বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

মধ্যযুগের পুঁথিসাহিত্য এবং বঙ্গাব্দের অবস্থান

এ বি এম ফয়েজ উল্যাহ : (গত সংখ্যার পর) (১৭) ‘কিফায়তুল মুসল্লিন’। রচয়িতা : শেখ মোত্তালিব। চট্টগ্রামের সীতাকু-ে বাড়ি।

বাংলা, আরবী উভয় হরফে এই পুঁথি পাওয়া গেছে। মুসলমানদের অজু নামাজ রোজা হজ্ব জাকাত আরাকাম আহকাম ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রচিত এই পুঁথি বহুল প্রচারিত ছিল।

“কিফায়তুল মুসল্লিন শুন দিয়া মন

বঙ্গ ভাষে কহে শেখ পরাণ নন্দন।

সীতাকু- গ্রাম শেখ পরাণ সুজন

তাহার নন্দন হীন মোত্তালিব জান”।

রচনার তারিখ : ১০৪৯ হিজরী (১৬৩৯ খ্রীঃ)।

(১৮) ‘সরসালের নীতি’। ফার্সি ভাষা থেকে অনুদিত।

“এই যে নোচকা জান ফারছি আছিল,

সবে বুঝিবারে হীনে পাঞ্চালী রচিল।

নোচকা বলয়ে যারে ফারছি ভাষায়,

তার্তিব কিতাব বলি কহে বঙ্গভাষায়”।।

রচয়িতা : কমর আলী পন্ডিত। জন্মস্থান - চট্টগ্রামের ‘করলডেংগা’। রচনার তারিখ- ১০৮৬ হিজরী (১৬৭৫ খ্রীঃ)।

(১৯) ‘আমির হামজা’। আশি পর্বে বিভক্ত বিশাল মহাকাব্য। ফার্সি কাব্যের অনুবাদ। কবি নিজেই তাঁর কাব্য সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন

 ‘থাকুক লেখক কেহ পড়তে লাগে ডর’।

 রচয়িতা :  আবদুন নবী। চট্টগ্রামে সীতাকু-ের অধিবাসী।

“আমির হামজা জিম্মা ফারসী কিতাব,

ন বুঝিয়া লোকের মনেত পাই তাব( তাপ)।

বঙ্গেতে ফারসি ন জান এ সব লোকে...”।

রচনার তারিখ - ১০৯৬ হিজরী (১৬৮৪ খ্রীঃ)।

(২০) ‘মৃগলুব্দ’ পুঁথি। রচয়িতা-রতি দেব।

চট্টগ্রামের চক্রশালার অন্তর্গত সুচক্রদ-ী গ্রামের অধিবাসী। এই পুঁথিতে কবি শিবমাহাত্ম বর্ণনা করেছেন।

“শিবরাত্রি চতুর্দশী ব্রত উপবাস,

যেন মত অবনীতে হইল প্রকাশ”।

পুঁথিতে ভনিতা রয়েছে।

“রস অংক বায়ু শশী শাকের সময়”।

এই হিসেবে রচনার তারিখ -১৫৯৬ শকাব্দ (১৬৭৪ খ্রীঃ)।

(২১) ‘রসুল বিজয়’। কবি শেখ চান্দ। ত্রিপুরার অধিবাসি। ভনিতায় পুঁথির রচনার তারিখ আছে।

“ফাতে মোহাম্মদ সুত সএক চান্দ নাম।

মুর্শিদের আজ্ঞায় পাচালী রচিলাম।।

মরিস্বীদের আগ্যা পাহিয়া কহে হিন্য চান্দে।

এগার সহ বাইস সন রচিল প্রববন্দে।।

অর্থাৎ ১১২২ বাংলা (১৭১৫ খ্রীঃ)।

(২২)‘ অভয়া মঙ্গল’। কবি দ্বিজ রাম দেব। এই গ্রন্থে কবির আত্মপরিচয় নেই।

অনেক পন্ডিত ব্যক্তির মতে তিনি চট্টগ্রামের অধিবাসী। তাঁর ভণিতায় রচনার তারিখ পাওয়া যায়।

“ইন্দু বাণ ঋষি বাণ শক নিয়োজিত,

রচিলেক রামদেব সারদা চরিত”।

অর্থাৎ ১৫৭৫ শকাব্দ (১৬৫৩ খ্রীঃ)।

(২৩) ‘সিরনামা’। রচয়িতা - শেখ মনসুর। অষ্টাদশ শতকের কবি। রামুর অধিবাসী। এটি ফারসি ‘আসরারুল মসা’ বা ‘বীর্য রহস্য’ নামক গ্রন্থের কাব্যানুবাদ। ভণিতায় রচনার তারিখ পাওয়া যায়।

“আছারল মসা এক কিতাব উপাম,

ছিরনামা রাখিলাম পুস্তকের নাম।

যত হৈল মঘী সন লও পরিমানি,

এর পরে শূন্য ছ’ও পাঁচ দিয়া গোনি”।

অর্থাৎ ১০৬৫ মঘী সন (১৭০৩ খ্রীঃ)।

(২৪) ‘গুল-ই-বকাউলি’ এবং ‘ফায়দুল মুকতদী’। কবি মুহম্মদ মুকিম। চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ার অধিবাসী। কাব্যে ইংরেজ প্রশস্তি আছে।

“চিরদিন ইংরাজ এথা মহীপাল,

ভালে ভাল মন্দে মন্দ তস্করের কাল”।

 তবে তাঁর কাব্যে ইংরেজি বা বঙ্গাব্দ’র উল্লেখ নেই। তাঁর ‘ফায়দুল মুকতদী’ কাব্যের ভনিতায় রচনার তারিখ উল্লেখ আছে।

“ঋতু বেদ চন্দ্র শত আশী আর নয়”- অর্থাৎ ১১৩৫ মঘী সন। (১৭৭৩ খ্রীঃ)।

(২৫) ‘মনসা মঙ্গল’ ও ‘আদিত্য চরিত’। কবি রামজীবন বিদ্যাভূষণ। অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগের কবি। জন্মস্থান-চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার সাধনপুর গ্রাম। কবির ভনিতা-

‘সরকার ঋতু বিধু শক নিজোজিত,

মনসা মঙ্গল রাম জীবন চরিত’। অর্থাৎ

১৬২৫ শকাব্দ। (১৭০৩ খ্রীঃ)। এবং ‘ আদিত্য চরিত’ - এর ভনিতা,

“ইন্দু রাম, ঋতু বিধু শকাব্দ”- ১৬৩১ শকাব্দ। (১৭০৯ খ্রীঃ)।

(২৬) ‘চন্ডী মঙ্গল গীত’। কবি ভবানী শঙ্কর দাস। চট্টগ্রামের চক্রশালার বাসিন্দা। ভনিতা-

“দাতা বিন্দু সাগরেন্দু শকাদিত্য সনে,

ভবানী শংকর দাসে পঞ্চালিকা ভণে”।

এই হিসেবে পুঁথির তারিখ ১৭১১ শকাব্দ। (১৭৮৯ খ্রীঃ)।

(২৭) ‘বুরহানুল আরেফিন’। তাসাউফ মূলক গ্রন্থ। রচয়িতা -সৈয়দ নুরুদ্দিন।

কবির কাব্যে রচনার তারিখ উল্লেখ আছে।

“বার শ তিন সনে পুস্তক লেখা যায়,

পড়িলেক শুনিলে জ্ঞান জর্মিব সবায়”।

১২০৩ বাংলাসন ( ১৭৯৬ খ্রীঃ)। কবি এটিকে ‘ বঙ্গাব্দ’ বলেন নি।    (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ