বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়ছে

স্টাফ রিপোর্টার : আরেক দফা বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। পাইকারিতে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ২৩ দশমিক ২৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার কারওয়ানবাজারে টিসিবি অডিটরিয়ামে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে এ প্রস্তাব দেয়া হয়। তবে প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বিইআরসি বলছে, সরবরাহ ব্যয় সমন্বয় করতে ইউনিট প্রতি ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ দাম বাড়ানো যেতে পারে।
শুনানিতে পিডিবির জিএম (বাণিজ্যিক কার্যক্রম) কাউসার আমীর আলী বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাইকারিতে বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয় ছিল ৫ টাকা ৮৩ পয়সা। এখন বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য ৪ টাকা ৭৭ পয়সা। এর ফলে গত অর্থবছরে ৬৮ হাজার ৬২৩ মিলিয়ন টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। ২০২০ সালে গড় সরবরাহ ব্যয় হবে ৫ টাকা ৮৮ পয়সা হবে। কিন্তু বর্তমান মূল্য বজায় থাকলে এবছর ঘাটতি হবে ৮৫ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন টাকা। এ ঘাটতি পোষাতে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য এক টাকা ১১ পয়সা বাড়ানো প্রয়োজন।
দাম বাড়ানোর কারণ হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, গ্যাসের মূল্য ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি, কয়লার ওপর নতুন করে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি ও কোনো কোনো বিতরণ সংস্থা কর্তৃক সময় মতো টাকা পরিশোধ না করাকে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির পক্ষে বিইআরসির উপপরিচালক (ট্যারিফ) মো. কামরুজ্জামান বলেন, তাদের পর্যালোচনায় পাইকারি মূল্য ৯৩ পয়সা বা ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানো যেতে পারে। আগামী বছর প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা লোকসানের পূর্বাভাস দিয়ে বিইআরসির দ্বারস্থ হয়েছে পিডিবি। পিজিসিবি চায়, চার বছর আগে নির্ধারণ করা তাদের সঞ্চালন চার্জ তিন ধাপেই বাড়ানো হোক। প্রথম দিনের শুনানিতে পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তন ও সঞ্চালন মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবের ওপর শুনানি চলছে।
সর্বশেষ ২০১৭ সালের নভেম্বরে পাইকারি বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ায় সরকার। আর চলতি বছরের ৩০ জুন গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বিইআরসি।
বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য মিজানুর রহমান, আব্দুল আজিজ, রহমান মুরশেদ ও মাহমুদউল হক ভূইয়া শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম, মুঠোফোন গ্রাহক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিজিএমইএর প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, বিকেএমইএর সজিব হোসেন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্সসহ আরো কয়েকজন ভোক্তা প্রতিনিধি দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।
১ ডিসেম্বর রবিবার থেকে শুরু হবে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর জন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত দামের ওপর শুনানি। প্রথমদিন ১ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় শুরু হবে পিডিবির গ্রাহক পর্যায়ের মূল্যহার পরিবর্তনের ওপর শুনানি। একই দিন দুপুর ২টায় শুরু হবে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো) শুনানি। ২ ডিসেম্বর সকালে অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) এবং দুপুরে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) শুনানি। এরপর ৩ ডিসেম্বর সকালে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) এবং দুপুরে ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) গ্রাহক পর্যায়ের মূল্যহার পরিবর্তনের ওপর গণশুনানি হবে।
গ্যাসের দাম বাড়লেও বিদ্যুতের দাম বাড়বে না- সরকারের এমন বক্তব্যের পরও ফের কেন দাম বাড়ানো হচ্ছে তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।  বিদ্যুতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর শুনানিতে তিনি এ ব্যাখ্যা জানতে চান তিনি। শুনানিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য মিজানুর রহমান, আব্দুল আজিজ, রহমান মুরশেদ ও মাহমুদউল হক ভুইয়া উপস্থিত ছিলেন।
শুনানিতে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কমিশনকে মনে করিয়ে দেন, ২০১৮ সালে গ্যাসের দাম বাড়ানোর শুনানিতে কমিশন বলেছিল- গ্যাসের দাম বাড়লেও বিদ্যুতের দাম বাড়বে না। তাহলে এখন কেন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর শুনানি হচ্ছে। এই প্রশ্নের জবাবে কমিশনের সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দাম না বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল, তা তো বাড়েনি। গ্যাসের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির কথা বলা হয়েছিল। এলএনজি আসায় বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমেছে।’
এর পরিপ্রেক্ষিতে আলাল বলেন, ‘জেলখানায় না গেলে আবার শুনানিতে এসে এসব কথা মনে করিয়ে দেবো।’ তিনি কুইক রেন্টালের মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন করলে পিডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, কুইক রেন্টালের একেকটির মেয়াদ একেক সময়ের। ফলে একই সঙ্গে সব বন্ধ হবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে বন্ধ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু কেন্দ্র বন্ধ হয়েছে। আর এই কেন্দ্রগুলো নবায়ন করা হচ্ছে না। এ সময় আলাল প্রশ্ন করেন, তাহলে কি অনন্তকাল ধরে এসব চুক্তি চলতে থাকবে?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করছে ঠিকই কিন্তু সেই শুনানিতে জনগণের কথা শোনা হয় না। ঠিকই সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী দাম বাড়ানো হয়। এর আগে চলতি বছর গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর শুনানি হয়েছিল। সাধারণ মানুষ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি চায়নি। কিন্তু শুনানি শেষে ঠিকই দাম বাড়ানো হয়েছিল।’
বৃহস্পতিবার (২৮ নভেম্বর) কাওয়ান বাজারের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ভবনের সামনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশে গণসংহতি আন্দোলনের নেতারা এসব কথা বলেন।  সমাবেশে সংগঠনের সম্পাদকম-লীর সদস্য মনির উদ্দিন পাপ্পু, জুলহাসনাইন বাবু, রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদ প্রমুখ বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, নিত্যপণ্যের দামের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। পেঁয়াজের দাম নিয়ে দেশে যে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। এখনও দাম আকাশছোঁয়া। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ওপর শুনানি হয়েছে। সেই শুনানিতে অনেকেই বক্তব্য দিয়েছেন, বাইরে প্রতিবাদ হয়েছে। কমিশন সবার কথা শুনেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে।
তারা বলেন, সরকারের অপরিকল্পিত প্রকল্পের কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। এই দামের বোঝা এখন জনগণের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। জনগণ এই বোঝা মেনে নেবে না। সংগঠনের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের নিন্দা জানানো হয়।
বড়পুকুরিয়ার কয়লা চুরির মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামী বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর সদস্য আব্দুল আজিজ খান গণশুনানিতে উপস্থিত থাকায় হইচইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তাকে নিয়ে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘চার্জশিটভুক্ত আসামি আব্দুল আজিজ খানকে পাশে রেখে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর এই গণশুনানি করায় তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এতে জনগণের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে।  এ সময় কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আদালতে নিষ্পত্তি হবে।’
এরপর মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছেন, ঠিক ওই সময়ে কমিশন বিদ্যুতের মূল্য নিয়ে গণশুনানি করছে। সুতরাং বিষয়টি শুধু আদালতের বিষয় বলে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।’
এরপর সাংবাদিক সেরাজুল ইসলাম বলেন, ‘চার্জশিটভুক্ত আসামী গণশুনানিতে অংশ নিতে পারেন? এটি বিইআরসির আইন সমর্থন করে কিনা?’ এমন প্রশ্নের জবাবে কোনও উত্তর দেননি কমিশনের চেয়ারম্যান।
এদিকে বিদ্যুতের সঞ্চালন মাশুল ৫০ দশমিক ৭৭ ভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ। এর বিপরীতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি মাত্র ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ মাশুল বাড়ানোর কথা বলেছে। এই সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
শুনানির শুরুতে সঞ্চালন মাশুল বাড়ানোর পক্ষে প্রস্তাব উপস্থাপন করেন  পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া। অন্যদিকে মূল্যায়ন কমিটির পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন উপ-পরিচালক (ট্যারিফ) মো. কামরুজ্জামান। এ সময় বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য রহমান মুর্শেদ, সদস্য মিজানুর রহমান, সদস্য মাহমুদউল হক ভুঁইয়া ও সদস্য আব্দুল আজিজ খান উপস্থিত ছিলেন।
লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঞ্চালন মাশুল বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ক্যাব। ক্যাবের পক্ষে শুনানিতে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘সম্প্রতি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসরকারি খাতে সঞ্চালন ব্যবস্থা ছেড়ে দিতে চাইছে সরকার। এক্ষেত্রে বেসরকারি কেন্দ্রের মতোই তাদের জন্যও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট রাখা হচ্ছে। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি ভালো ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
শামসুল আলম বলেন, ‘পিজিসিবি কি সারাদেশে সঞ্চালনের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ? না হলে কেন এই উদ্যোগ?’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে কেন সঞ্চালন চার্জ বাড়াতে চাইবে? তাদের কোনও লোকসান নেই। তাহলে তাদের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য তারা ঋণ নিচ্ছে। সেই ঋণ তারা সুদসহ পরিশোধ করবে। নিজেরা আরও লাভবান হবে। এই সুদ পরিশোধের দায়িত্ব কি জনগণের? তাহলে সঞ্চালন চার্জ বাড়িয়ে জনগণের ঘাড়ে দেওয়া খুবই অযৌক্তিক এটি বিষয় হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ