শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০
Online Edition

বুলবুলের আঘাত মোকাবেলায় চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রস্তুতি

চট্টগ্রাম ব্যুরো : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে সতর্কতা সংকেত বেড়ে যাওয়ায় ও সাগর উত্তাল থাকার কারণে বংগোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া বহু ট্রলার চট্টগ্রাম মহানগরীর ফিসারিঘাটসহ কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন ঘাটে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসতে শুরু করেছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে সাগর উত্তাল থাকার কারনে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ হয়ে গেছে।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে লাইটার শিপ মালিকদের সংগঠন ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আবহাওয়া অধিদফতরের সতর্ক সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে বন্দর চ্যানেল নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে লাইটার শিপগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাতে যেসব লাইটার বহির্নোঙরে গেছে সেগুলো ফিরে আসছে কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। বড় জাহাজের বিদেশি ক্যাপ্টেনরা আবহাওয়া বৈরী হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত কারণে লাইটারিং বন্ধ করে দিয়েছেন।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গতকাল শুক্রবার বিকালে অভ্যন্তরীণভাবে ‘অ্যালার্ট-২ জারি’ করেছে। শুক্রবার বিকেলে বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ। প্রস্তুতি সভায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, বন্দরের বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের প্রতিনিধিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এর ফলে কর্ণফুলী নদীর বন্দর চ্যানেলে অবস্থানরত অভ্যন্তরীণ জাহাজ ও ছোট ছোট নৌযানগুলোকে শাহ আমানত সেতুর উজানে সরে যেতে হবে। বহির্নোঙরে সাগরে অবস্থানরত জাহাজগুলো ক্রমান্বয়ে কুতুবদিয়া ও কক্সবাজার উপকূলে সরতে এবং জাহাজের ইঞ্জিন সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হবে। জেটিতে অবস্থানরত জাহাজগুলো ‘অ্যালার্ট-৩’ জারির সঙ্গে সঙ্গে বহির্নোঙরে সরিয়ে নেওয়া হবে। এ সময় সব হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট, গ্যান্ট্রি ক্রেন টার্মিনাল বা শেডে নিরাপদ রেখে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হবে। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে দুইটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছে। নৌ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর ০৩১-৭২৬৯১৬। পরিবহন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর ০৩১-২৫১০৮৭৮। 
এদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনও ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছে ও বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখতে পদক্ষেপ নিতে বলেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানার আশঙ্কায় নগরবাসীর যে কোনো সেবা দানের জন্য সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম খুলেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। গতকাল শুক্রবার সকালে চীন থেকে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের নির্দেশে কন্ট্রোল রুম চালু করে চসিক। উল্লেখ্য, সিটি মেয়র প্রতিষ্ঠানিক কাজে চীন দেশে অবস্থান করছেন। ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কিত যে কোন তথ্য ও সহযোগিতার প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চসিকের পক্ষ থেকে নগরবাসীকে অনুরোধ করা হয়েছে। চসিক’র কন্ট্রোল রুমের ফোন নম্ব^রগুলো হলো- ০৩১-৬৩০৭৩৯, ০৩১-৬৩৩৬৪৯। দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে উপকূলবাসীকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। উপকূলীয় জনসাধারণকে সরিয়ে আনা এবং দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্ুী রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার কাজে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীগণ, চসিক এর শ্রমিক ও পর্যাপ্ত গাড়ী প্রস্তুত রয়েছে। চসিকের পক্ষ থেকে উপকূলীয় এবং পাহাড়ের তলদেশে অবস্থানরত জনসাধারনের মাঝে সচেতনতার জন্য মাইকিং কার্যক্রম সহ দুর্যোগপরবর্ুী সময়ের জন্য শুকনো খাবার,পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা সেবাদানের জন্য মেডিকেল টিম ও পর্যাপ্ত ওষুধপত্র প্রস্তুত রেখেছে চসিক। এছাড়াও দুর্যোগ পূর্ববর্ুী, দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্ুী সময়ে অবস্থানের জন্য উপকূলীয় এলাকায় চসিক পরিচালিু সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্বদা খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সার্বিক পরিস্থিতি ও কন্ট্রোলরুমে তদারকি করছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী। এই উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার বিকেলে চসিক দামপাড়াস্থ বিদ্যুৎ অফিসে ভারপ্রাপ্ত মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনীর সভাপতিত্বে এক জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন  চসিক সচিব মো. আবু সাহেদ চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুদিপ বসাক, উপসচিব আশেক রসুল চৌধুরী, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মঈনুল হোসেন আলী জয়, শিক্ষক মিজানুর রহমান, রেড ক্রিসেন্ট এর প্রতিনিধিবৃন্দ প্রমুখ। ভারপ্রাপ্ত মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। আবহাওয়া বার্তানুযায়ী ঘূর্ণিঝড় বুলবুল শনিবার রাতে আঘাত হানতে পারে।
এদিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এর নির্দেশে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবেলায় দামপাড়াস্হ সিএমপির সদর দপ্তরে জরুরী নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। নগর বাসীকে জরুরী প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নিম্নোক্ত টেলিফোন ও মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। ০১৬ ৭৬ ১২ ৩৪ ৫৬, ০১৬ ৭৯ ১২ ৩৪ ৫৬, ০৩১ ৬৩ ৯০ ২২, ০৩১ ৬৩ ০৩ ৫২।এ সংক্রান্তে জনসাধারনের পাশে থেকে দূর্যোগ কালীন জরুরী সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সিএমপির সকল থানার অফিসার ইনচার্জ গন সহ সকল স্তরের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুলে’র প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে সমুদ্র। ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত দিয়েছে  আবহাওয়া অফিস। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে দেশের একমাত্র এই প্রবাল দ্বীপে আটকা পড়েছেন প্রায় ১২শ পর্যটক। বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাগরে জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাগরে ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত থাকায় শুক্রবার সকালে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। নিষেধাজ্ঞার কারণে শুক্রবার সকাল থেকে টেকনাফ জাহাজঘাট থেকে কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়নি। সেন্টমার্টিন থেকেও কোনো জাহাজ ছেড়ে আসেনি টেকনাফে। ফলে প্রবাল দ্বীপটিতে আটকে থাকা প্রায় ১২০০ পর্যটক  ফিরতে পারছেন না। তবে দ্বীপের আবাসিক হোটেলগুলোতে তারা যেন নিরাপদে অবস্থান করতে পারেন, তা দেখভাল করছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই সেন্টমার্টিনে আটকা পড়া পর্যটকদের নিরাপদে নিয়ে আসা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ