সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আব্দুল হালীম খাঁ’র মধ্যযুগ অন্ধকার যুগ নয় আলোকিত যুগ

সাকী মাহবুব : আব্দুল হালীম খাঁ বাংলা সাহিত্যাকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সত্তর দশকের উষালগ্ন থেকে সাহিত্যের নানা মাত্রায় তাঁর সফল পদচারণা। কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু হলেও ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস,নাটক, প্রবন্ধ, শিশু সাহিত্য, জীবনীসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অসীম আগ্রহ। চার যুগেরও অধিককাল ধরে বহতা নদীর মতো নিয়মিত কলম চালিয়ে যাচেছন তিনি। যৌবনের প্রারম্ভে সেই যে কলম ধরেছেন, বার্ধক্যেও তা অব্যাহত রেখেছেন এবং দিনে দিনে তা নানা মাত্রায় ফুলে ফলে বিকশিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের জীবনে এমন ক্রমাগ্রসরতা খুব বেশী একটা দৃষ্টি গোচর হয় না। জীবনের নানা বাঁকে, জীবিকার বহুমুখী টানাপোড়নে, দেশের অসহিষ্ণু রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উথাল পাতালে কলমের সক্রিয় পদচারণা অনেক সাহিত্যকর্মীরই মাঝে মাঝে ছন্দ পতন হয়। কিন্ত খুবই আশ্চর্য নানামাত্রিক সাংগঠনিক জীবন, চাকুরী বাকরী, সংসার, স্বাস্থ্য কোনো কিছুই খাঁ সাহেবের কলমের উল্কা গতিবেগকে স্তব্ধ করতে পারেনি। রোবটের মতো এগিয়ে যাচ্ছে সব বাধা মাড়িয়ে। ছড়া ও কবিতা লিখতে লিখতে নিজের কাছেই যখন এক ঘেয়েমী লেগেছে ঠিক তখনই তিনি পরিকল্পনা করে মুসলিম উম্মাহর কথা স্মরণ করে গবেষণার জগতে কলম চালিয়েছেন। গবেষণায়ও রয়েছে তাঁর ঈর্ষনীয় পারদর্শিতা। এই পারদর্শিতার উজ্জ্বল প্রমাণ পাঠকরা খুঁজে পাবেন সাম্প্রতিক কালে প্রকাশিত তাঁর “মধ্যযুগ অন্ধকার যুগ নয় আলোকিত যুগ” নামক বইয়ের প্রতিটি পাতায় পাতায়। এ বইয়ের মধ্যে লেখকের দূরদর্শিতা চিন্তা-চেতনার পরিচয় পাওয়া যাবে। লেখকের ভাষায় “বইটির মূল বিষয় বক্তব্য হচ্ছে মধ্যযুগ অন্ধকার যুগ নয়, মধ্যযুগ শিক্ষা, সভ্যতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, জ্ঞানবিজ্ঞান ও নবনব আবিষ্কারে আলোক উজ্জ্বল যুগ। এ বইতে লেখক মধ্যযুগের মুসলিম কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, বিজ্ঞানী ও স্কলারদের জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আলোকবর্তিকা বিচ্ছুরণকারী জ্ঞান সাধকদের কীর্তিগাঁথাগুলো বিস্মৃতির ধূলোয় আচ্ছাদিত আমাদের সেই গৌরবময় সোনালী অতীতকে ঝেড়ে মুছে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে মুসলিম উম্মাহর বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন।

ঘামঝরা পরিশ্রমের সিঁড়ি বেয়ে লেখা এ গবেষণা গ্রন্থটি লেখক চারটি অধ্যায়ে সাজিয়েছেন। প্রথম অধ্যায়ে যে সব বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে তা হলো মৌলবাদের কথা, ইসলাম ও জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কারা, মুসলমান কখনো জঙ্গি হতে পারে না, লন্ডনে বোমা হামলাকারী কারা, সিআই-এর পরিকল্পনা, আরব বসন্ত : অভিনব চক্রান্ত। 

দ্বিতীয় অধ্যায় : পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরীফে চিকিৎসা বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, রসায়ন বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, গণিতশাস্ত্রে মুসলমান, পদার্থ বিজ্ঞানে মুসলমান, জ্যোতির্বিজ্ঞানে মুসলমান, ভূবিজ্ঞান চর্চায় মুসলমান, মুসলিম মনীষীদের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চিন্তাধারা, আধুনিক প্রযুক্তির স্বর্ণ সোপান ছিল মুসলমানদের হাতে গড়া।

তৃতীয় অধ্যায় : শিক্ষা বিস্তারে মুসলমানদের অবদান, ভারতীয় সংস্কৃতিতে মুসলমানদের অবদান, শিক্ষা সভ্যতা প্রচার প্রসারে বণিক সুফি সাধকদের অবদান, মুসলিম স্পেনের বিজ্ঞানী কবি সাহিত্যিক মুসলমানদের ঋণে আকন্ঠ নিমজ্জিত ইউরোপ।

চতুর্থ অধ্যায় : মধ্যযুগ কি বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ, স্পেনে মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক অনৈক্যের এক নির্মম অধ্যায়, কাব্য সাহিত্যে মুসলমানদের কীর্তি কাহিনী।

লেখক প্রথম অধ্যায়ে মৌলবাদ কি, মৌলবাদী কারা, মুসলমানদের মৌলবাদী বলা যাবে কি না? এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এরপর ইসলাম ও জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিকারা এ সমপর্কে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। বর্তমান পৃথিবীর প্রধান প্রধান সমস্যাসমূহের মধ্যে জঙ্গিবাদ যেহেতু একটা অন্যতম ইস্যু সেহেতু লেখক এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যাননি। মুসলমানরা যে জঙ্গি নয়, সন্ত্রাসী নয় এর স্বপক্ষে বলিষ্ট ভাষায় তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন। লন্ডনে বোমা হামলাকারী কারা লেখক এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে থলের বিড়াল বের করে ছেড়েছেন। লন্ডনে বোমা হামলাকারীদের মুখোশ বিশ্বমাঝে তুলে ধরেছেন। তারপর পৃথিবীর একচ্ছত্র মোড়ল আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থা সিআই-এর মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রেরর কথাগুলো ফাঁস করে দিয়েছেন। আরব বসন্ত : অভিনব চক্রান্ত এ শিরোনামে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক আরব বসন্ত নিয়ে পশ্চিমাদের কূটকৌশল আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। আরব বসন্তের নামে পশ্চিমাদের পলিসিগুলো মুসলমান বিদ্বেষী এ কথাগুলোই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লেখকের ভাষায় : হায় আরব বসন্ত! ধোকা কাকে বলে! ধোকা দেয়ার কত সুুন্দর ষড়যন্ত্র! কত অভিনব চক্রান্ত।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে পবিত্র কোরাআন ও হাদিস শরীফে চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শিংগা লাগানো, মেহেদী ব্যবহারের উপকারিতা, মধু, কালোজিরা, জ্বরের জন্য ঠান্ডা পানি, ওষধ হিসেবে লবণ, মাছি বাহিত রোগ ও চিকিৎসা, গেটেবাতের চিকিৎসায় আনজীর বা ডুমুরের স্ব-স্ব ক্ষেত্রে উপকারিতা এক ঝানু ডাক্তারেরর মতো তুলে ধরেছেন। এ আর্টিকেল থেকে একজন পাঠক দৈনন্দিন জীবনে কুরআন ও হাদিসের আলোকে চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা লাভ করে তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে চমৎকার উপকারিতা লাভ করতে পারবেন এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান আলোচনা করতে গিয়ে লেখক বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইয়াহইয়া আননাহবী, আল কিন্দী, আবুল হাসান আহমদ আত তাবারী, আল রাজী, হাসান ইবনে নুহ, ইবনে সীনা, আল মুকাদ্দেসী, ইবনুল হাইসাম-এর মত বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের চিকিৎসা শাস্ত্রে অবদানের কথা তুলে ধরেছেন। কোন চিকিৎসা বিজ্ঞাননী চিকিৎসা শাস্ত্রে কতগুলো গবেষণামূলক বই লিখে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় অবদান রেখেছেন তার পরিসংখ্যানও তিনি বইয়ের মধ্যে উপস্থাপন করেছেন।

রসায়ন বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান আলোচনা করতে গিয়ে লেখক জাফর আস সাদিক, খালেদ ইবন ইয়াজিদ রসায়ন শাস্ত্রের বরপুত্র জাবির ইবনে হাইয়ান ও যাকারিয়া আল রাজীর অবদানের কথা প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন। এরপর গণিত শাস্ত্রে মুসলমান, পদার্থ বিজ্ঞানে মুসলমান জ্যোর্তিবিজ্ঞান চর্চায় মুসলমান ও বিজ্ঞান চর্চায় মুসলমান স্কলারদের অবদান তুলে ধরেছেন। মুসলিম মনীষীদের রাষ্ট্রিবজ্ঞানের চিন্তা ধারা নিয়ে সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরা হয়েছে। মানব সভ্যতার বিকাশ ও অগ্রগতিতে মুসলমানরা যে প্রযুক্তিগুলো আবিষ্কার করে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সে সমপর্কে আলোচনা করেছেন। চতুর্থ অধ্যায়ে লেখক প্রথম প্রবন্ধ মধ্যযুগ কি বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ শিরোনামটি আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন মুসলিম এবং অমুসলিম অনেক সুধীজন মধ্যযুগকে অন্ধকার যুগ বলতে চান।অর্থাৎ এই যুগটা জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষা সভ্যতার মানদন্ডে অন্ধকার যুগ মনে করেন। বর্তমানে এই উন্নত সভ্য যুগে কোথাও কোনো অমানবিক নির্যাতনেরর ঘটনার কথা শুনলে তারা মনে করেন-এটা মধ্যযুগীয় বর্বরতা এবং এমন মন্তব্য করার পর ঘৃণায় নাক সিটকান। তারা মধ্যযুগকে একটা বর্বরতা ও অজ্ঞতার যুগ বলেই ধারণা করে থাকেন।এটা তাদের মধ্যযুগের প্রকৃত ইতিহাস সমপর্কে অজ্ঞতা অথবা হীনমন্যতা। খাঁ সাহেব মধ্যযুগকে অন্ধকার যুগ বলতে নারাজ। লেখক তাদের ভ্রান্ত মতবাদকে খন্ডন করেছেন এভাবে -“মধ্যযুগই দুনিয়ার মানুষকে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে আলো ও জ্ঞানের জগতে নিয়ে আসেন। অন্ধকারে বন্দী মানবতাকে মুক্তির আযান শুনিয়ে জাগিয়ে তোলে, আলোকিত সভ্যতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। অসভ্য বর্বর ও শত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে সুশিক্ষিত সুসভ্য করে গড়ে তোলে।” একদা মুসলমানরা ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিয়ে শিক্ষা সভ্যতা জ্ঞান বিজ্ঞানে অন্ধকার পৃথিবীকে আলোকিত করেছিলেন। তাঁরা হয়েছিলেন সকল মানুষের পথ প্রদর্শক, পরিচালক এবং শাসক। তাঁদের বীরত্ব, সাহসিকতা, ন্যায়বিচার, মহানুভবতা, উদারতা, মহত্ত্ব, দানশীলতা, অপূর্ব ত্যাগ সাধনাও মানবীয় গুনে মুগ্ধ ও অভিভূত হয়ে দুনিয়ার সকল জাতি সদা সর্বদা মুসলমানদের গুণ কীর্তন করতো। কিন্তু আজ মুসলমেনদের সেই গৌরব, মর্যাদা, রাজ্য, সিংহাসন কোথায়? কোথায় তাদের সেই সাহস, বীরত্ব ও প্রতাপ? বর্তমানে মুসলিম জাতির অধ:পতন দেখে জাতীয় জাগরণের কবি ইসমাঈল হোসেন সিরাজী হৃদয়ে ভীষণ যন্ত্রণা অনুভব করছেন। তাই তাঁর কবিতার ছন্দে ছন্দে ব্যক্ত করেছেন কাব্য সাহিত্যে মুসলমানদের কীর্তি কাহিনী প্রবন্ধে। বইয়ের প্রথম দিকে লেখক “লেখকের কথা” নামক শিরোনামে অনেক তথ্যবহুল একটা ভূমিকা লিখেছেন। যে ভূমিকা পড়ে যে কোনো পাঠকের চোখ বইয়ের পাতায় আটকে যেতে পারে। তারপরেই সমপাদনার ভূমিকা শিরোনামে বাংলাদেশের ইসলামী পত্রিকা জগতের ধ্রুবতারা “মাসিক মদীনা” পত্রিকার স্বনামধন্য সমপাদক ও প্রকাশক আহমদ বদরুদ্দীন খান সাহেব অত্যন্ত সুচিন্তিত ও দিকনির্দেশনামূলক একটা ভূমিকা লিখে এ বইয়ের শ্রীমানকে অনেকগুণ বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। তাঁর এ লেখার মধ্যে বিজ্ঞ পাঠক অনেক গবেষণার খোরাক খুঁজে পাবেন। বইটি প্রকাশ করেছে শীর্ষ প্রকাশনী মাসিক মদীনা পাবলিকেশন্স। ৩৮/২, বাংলা বাজার ঢাকা-১১০০। বইটির গেটআপ, মেকআপ, বাঁধাই যে কাউকেই মুগ্ধ করবে সন্দেহ নেই। ২০৮ পৃষ্ঠার তথ্যবহুল ও গবেষণাধর্মী এ বইটি সবার মনে আলো ছড়াতে সক্ষম হবে বলে আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস। বইটি পাঠক নন্দিত হোক এই প্রত্যাশা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ