটি খুব বেশি আকর্ষণ করে সেটি হলো সেন্টমার্টিন এবং তৎসংলগ্ন ছেড়াদ্বীপ। আর সেখানেই যদি পর্যটকরা যেতে না পারেন তাহলে কক্সবাজার ভ্রমণে আগ্রহ হারাবে বহু পর্যটক। শিক্ষাবিদরা বলছেন- ছেড়াদ্বীপ ভ্রমণে শর্তহীন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য এবং জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তবিক জ্ঞান অর্জন থেকে বঞ্চিত হবে অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার্থীরা।

পরিবেশ অধিদপ্ততরের পরিচালক সোলায়মান হায়দার বলেন, সেন্টমার্টিনের সব জায়গা পর্যটকদের জন্য নয়। ছেড়াদ্বীপ পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব জমি। পর্যটকদের আনাগোনায় এ দ্বীপের কোরাল দিনদিন নষ্ট হচ্ছে। দ্বীপ ও কোরাল বাঁচিয়ে রাখতে এরইমধ্যে ছেড়াদ্বীপ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া পুরো সেন্টমার্টিন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে দ্বীপের সব হোটেল ভেঙে দেয়া হবে।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় সেন্টমার্টিনের আব্দুর রহিমের (৪৫) সাথে। তিনি জানান- একসময় এই দ্বীপে কুকুর, মাছি কিছুই ছিল না। এখন পুরোদ্বীপ এসবে ভরপুর, কারণ দিন দিন দ্বীপটা ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। একসময় চারপাশ অনেক সুন্দর ছিল, প্রবালের দেখা মিলতো আরো অনেক বেশি। সেসময় বিদেশি পর্যটকও আসতো অহরহ, এখন আসে না বললেই চলে। যারাই আসেন; বিরক্তের ছাপ নিয়ে ফিরে যান। দ্বিতীয়বার আসেন বলে মনে হয় না। এখন নতুন করে ছেড়াদ্বীপে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি কিভাবে দেখছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন- এটি আরও বেশি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হবে। ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পরিবেশ-জীববৈচিত্র রক্ষা সম্ভব নয়। বরং দায়িত্বপরায়ণ মনোভাব নিয়ে সবাই যার যার দায়িত্ব পালন করলেই সেন্টমার্টিন ও ছেড়াদ্বীপের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো এবং অধিক পর্যটক বান্ধব করা যেতো। সেন্টমার্টিনের আরো কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে প্রায় একই ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়। তারা বলছেন- পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত লোকজনদের যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে। তাদের নির্লিপ্ততার কারণেই মূলত দূষণসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত সংকটের মুখে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় নয় হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেন এই দ্বীপে। দর্শনীয় স্থান ছেড়াদ্বীপ নিষিদ্ধ করা হলে পর্যটকরা সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে দিনে দিনে। এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর। 

সরেজমিন, পর্যটক ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মাঝে গতানুগতিক চাল-চলন এবং অসচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক যেসব বিধি নিষেধ কিংবা নিয়মনীতি মেনে চলতে বলা হয়েছে এর কোনোটিই মানা হয়না। অন্যদিকে আইন অমান্যকারীদের ব্যাপারে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিতেও দেখা যায় না। যে যার মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কাজকর্ম করে বিনোদন নিচ্ছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর দ্বীপের প্রবেশমুখেই লিখে রেখেছে- পর্যটকদের কী করা উচিত এবং কী করা উচিত হবেনা। যেমন প্রবাল, শৈবাল, শামুক, ঝিনুক ইত্যাদি সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকা, প্লাস্টিক-পলিথিন যত্রতত্র ফেলা থেকে বিরত থাকা, রাতে সৈকত এলাকায় আলো বা আগুন জ্বালানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া দ্বীপে মাইক বা উচ্চশব্দে গান-বাজনা না করা, মিঠা পানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়াসহ আরো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়ে বিলবোর্ড টাঙ্গানো হয়েছে। কিন্তু এর কোনোটিই মানতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি পর্যটক ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সাবাজার নাগরিক আন্দোলনের মহাসচিব এইচ.এম. নজরুল ইসলাম জানান- পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র রক্ষার অজুহাতে শুধুমাত্র ছেড়াদ্বীপ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত একেবারেই অযৌক্তিক। অথচ ছেড়াদ্বীপ, সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষায় এর আগে বহু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। আইন করা হয়েছিলো। কিন্তু এর কোনোটিই প্রয়োগ করা হয়নি। এখন শুধু ছেড়াদ্বীপে পর্যটক নিষিদ্ধ করে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন তিনি।

বিশিষ্ট কৃষি ও পরিবেশ সংগঠক মতিন সৈকত জানান- সেন্টমার্টিন ও ছেড়াদ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটক ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মাঝে অধিক সচেতনতা জরুরী। পর্যটক নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বরং পরিবেশ রক্ষায় বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ ও বাস্তবায়নই একমাত্র সমাধান। এছাড়াও সবার মাঝে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে দলগঠন করে নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। এভাবে কোনো পর্যটন স্পট নিষিদ্ধ করা হলে প্রজন্ম সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা থেকে বঞ্চিত হবে। 

এছাড়াও সেন্টমার্টিনের ভূমির পরিমাণ নির্ভর করে জোয়ার-ভাটার উপর। ভাটার সময় আট আর জোয়ারের সময় পাঁচ বর্গকিলোমিটার। দ্বীপের রয়েছে তিনটি অংশ- উত্তরপাড়া, দক্ষিণপাড়া আর দুই অংশের মাঝখানটা গলার মতো সরু বলে গলাচিপা নামে পরিচিত। এই তিন অংশের মাঝে উত্তর অংশ মূলত জনপদ। দক্ষিণ অংশ ‘রেস্ট্রিকটেড অ্যাকসেস জোন’ হিসেবে পরিচিত। গলাচিপায় কিছু ভালো কটেজ আর কিছু স্থানীয় মানুষের বসবাস। অথচ এই ক্ষুদ্র ভূখন্ডেই অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে একশ’রও বেশি হোটেল-রিসোর্ট নামের বহুতল ভবন। রাস্তার একপাশ ও সৈকতের তীর দখল করে অবৈধভাবে বসানো হয়েছে শতাধিক স্থাপনা ও দোকান। এসব দোকানে বিক্রি হচ্ছে শুঁটকি, শামুক-ঝিনুকের পণ্য, কাপড় ও রকমারি খাবারদাবার। এছাড়া পর্যটকদের অসচেতনতা আর দূষণসহ নানা কারণে দ্বীপের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র কমছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে দ্বীপে বহুল ব্যবহৃত জেনারেটর এবং সৈকতে চলাচলরত বিভিন্ন ধরনের মোটরযান।

ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন কক্সবাজার (টুয়াক) এর সাধারণ সম্পাদক আসহাব-উদ-দৌলা আশেক জানান- ছেড়াদ্বীপে পর্যটক নিষিদ্ধের বিষয়ে আমাদের হাতে এখনও কোনো নির্দেশনা আসেনি। গণমাধ্যম মারফতে জেনেছি ছেড়াদ্বীপে পর্যটক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটা করা হলে পর্যটনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। বরং পরিবেশ রক্ষা করেই সেখানে পর্যটক যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হউক। আমরাও চাই পরিবেশ ও জীববৈচিত্র টিকে থাকুক। এলক্ষ্যে ব্যাপকভাবে গণসচেতনতা তৈরি করা হউক। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র বিরোধী কার্যকলাপের জন্য এককভাবে পর্যটকদের দোষারোপ করা উচিত হবেনা। কারণ তারা সকলেই সেখানে নবাগত। একটি স্পর্শকাতর পর্যটন কেন্দ্রে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে তাদের অজানা থাকাটা একেবারেই স্বাভাবিক। টুয়াক, পর্যটন পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট সকলে একযোগে সমন্বয় করে কাজ করলে সেখানে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব। এভাবে পর্যটকদের ছেড়াদ্বীপ ভ্রমণ করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কর্মকর্তার মুঠোফোনে অসংখ্যবার যোগযোগ করা হলেও তিনি যুক্ত হতে ব্যার্থ হন। এ কারণে তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ